kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ফেনীর পানিতে ফাঁড়া কাটার আশা

মেহেদী হাসান, সাব্রুম (ত্রিপুরা) থেকে ফিরে   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফেনীর পানিতে ফাঁড়া কাটার আশা

‘দু-তিন শ মিটারের মধ্যে খাবারের হোটেল পাবেন। আর যদি পাঁচ-ছয় শ মিটার যান তাহলে কিন্তু বাংলাদেশে চলে যাবেন’—খাবারের হোটেল কোথায় জানতে চাইলে এমনটিই বলছিলেন সাব্রুমের এক বাসিন্দা। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দক্ষিণ ত্রিপুরার শহর সাব্রুমে গত রবিবার যখন পৌঁছাই তখন প্রায় সন্ধ্যা। সীমান্তের এক পাশে সাব্রুম বাজার, অন্য পাশে খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলা। ফেনী নদী সেখানে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত নির্দেশ করছে।

পরদিন সোমবার সকালে সাব্রুম বাজারের পেছনে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের চৌকিতে দায়িত্বরত জোয়ান বললেন, এখানে সীমান্ত শান্ত। তেমন কোনো সমস্যা নেই। এই অংশে কাঁটাতারের বেড়া নেই। কথাবার্তার একপর্যায়ে আতিথেয়তাবশত তিনি জানতে চাইলেন, গরমে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য পানি পান করতে চাই কি না। পরে তিনি আবার নিজ থেকেই বললেন, সেখানে পানিতে ‘আয়রনের’ মাত্রা বেশি। এ কারণেই আর্সেনিকেরও ঝুঁকি প্রবল। তাই ‘ফিল্টার’ করা পানি তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। সাব্রুম এলাকা ঘুরে বিভিন্ন স্থানে পুকুর ও ডোবায় হলদে-লালচে পানি দেখা যায়। সাব্রুম বাজার এলাকার বাসিন্দা তপন লাল চক্রবর্তী জানান, ভূগর্ভস্থ পানি ‘ফিল্টার’ করে পান করতে হয়। ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রনের মাত্রা অনেক বেশি। নদীর প্রবাহিত পানিতে আয়রন কম। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের পানযোগ্য পানির চাহিদা মেটাতে কর্তৃপক্ষ ফেনী নদী থেকে পানি তুলতে চায়।

গত ৫ অক্টোবর নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দুই দেশের বৈঠকের দিকে বিশেষ দৃষ্টি ছিল সাব্রুমের বাসিন্দাদের। সাত হাজার ১৪২ জন বাসিন্দার সাব্রুমে পানযোগ্য পানির চাহিদা মেটাতে প্রায় এক দশক ধরেই ফেনী নদী থেকে বৈধভাবে পানি তোলার সুযোগ চাইছে ভারত। ২০১০ সালে যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্তও হয়েছিল। কথা ছিল ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের মধ্যে তিস্তা ও ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তি হবে। কিন্তু সফরের প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আপত্তি তোলায় ভেস্তে যায় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। একই সঙ্গে ঝুলে যায় ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তিও।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিস্তার জন্য ফেনীর পানিবণ্টন চুক্তিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে আটকে গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ নিয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য আপত্তি প্রত্যাহার না করলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তি সই করবে না। পশ্চিমবঙ্গ শিগগিরই আপত্তি প্রত্যাহার করবে এমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে ভারত ফেনী নদীসহ আরো ছয়টি নদীর (মনু, মুহুরি, খোয়াই, গোমতী, ধরলা ও দুধকুমার) পানিবণ্টন চুক্তির পথে অগ্রসর হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। ওই ছয় নদীর চারটিই (মনু, মুহুরি, খোয়াই ও গোমতী) ত্রিপুরা রাজ্য থেকে বাংলাদেশে ঢুকেছে। ওই নদীগুলোর পানিবণ্টনে কাঠামো চুক্তি সইয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের ইতিবাচক মনোভাব আছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ওই নদীগুলোর তথ্য-উপাত্ত হালনাগাদের পর সেগুলোর পানিবণ্টনে অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমন প্রেক্ষাপটে মানবিক কারণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের কথা ভেবেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সাব্রুমের বাসিন্দাদের খাওয়ার পানির জন্য ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি তোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শেষে ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করে নয়াদিল্লিকে ঢাকার উদ্বেগ নিরসন ও তিস্তা চুক্তি করার তাগিদ দিয়েছে। গত সপ্তাহে সাব্রুম সফরকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মানবিক সংকটে বাংলাদেশের এই উদারতাকে তারা বেশ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ফেনী নদীর ওপর নির্মাণাধীন মৈত্রী সেতুর কাছে প্রস্তাবিত পানি শোধনাগার প্রকল্পও দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগে ওই প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও পরে তা থমকে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সীমান্তের কাছে ওই পানি শোধনাগার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল বাংলাদেশ। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল সাব্রুমের আনন্দপাড়ায় প্রস্তাবিত ওই পানি শোধনাগার পরিদর্শনেও গিয়েছিল।

জানা গেছে, সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী বাংলাদেশ ভারতকে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি তোলার অনুমতি দিলেও এটি বাস্তবায়নে কাজ বাকি আছে। আর ওই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় দুই দেশেরই নিবিড় সম্পৃক্ততা থাকবে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, ফেনী নদী থেকে পানি তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতকে সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে। অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে যাতে বেশি পানি তোলা না হয় তা উভয় দেশের প্রকৌশলীরা নিয়মিত তদারকি করবেন। এ ছাড়া পাম্পের সক্ষমতা ও অবস্থান, সরবরাহের জন্য একক পাইপ, নদীতীর ভাঙলে দায়সহ বিভিন্ন বিষয় নির্দিষ্ট করা আছে।

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুকনা মৌসুমে ফেনী নদীর পানির গড় পরিমাণ ৭৯৪ কিউসেক এবং বার্ষিক পানির গড় পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮৭৮ কিউসেক। সেই হিসাবে ভারত ফেনী নদীর ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করলে তা হবে শুষ্ক মৌসুমের গড় পানিপ্রবাহের দশমিক ২৩ শতাংশ। অনুমোদিত মাত্রায় পানি প্রত্যাহার করলে নদীর ওপর প্রভাব পড়বে না বলেও পানিবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা