kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অটোমেশনের সব যন্ত্র বিকল

আরিফুর রহমান   

১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অটোমেশনের সব যন্ত্র বিকল

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিবিএস সদর দপ্তরে এক বছর আগে বসানো থাম বায়োমেট্রিক মেশিন বিকল পড়ে আছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ১০ তলা ‘পরিসংখ্যান ভবন’-এর মূল গেটের সামনে বছরখানেক আগে বসানো হয়েছিল একটি স্ক্যানার মেশিন। উদ্দেশ্য ছিল, অবৈধ অস্ত্র, বোমা কিংবা নাশকতার কোনো কিছু নিয়ে কেউ যাতে ঢুকতে না পারে। মূল গেট দিয়ে ভবনের ভেতরে আরেক স্তর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে অ্যাকসেস কন্ট্রোল মেশিন বসানো হয়েছে, যাতে স্মার্ট কার্ড পাঞ্চ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে ঢুকতে পারেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে আসা-যাওয়ার সময়ের নথি সংরক্ষণের জন্য ১০ তলা ভবনের প্রতিটি তলায় বসানো হয়েছে থাম বায়োমেট্রিক। চুরি বা অন্য অপরাধ ঠেকাতে ১০ তলা ভবনের প্রতিটি তলায় বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। এ ছাড়া বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়গুলোও ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় এসেছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরিসংখ্যান ভবন আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টিত—এই যুক্তি তুলে ধরে আগারগাঁওয়ে বিবিএসের সদর দপ্তরের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চার বছর আগে হাতে নেওয়া ‘অপটিক্যাল ডাটা আর্কাইভ অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং’ প্রকল্পের আওতায় এসব কাজ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। প্রকল্পটির কাজ শেষ হয় গত বছর জুনে। এটি বাস্তবায়নে খরচ করা হয় ১৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

গত ২৭ আগস্ট ও ১৫ সেপ্টেম্বর আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে গিয়ে দেখা যায়, স্ক্যানার মেশিনের পাশে অলস বসে আছেন রেহানা ও সালমা নামের দুজন নিরাপত্তাকর্মী। তাঁদের মেশিনটি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢোকার সময় তাঁদের কাছে ‘স্ক্যানিং মেশিন কাজ করছে’—প্রশ্ন করলে তাঁরা বলেন, ‘জি না। মেশিন কাজ করছে না অনেক দিন ধরে।’

ভবনের ভেতর বসানো অ্যাকসেস কন্ট্রোল মেশিনেও কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্মার্ট কার্ড পাঞ্চ করতে দেখা গেল না। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, মেশিনটি নষ্ট।

প্রতিটি তলায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, থাম বায়োমেট্রিক যন্ত্র বেশির ভাগই কাজ করছে না। তাঁদের সেই পুরনো পদ্ধতিতেই হাজিরা বইয়েই সই দিতে হচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় হিসাব শাখার উপপরিচালক আব্দুল খালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা হাজিরা বই ব্যবহার করছি। থাম বায়োমেট্রিক যন্ত্রটি প্রথম প্রথম কয়েক দিন কাজ করেছে। কিছুদিন যাওয়ার পর দেখি, আর কাজ করছে না।’

বিবিএসের জাতীয় হিসাব শাখা, প্রশাসন শাখা, তথ্য ব্যবস্থাপনা শাখাসহ কয়েকটি শাখার হাজিরা বই সংগ্রহ করে দেখা গেল, একমাত্র সচিবের দপ্তর অর্থাৎ পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ ছাড়া সব শাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাজিরা বইয়ে সই করছেন। প্রশাসন শাখার এসআই মৃণাল কান্তি সাহা, অফিস সহায়ক আজগর আলী জানালেন, তাঁরা হাজিরা বইয়ে সই করছেন। থাম বায়োমেট্রিক কাজ করছে না।

১০ তলা ভবনের প্রতিটি তলায় বসানো সিসি ক্যামেরা বছর না ঘুরতেই বেশির ভাগ অকেজো হয়ে গেছে। অনেকগুলোর আবার স্টোরেজ শেষ। 

প্রকল্পের আওতায় দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পরিসংখ্যান ভবনে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার কথা। গত ১৬ সেপ্টেম্বর কথা হয় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার পরিসংখ্যান তদন্তকারী এস এম ইয়াহিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, অফিসে একটি কম্পিউটার আছে।  গ্রামীণফোনের মডেম ব্যবহার হরে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সারেন তিনি। মাসে এক হাজার টাকা খরচ হয় মডেমের পেছনে। লালমনিরহাট জেলা পরিসংখ্যান অফিসের উপপরিচালক ইমরান হোসেন প্রধান বলেন, ‘ইনফো সরকারের মাধ্যমে আমাদের এখানে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা অত্যন্ত দুর্বল। তাই আমরা মডেম ব্যবহার করি।’ কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা আবদুল আজিজ বলেন, ‘আমাদের এখানে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হলেও প্রায় সময় তা কাজ করে না। আমরা মডেম ব্যবহার করি।’

এই প্রকল্পের আওতায় সদর দপ্তরে স্থাপিত নেটওয়ার্ক ঠিকভাবে সংযোজন করা হয়েছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে বিবিএস। প্রকল্প শেষ হওয়ার এক বছর পর গত জুলাইয়ে এই চুক্তি হয়। জানতে চাইলে বুয়েটের কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোহরাব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিবিএসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি তাদের নেটওয়ার্ক ও সিকিউরিটি দেখার জন্য।’

‘কী দেখলেন, বুঝলেন’—প্রশ্ন করলে সোহরাব হোসেন বলেন, ‘যেহেতু আমরা সরকারি সংস্থাটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ, আমরা কিছু বলতে পারি না।’

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিবিএসের কর্মকর্তাদের বদলির তথ্য, কোন কর্মকর্তা কতবার বিদেশ সফর করেছেন সে তথ্য, শূন্য পদের হালনাগাদ তথ্য, বিবিএসে মোট কত জনবল আছে, কোন পদে কতজন কর্মরত আছেন, পদ ফাঁকা আছে কত, কারা কারা অবসরোত্তর ছুটিতে এলপিআরে যাবেন, সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতার হিসাব, পেনশন এ সবকিছু সংরক্ষণের জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরি করার কথা এই প্রকল্পের আওতায়। সফটওয়্যার তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্যই সংরক্ষণ করা হয়নি। এ ছাড়া বিবিএসের নিজস্ব যানবাহনের সংখ্যা, কম্পিউটার-ল্যাপটপের সংখ্যা, এসি-ফ্রিজ-টিভির সংখ্যা এবং এগুলো কোথায় আছে সেসব তথ্য সংরক্ষণের জন্য আলাদা একটি সফটওয়্যার তৈরি করার কথা। এখানেও সফটওয়্যার তৈরি করা হলেও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি।

বিবিএসের তথ্য ব্যবস্থাপনা শাখার পরিচালক এমদাদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব তথ্য এখনো সফটওয়্যারে সংরক্ষণ শুরু হয়নি, তবে প্রক্রিয়া চলছে।

এই প্রকল্পের আওতায় বেশ কয়েকটি সার্ভার কেনার কথা থাকলেও তা কেনা হয়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্পে মূলত পুকুরচুরি হয়েছে। বিষয়গুলো অত্যধিক কারিগরি হওয়ায় অনেকে বুঝতে পারেন না।

সার্বিক বিষয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ১০টায় কথা হয় প্রকল্প পরিচালক যতন কুমার সাহার সঙ্গে। তিনি ‘সফটওয়্যার কেনা হয়েছে, এটা ঠিক। তবে তা পুরোপুরি কাজ করছে না’ বলে স্বীকার করেন। তবে তিনি এ-ও দাবি করেন, সব কিছু তো একসঙ্গে কাজ করে না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নেওয়া থাম বায়োমেট্রিক কাজ না করার বিষয়টিও স্বীকার করেন যতন কুমার সাহা। এসব মেশিন বসানোর এক বছরের মাথায় কিভাবে নষ্ট হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা হয়েছে; তারা নষ্ট হয়ে যাওয়া মেশিন আবার ঠিক করে দেবে। তবে ভবনের ভেতরে ঢুকতে স্ক্যানার মেশিন চালু আছে বলে দাবি করেন তিনি; যদিও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, স্ক্যানার মেশিন অচল। প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তুললে তিনি বলেন, কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।

এই প্রকল্পে সফটওয়্যার তৈরি করে দিয়েছে সিনেসিস আইটি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব ছিল সফটওয়্যার তৈরি করে দেওয়া। আমরা সেটা করেছি। এখন সেটি যদি কেউ আপডেট না করে এবং তথ্য সংরক্ষণ না করে, সেটি আমাদের দেখার কাজ নয়। সেটি ক্লায়েন্টের কাজ। তারা যদি সেটি না করে আমাদের ওপর তার দায়ভার আসার কোনো যুক্তি নেই।’

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস সদর দপ্তর ভবনে এক বছর আগে বসানো স্মার্টকার্ড পাঞ্চ মেশিন বিকল পড়ে আছে।   ছবি : কালের কণ্ঠ

 

বিবিএস সদর দপ্তর ভবনে এক বছর আগে বসানো স্ক্যানার মেশিন বিকল।     ছবি : কালের কণ্ঠ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা