kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভর্তি পরীক্ষার জন্য আন্দোলন শিথিল

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

১৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভর্তি পরীক্ষার জন্য আন্দোলন শিথিল

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষার জন্য শিথিল করা হয়েছে আন্দোলন। আগামীকাল সোমবার প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) ভর্তি পরীক্ষা হবে। ফলে আজ রবিবার ও কাল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শিথিল থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এমনকি ভর্তি পরীক্ষায় তাঁরা সহায়তা করবেন বলেও জানিয়েছেন। গতকাল শনিবার দুপুর আড়াইটায় বুয়েটে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ওই ঘোষণা দেন ১৫তম ব্যাচের মাহমুদুর রহমান সায়েম।

গত শুক্রবার বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি মেনে নেন। তা সত্ত্বেও গতকাল সকাল থেকে পাঁচ দফা দাবিতে নোটিশ জারির জন্য আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। তবে গতকাল কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে জাতীয় মহিলা শ্রমিক লীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব দাবি মেনে নেওয়ার পরও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই।’ তিনি বলেন, ‘বুয়েটে হত্যাকাণ্ডের পর কারো আন্দোলনের জন্য অপেক্ষা করি নাই, প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেওয়া হয়।’

সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে এবং গত শুক্রবারের দেওয়া পাঁচ দফা দাবির বিষয়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখে আস্থা ফিরেছে শিক্ষার্থীদের। এ কারণে আন্দোলন শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, এই দুই দিন তাঁরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। ভর্তি পরীক্ষার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখবেন এবং পরীক্ষার্থীদের সার্বিক সহায়তা করবেন। প্রধানমন্ত্রীর ওপর শিক্ষার্থীদের আস্থা আছে বলেও তিনি জানান।

ওই সময় আন্দোলন প্রসঙ্গে সায়েম জানান, দুই দিনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানাবেন তাঁরা। তিনি বলেন, ‘১০ দফার আন্দোলন চলমান। শুধু পাঁচ দফার বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখে এবং ভর্তীচ্ছুদের কথা বিবেচনা করে দুই দিনের জন্য আন্দোলন শিথিল করা হয়েছে।’

এর আগে শিক্ষার্থীদের দেওয়া পাঁচ দফা দাবি মেনে নোটিশ জারি করে বুয়েট প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. সাইদুর রহমান ওই সব নোটিশে সই করেন। নোটিশগুলো গতকাল প্রকাশ করা হলেও তাতে আগের দিনের তারিখ রয়েছে। গতকাল দুপুরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়। 

মামলার খরচ, আবরারের পরিবারকে অর্থ সহায়তা : প্রথম নোটিশে বলা হয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে নিষিদ্ধ করা হলো। দ্বিতীয় নোটিশে বলা হয়, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা চলাকালীন সব খরচ বুয়েট প্রশাসন বহন করবে এবং আবরার ফাহাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে।

অভিযোগের জন্য অনলাইন : তৃতীয় নোটিশে বলা হয়, র্যাগের নামে ছাত্রদের নির্যাতনের ঘটনাসংক্রান্ত অভিযোগ জমাদান ও প্রকাশ করার একটি ওয়েব বেইসড পোর্টাল তৈরি করা হবে যাতে যেকোনো ছাত্র একটি ফরমের মাধ্যমে তার অভিযোগ অনলাইনে জমা দিতে পারবে। অভিযোগগুলো পর্যবেক্ষণ করে ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া সব হলের প্রতিটি ফ্লোরের সব উইংয়ের দুই পাশে প্রয়োজনীয় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।

চতুর্থ নোটিশে বলা হয়, গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদের অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনার মামলায় এজাহারভুক্ত ১৯ জনকে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হলো। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। চলমান তদন্ত শেষে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের পর ডিসিপ্লিনারি বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সিন্ডিকেটের অনুমোদনের মাধ্যমে দোষীদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে। এ ছাড়া আদালতের বিচারে এই মামলায় অন্য কেউ সাজাপ্রাপ্ত হলে তাকেও স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে।

র্যাগিং করলে ব্যবস্থা : পঞ্চম নোটিশে বলা হয়, অবৈধভাবে যারা আবাসিক হলের সিট দখল করে আছে তাদের অতিসত্বর হলের সিট খালি করা, ছাত্রসংগঠনগুলোর অফিসরুম বন্ধ করে তা সিলগালা করার জন্য ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ব্যবস্থা নেবেন। শনিবার থেকেই উল্লিখিত কাজগুলো শুরু করার কথাও বলা হয়। ভবিষ্যতে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি করার কেউ চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিন লঙ্ঘনের দায়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে র্যাগিং বা ছাত্র নির্যাতনের অভিযোগ এলে তা ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে দ্রুত বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অবৈধ দখলে থাকা কক্ষ উদ্ধার : জানা যায়, গতকাল থেকেই বুয়েটের বিভিন্ন হলে অবৈধভাবে দখলে থাকা কক্ষগুলো উদ্ধার শুরু করে প্রশাসন। সবার আগে আহসানউল্লাহ হলের দুটি এবং শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষ উদ্ধার করে সিলগালা করা হয়। এর মধ্যে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি জামী-উস সানির অবৈধভাবে দখল করে রাখা আহসানউল্লাহ হলের কক্ষও সিলগালা করা হয়।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, তাঁদের পাঁচ দফা দাবি মেনে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বুয়েট কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে এবং পরে অভিযোগপত্রে যাঁদের নাম আসবে তাঁদের স্থায়ীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করার দাবিও কর্তৃপক্ষ মেনে নিয়েছে। বুয়েটে সব রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন হলে অবৈধ দখলে থাকা কক্ষ সিলগালা করা হয়েছে। হলে হলে সিসিটিভি লাগানোর কাজ চলছে। আর বুয়েটে র্যাগের নামে নির্যাতনের ঘটনাসংক্রান্ত অভিযোগ প্রকাশের জন্য একটি ওয়েব পোর্টাল তৈরির ব্যাপারে কাজ শুরু হয়েছে। তবে এতে কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। তাই দুই দিনের জন্য আন্দোলন শিথিল করা হয়েছে। তবে ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন চলবে।

গত শুক্রবার বিকেলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ, এজাহারভুক্ত ১৯ আসামি বহিষ্কারসহ ১০ দফা দাবি মেনে নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। তবে আলোচনার শেষ দিকে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, বুয়েট কর্তৃপক্ষের পক্ষে যতগুলো দাবি সরাসরি মেনে নেওয়া সম্ভব, সেগুলো বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা যেন স্থগিত করা হয়। কিন্তু উপাচার্যের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তবে শুক্রবার রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তাত্ক্ষণিক মেনে নেওয়া সম্ভব এমন পাঁচ দফা দাবি মেনে নেওয়ার নোটিশ জারি করার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। সে অনুযায়ী গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা নানা স্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলেন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। তবে এর কিছুক্ষণ পরই দুপুরে নোটিশ জারি হলে আড়াইটার দিকে কর্মসূচি শিথিল করার ঘোষণা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা