kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এক কিলোমিটারে ১৬১ কোটি টাকা!

আরিফুর রহমান   

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



এক কিলোমিটারে ১৬১ কোটি টাকা!

প্রকল্প ব্যয়ে বিশ্বরেকর্ড করে ফেলার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন যেন এ দেশের সরকারি কর্মকর্তারা। কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের একটি সড়ক নির্মাণে তিন হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা খরচ হবে; এমন প্রাক্কলন করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি সড়ক নির্মাণে খরচ হবে ১৬১ কোটি টাকা। এর আগে কিলোমিটারপ্রতি সর্বোচ্চ খরচ ধরা হয়েছিল ঢাকা-মাওয়া সড়ক নির্মাণে ১০১ কোটি টাকা; তবে সেই সড়কটি চার লেনের। দুই লেন কম হয়েও মাতারবাড়ীর খাসিয়াখালী পেট্রল পাম্প থেকে ধলঘাট মোড় পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি নির্মাণে আগের সব রেকর্ড ভেঙে কিলোমিটারপ্রতি ১৬১ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণে মাত্রাতিরিক্ত খরচ নিয়ে বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন মহল থেকে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রতিবেশী ভারত ও চীনে গড়ে যেখানে কিলোমিটারপ্রতি সড়ক নির্মাণে খরচ হয় ১১ কোটি থেকে ১৫ কোটি টাকার মধ্যে, বাংলাদেশে সেখানে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হয় ৫৫ কোটি থেকে ১০০ কোটি টাকার মধ্যে। মাতারবাড়ীতে প্রস্তাবিত দুই লেনের সড়ক নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের হিসাবও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

সড়ক নির্মাণের খরচ অতীতের রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার নেপথ্যে আসলে কী? কোথায় এবং কেনই বা সড়কটি নির্মাণে এত খরচ হবে, এর কারণ খুঁজতে যোগাযোগ করা হয় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে। জানা যায়, চট্টগ্রামসহ দেশে এখন যে কয়টি সমুদ্রবন্দর আছে, তার কোনোটিই গভীর সমুদ্রবন্দরের মানদণ্ডে নেই। গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় বড় বড় জাহাজ বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না। ডিপ ড্রাফট জাহাজের জেটি সুবিধা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চায় সরকার। সেই গভীর সমুদ্রবন্দর  থেকে পণ্য আনা-নেওয়া সহজ করতে ধলঘাট হতে খাসিয়াখালী পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুই লেনের সড়কটি হবে।

প্রস্তাবিত দুই লেনের সড়কের মতো সমজাতীয় পুরনো কিংবা চলমান কোনো প্রকল্প আছে কি না তার খোঁজ করতে গিয়ে দেখা যায়, পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে অনেক নিচু বা জলাভূমিতে পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে এক বছর আগে। সেই চার লেনের সড়কটিতে কিলোমিটারপ্রতি সরকারের খরচ হয়েছিল ৬০ কোটি টাকা। অথচ মাতারবাড়ীতে সমজাতীয় দুই লেনের সড়কটি নির্মাণে খরচ হবে পায়রা বন্দরের সড়কের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি। পায়রা বন্দরের সড়কটি হয়েছিল চার লেনের। আর মাতারবাড়ীতে সড়কটি হবে দুই লেনের। দুই লেনের সড়ক নির্মাণে যেখানে খরচ কম হওয়ার কথা, উল্টো সেখানে তিন গুণ বেশি খরচ ধরা হয়েছে। অথচ দুটি জায়গাই সমতল থেকে অনেক নিচুতে। সওজ অধিদপ্তরের আওতায় আরো কয়েকটি প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি কত খরচ হয়েছে তা বের করে দেখা গেছে, রংপুর থেকে হাটিকুমরুল চার লেনের সড়কটি কিলোমিটারপ্রতি খরচ পড়েছে ৫৫ কোটি টাকা। ঢাকা-সিলেট প্রস্তাবিত চার লেনের মহাসড়ক কিলোমিটারে ৬০ কোটি টাকা, ঢাকা-মাওয়া চার লেন সড়ক ১০১ কোটি, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হয়েছিল ২১ কোটি টাকা।

তাহলে কী কারণে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে দুই লেনের সড়কে খরচ এত বেশি হবে জানার জন্য গত ২ অক্টোবর যোগাযোগ করা হয় সওজ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শাফাকাত হাসানের সঙ্গে; তিনি এই প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালকও। তাঁর মতে, দেশের অন্য এলাকার মতো মাতারবাড়ী এলাকাকে সমানভাবে দেখা ঠিক হবে না। উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় সেখানকার মাটি অতিরিক্ত নরম। এই মাটি ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। তাই বালি আনতে হবে ২০ কিলোমিটার দূরত্বের সমুদ্র থেকে। তা ছাড়া মাতারবাড়ী এলাকাটি ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকা। তাই সড়কটি নির্মাণ করা হবে ২১ ফুট উঁচু করে। এই উচ্চতায় সড়কটি করতে প্রচুর বালুমাটির প্রয়োজন হবে। সমুদ্র থেকে ড্রেজিং করে বালু আনতে হবে প্রকল্প এলাকায়। তা ছাড়া বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এসব কারণে কিলোমিটারপ্রতি সড়ক নির্মাণের খরচ এত বেশি ধরা হয়েছে। তার পরও যখন দরপত্র আহ্বান করা হবে, তখন এর খরচ কমতে পারে বলেও আভাস দেন শাফাকাত হাসান।

সওজ অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) জাকির হোসেনও একই সুরে বলেন, মাতারবাড়ী এলাকায় মাটির শক্তি খুবই কম। সেখানে বালি দিতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ে যাতে পানি উঠতে না পারে সে জন্য উঁচু করে বাঁধ নির্মাণ করা হবে। সে কারণে কিলোমিটারপ্রতি খরচ বেশি হবে।

তবে এসব যুক্তির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে গত ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। ওই সভার কার্যবিবরণী কালের কণ্ঠ’র সংগ্রহে আছে।

সরকারের যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া করে থাকে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের সম্মতি নিয়েই যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উত্থাপন করা হয়। ১৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয়-সংবলিত ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন’ শিরোনামের প্রকল্পটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া করতে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছিল সওজ অধিদপ্তর। কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সারা দেশে সরকারের এখন দুই লেন ও চার লেনের যত প্রকল্প আছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে এই প্রকল্পের খরচ অস্বাভাবিক। দুই লেনের সড়ক হয়ে কিভাবে চার লেনের সড়কের চেয়েও বেশি খরচ হয়, তা নিয়েও ওই আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় প্রশ্ন তুলে কমিশন বলেছে প্রস্তাবিত খরচ কমিয়ে আনতে। না হলে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় ওঠানো হবে না।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত সচিব কাজী জাহাঙ্গীর আলম গত ২৪ সেপ্টেম্বর বলেন, ‘আমরা এই প্রকল্পের সমজাতীয় অন্য কিছু প্রকল্প পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, সেগুলোতে খরচ অনেক কম। দুই লেনের একটি সড়ক নির্মাণে এত খরচ হতে পারে না। আমরা খরচ যৌক্তিক করার কথা বলেছি। তা ছাড়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম দিন দিন বাড়বে। এটি এখনই চার লেন করা জরুরি। আমাদের মত, সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হোক।’

এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শাফাকাত হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা আমাদেরও রয়েছে। তবে এখনই নয়। অর্থনৈতিকভাবেও এখন চার লেন সড়ক করা ঠিক হবে না। পরবর্তী সময়ে করা হবে।’

১৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয়-সংবলিত ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন’ প্রকল্পটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই প্রকল্পের মোটা অঙ্কের টাকা খরচ ধরা হয়েছে ড্রেজিংয়ের পেছনে। এখানেও ঘনমিটারপ্রতি ড্রেজিংয়ে যে টাকা ধরা হয়েছে তা অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় ১১ লাখ ৩৬ হাজার ঘনমিটার মাটি ড্রেজার দিয়ে খনন করা হবে, যাতে খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘনমিটারপ্রতি ড্রেজিংয়ে খরচ হবে ১০ হাজার ৯৪২ টাকা। তথ্য নিয়ে দেখা গেছে, দেশের অন্যান্য এলাকায় ড্রেজিংয়ে ঘনমিটারপ্রতি খরচ হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। কিন্তু এই প্রকল্পে ঘনমিটারপ্রতি ড্রেজিংয়ের খরচ অস্বাভাবিক ধরা হয়েছে। মোংলা বন্দরের আউটার বারে পশুর নদের ড্রেজিংয়ে ঘনমিটারপ্রতি সরকারের খরচ হচ্ছে ৫৭০ টাকা। পটুয়াখালীতে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের রামনাবাদ চ্যানেলে প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিংয়ে ব্যয় হচ্ছে ৩৫০ টাকা। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা জাইকার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাতারবাড়ীর এই প্রকল্পে ঘনমিটারপ্রতি ড্রেজিংয়ে খরচ হওয়ার কথা চার ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩৪০ টাকা। যেখানে মোংলায় ৫৭০ টাকা, পায়রায় ৩৫০ টাকা ঘনমিটারে ড্রেজিংয়ে খরচ হচ্ছে, সেখানে মাতারবাড়ীতে কেন প্রায় ১১ হাজার টাকা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। অতিরিক্ত সচিব কাজী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘স্থান বা সমুদ্রভেদে এই খরচ দ্বিগুণ বা তিন গুণ হতে পারে। কিন্তু প্রতি ঘনমিটার ১০ হাজার ৯৪২ টাকা অস্বাভাবিক। আমরা এই খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার কথা বলেছি।’ প্রতি ঘনমিটারে এত অস্বাভাবিক খরচ কেন ধরা হয়েছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শাফাকাত হাসান বলেন, এটি প্রাক্কলিত হিসাব। যখন দরপত্র আহ্বান করা হবে, তখন এই খরচ কমে আসবে।

মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যার মধ্যে জাইকা ঋণ দেবে ১৩ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। বাকি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খরচ করা হবে। প্রকল্পটির এমন অস্বাভাবিক খরচ দেখে সেটা সংশোধন করে আনতে নৌ এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে জানিয়ে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন, এ তথ্যও ওই সভার কার্যবিবরণীতেই রয়েছে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা