kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

পাগলা মিজান গ্রেপ্তার

বাসায় কোটি কোটি টাকার এফডিআর, ব্যাংকের চেক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাসায় কোটি কোটি টাকার এফডিআর, ব্যাংকের চেক

ক্যাসিনো কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। মৌলভীবাজার সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার সময় গতকাল শুক্রবার ভোরে তাঁকে আটক করা হয়।

মিজানকে ঢাকায় আনার পর গতকাল বিকেলে তাঁর কার্যালয় ও বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। তাঁর বাসা থেকে এক কোটি টাকার এফডিআর ও মোট ছয় কোটি ৭৭ টাকার অঙ্ক লেখা বিভিন্ন ব্যাংকের চেক উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে শ্রীমঙ্গল থেকে মিজানকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁর হেফাজত থেকে নগদ দুই লাখ টাকা ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের বলেন, চলমান জুয়া ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে হাবিবুর রহমান মিজানকে আটক করা হয়েছে। কাউন্সিলর মিজান দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে গতকাল ভোরে তাঁকে আটক করা হয়।

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, ঢাকা থেকে আসা র‌্যাব-২-এর একটি বিশেষ দল গতকাল ভোরে শ্রীমঙ্গল পৌর এলাকার গুহ রোডের প্রয়াত ফজলুর রহমানের বাসা থেকে কাউন্সিলর মিজানকে আটক করে।

ফজলুর রহমানের স্ত্রী নূরজাহান বেগম সাংবাদিকদের জানান, মিজান তাঁর মেয়ের জামাই মোস্তাক আহম্মদের বন্ধু। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মিজান তাঁদের বাসায় আসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে শুধু একটিমাত্র ব্যাগ ছিল। গতকাল সকালে তাঁর সিলেটে মাজার জিয়ারতে যাওয়ার কথা ছিল। এর আগে ফজরের আজানের পরই র‌্যাব সদস্যরা তাঁকে আটক করে নিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘খারাপ লোক জানলে মিজানকে বাসায় ঢুকতে দিতাম না।’

নূরজাহান বেগমের মেয়ে শিউলি বেগমের স্বামী মোস্তাক সাত বছর আগে মারা যান। শিউলি বেগম বলেন, তাঁর স্বামীর সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে মিজান কয়েকবারই তাঁদের বাসায় এসেছিলেন। আগে যতবারই তিনি এসেছেন, প্রাইভেট কার নিয়ে এসেছেন। কিন্তু এবার তিনি বাসে এসেছেন। তাঁর কাছে হানিফ বাসের টিকিট দেখেছেন তাঁরা।

মিজানের অফিস ও বাসায়

অভিযান : গতকাল বিকেল ৪টার দিকে লালমাটিয়ায় মিজানের কার্যালয় এবং মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডের বাসায় তল্লাশি শুরু করে র‌্যাব। সন্ধ্যা ৬টার পর অভিযান শেষে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম ক্ষমতাসীন দলের এই নেতার হেফাজত থেকে উদ্ধার সামগ্রীর তথ্য জানান।

ম্যাজিস্ট্রেট জানান, মিজানের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে এক কোটি টাকার এফডিআর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তাঁর স্বাক্ষরসংবলিত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের বেশ কয়েকটি চেক উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলোতে লেখা টাকার অঙ্ক যোগ করে মোট ছয় কোটি ৭৭ লাখ টাকার হিসাব পাওয়া গেছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাসা থেকে এফডিআর ও চেক উদ্ধারের আগে শ্রীমঙ্গলে গ্রেপ্তারের সময় মিজানের কাছে নগদ দুই লাখ টাকা এবং চার রাউন্ড গুলিসহ একটি পিস্তল পাওয়া যায়।

সারওয়ার আলম বলেন, ‘মিজান চেক দিয়ে গত বৃহস্পতিবার ব্যাংক থেকে নগদ ৬৮ লাখ টাকা তুলেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, ঢাকার মোহাম্মদপুরে তাঁর তিনটি বাড়ি রয়েছে। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসেও তাঁর একটি বাড়ি রয়েছে বলে জানতে পেরেছেন তাঁরা।

ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘টেক্সাসের ওই বাড়ি এবং মিজানের বিরুদ্ধে ফ্রিডম পার্টি সংশ্লিষ্টতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলা রয়েছে কি না সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’ মিজানকে এখন শ্রীমঙ্গলে নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রীমঙ্গল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ও অর্থ পাচার আইনে দুটি মামলা হবে।

মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক কারবার, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের চলমান ‘শুদ্ধি অভিযানের’ মধ্যে হঠাৎ করেই লাপাত্তা হন তিনি। এই পাগলা মিজানকে নিয়ে কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

যেভাবে মিজানের উত্থান :  জানা যায়, ১৯৭৪ সালে ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় আসেন মিজানুর রহমান। শুরুতে মিরপুরে হোটেল বয়ের কাজ নেন। এরপর মোহাম্মদপুর এলাকার ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি শুরু করেন। চুরি করা সেই ঢাকনাই আবার বিক্রি করতেন সিটি করপোরেশনে। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি খামারবাড়ি খেজুরবাগান এলাকায় ছিনতাই করতে গেলে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে লালমাটিয়ায় মসজিদের পাশে পুকুরে নেমে পড়েন। কয়েক ঘণ্টা পর কোনো কাপড় ছাড়াই উঠে আসেন। এ কারণে পুলিশ তাঁকে ‘পাগলা’ আখ্যা দিয়ে ছেড়ে দেয়। তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে ‘পাগলা মিজান’ হিসেবে। পরে তিনি ফ্রিডম পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ফ্রিডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা চালায় একটি চক্র। এ সময় শেখ হাসিনা বাড়ির ভেতর অবস্থান করছিলেন। এ ঘটনায় ধানমণ্ডি থানায় একটি মামলা করা হয়। এ মামলার অভিযোগপত্রে পাগলা মিজানকে হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে মিজানুর রহমান নিজের নাম পাল্টে হয়ে যান হাবিবুর রহমান মিজান। যোগ দেন আওয়ামী লীগে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা