kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পরিবারেও বর্বরতা শিশুরা যাবে কোথায়

তৌফিক মারুফ   

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরিবারেও বর্বরতা  শিশুরা যাবে কোথায়

বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় দেশের মানুষের মানসিক ক্ষতে টান না ধরতে ধরতেই দেশের কয়েকটি এলাকায় মা-বাবার হাতে নিজের ‘প্রাণপ্রিয়’ সন্তানকে হত্যার নৃশংসতায় মানুষ যেন মুষড়ে পড়েছে। সুনামগঞ্জে বাবা ও আপন চাচা মিলে শিশুকে নারকীয়ভাবে ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে হত্যা, দুই মায়ের হাতে তাঁদের দুই শিশুসন্তান হত্যা, এক ব্যক্তির ধর্ষণের শিকার আপন ভাইয়ের শিশুকন্যা, মধ্যবয়সী প্রতিবেশী ও আরেক ব্যক্তির আরো পাঁচ শিশুকে ধর্ষণ—এসবই ঘটেছে গত তিন-চার দিনে।

এমন ঘটনাগুলোকে মানুষ পৈশাচিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ ও মনুষ্যত্ববোধের নারকীয় বিপর্যয় বলে মনে করছে। সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, মনোরোগ বিজ্ঞানীরা এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দায়ী করছেন সামাজিক, মানবিক ও রাষ্ট্রীয় নানামুখী অবক্ষয়কে।

জানতে চাইলে মনোবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম কালের কণ্ঠকে কেবল এতটুকু বলেন, ‘আবরারের ঘটনা আমাকে এতটাই তাড়িত করেছে যে আমি আর অন্য ঘটনাগুলো ভাবনায় নিতে পারছি না। তাই এসব বিষয়ে এখন আর আমি কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই।’

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা নিজের সন্তানকে কিংবা নিষ্পাপ শিশুদের নৃশংসভাবে মেরে ফেলার মতো ঘটনা ঘটায় তাদের ভেতরে বিবেকসম্পন্ন মনুষ্যত্ব তৈরি হয়নি; তাদের মানুষ বলা যায় না। এর জন্য পরিবার, সমাজ রাষ্ট্র—সবারই দায় আছে। সামাজিক নানা অবক্ষয়ের প্রভাবেও অনেক ক্ষেত্রে কিছু মানুষের মনোবৃত্তির অবক্ষয় ঘটে।’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কী আর বলব, এ ধরনের শিশুর প্রতি সহিংসতার মাত্রা তো কমছে না বরং আরো বেড়েই চলছে। ব্যক্তিগতভাবে এসব ঘটনায় আমি খুবই শঙ্কিত-উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি।’

তিনি বলেন, ‘সবাই যেন অতিমাত্রায় কেয়ার ফ্রি হয়ে যাচ্ছে। মানুষের প্রতি মানুষের সংযোগ কমে যাচ্ছে, তা ঘরে কিংবা বাইরে সব ক্ষেত্রেই, সবাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, শিশুদেরও সেভাবেই গড়ে তোলা হচ্ছে। ফলে সামনে আত্মকেন্দ্রিক সমস্যা আরো প্রকট হয়ে উঠবে, তখন এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের অবক্ষয় রোধে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। শুধু আইন দিয়েই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’

ঘটনা খুঁজতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি নৃশংসতার বর্ণনা পাওয়া যায় সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামে সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু তুহিনকে হত্যার ঘটনায়। জন্মদাতা পিতা বাছির ঘুমিয়ে থাকা সন্তানটিকে কোলে নিয়ে বাইরে গিয়ে তুলে দেন তাঁর ভাই (শিশুটির চাচা) নাসিরের কাছে। বাবার সহায়তায় চাচা শিশুটিকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করেন। দুটি কান ও পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলেন। আর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত দুটি ছুরির বাঁটে প্রতিপক্ষের সালাতুল ও সোলেমানের নাম লিখে পেটে বিদ্ধ করে লাশ গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন।

অন্যদিকে লক্ষ্মীপুরে শিশু কাউসারকে শ্বাস রোধ করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে শিশুটির মা স্বপ্নার বিরুদ্ধে। আবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জাহিন নামের আড়াই বছরের একটি শিশুকে চারতলার ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার মা রোকসানা আক্তারের বিরুদ্ধে। এ দুটি ঘটনায় পুলিশ দুই মাকেই গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনায় শিউরে উঠেছে বিবেকবান মানুষ। বিশেষ করে গত বৃহস্পতিবার ধামরাইয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া চার শিশুকে হাত-পা বেঁধে আফসার উদ্দিন নামের এক নরপশুর ধর্ষণের ঘটনা, একই উপজেলায় চকোলেটের প্রলোভন দেখিয়ে গোলাম মোস্তফা নামের এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি ধর্ষণ করেছেন প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া আরেক শিশুকে। গাজীপুরের শ্রীপুরে আপন চাচা ধর্ষণ করেছেন সাড়ে চার বছরের একটি শিশু মেয়েকে। সর্বশেষ রাজধানীর পল্লবীতে ১৫ দিন ধরে প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশুকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় সেলু নামের একজনকে মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করেছেন র্যাবের সদস্যরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো কিছু পাচ্ছি না। এককথায় বলতে গেলে এগুলো আমাদের কাছেও অপ্রত্যাশিত। যদিও এ ধরনের অপরাধীর কেউ কেউ বিভিন্ন রকম মানসিক অসুস্থতার ভেতরে থাকতে পারে। তবু এগুলো মানতে কষ্ট হয়।’

গত সেপ্টেম্বরে চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন ইন বাংলাদেশ-এর এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, শিশুর প্রতি সহিংসতার মাত্রা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। ওই তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন হাজার ৬৫৩টি শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। ওই হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৫৭টি শিশু। আগের বছরে প্রতি মাসে শিশু নির্যাতনের সংখ্যা ছিল ৩৮১টি। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬৯৭টি শিশু। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১০৪ জনকে। ১৬১ জনকে যৌন হয়রানি ও ২৮৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আত্মহত্যা করেছে ১৩৩ জন। অপহরণ করা হয়েছে ১৪৫ শিশুকে। নিখোঁজ হয়েছে ১০৪ জন।

অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান অনুসারে ধর্ষণের শিকার ৯০ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। আর সাত থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরাই বেশি নির্যাতনের শিকার। এর বিপরীতে দেখা যায়, ঢাকা জেলার পাঁচটি নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১৫ বছরে (২০০২-১৬) ধর্ষণসংক্রান্ত পাঁচ হাজার মামলার বিচারে সাজা হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশের।

শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের বাংলাদেশের পরিচালক ডা. ইশতিয়াক মান্নান বলেন, ‘কেবল এই কয়েক দিনের ঘটনাই নয়, সারা বছরই শিশুদের প্রতি এক ধরনের জঘন্য সহিংসতা ঘটতে দেখছি। সরকার বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হয়তো তাদের দায়িত্ব পালন করছে, কিন্তু সেটা ঘটনা ঘটার পরে। আমাদের সবাইকে মিলে ঘটনা প্রতিরোধে আরো কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সমাজের সব পর্যায়ে এ ধরনের সহিংসতা রোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে।’

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা