kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে পিটিয়ে হত্যা

বুয়েটে নিষিদ্ধ ছাত্র শিক্ষক রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বুয়েটে নিষিদ্ধ ছাত্র শিক্ষক রাজনীতি

প্রিয় বন্ধু, সহপাঠী আবরারের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা। গতকাল বুয়েটে ভিসির সঙ্গে আন্দোলনরতদের বৈঠকের আগে। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার হত্যায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আলোচনার পর ১০ দফা দাবির সবকটি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু দাবি বাস্তবায়ন হওয়ার আগ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আলোচনার শেষ দিকে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, বুয়েট কর্তৃপক্ষের পক্ষে যতগুলো দাবি সরাসরি মেনে নেওয়া সম্ভব, সেগুলো বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত আগামী সোমবার অনুষ্ঠেয় ভর্তি পরীক্ষা যেন স্থগিত করা হয়। কিন্তু উপাচার্যের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। রাত সাড়ে ১১টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা নতুন করে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। তাঁরা বলেন, ‘উপাচার্যের শেষ মুহূর্তের অনুরোধ ও সারা দেশ থেকে যেসব ছোট ভাই-বোনেরা বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের কথা বিবেচনা করে আমরা স্বল্প সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য পাঁচটি দাবি বাস্তবায়িত হলে ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে বুয়েট প্রশাসনের সঙ্গে একমত হব।’ পাঁচ দফা দাবিতে আজ শনিবার সকাল ১১টা থেকে ফের কর্মসূচিতে নামবেন তাঁরা।

উপাচার্যের পক্ষ থেকে এজাহারভুক্ত ১৯ আসামিকে সাময়িক বহিষ্কার, বুয়েটে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। বেশ কিছু দাবি বাস্তবায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে নেই বলে তিনি সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান। এমনকি সরকার তাঁকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসও দিয়েছে বলে জানান। গতকাল শুক্রবার বিকেল সোয়া ৫টায় বুয়েট মিলনায়তনে এই সভা শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় ১০ দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েট উপাচার্য সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আবরার ফাহাদ হত্যায় এজাহারভুক্ত ১৯ আসামিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্থায়ী বহিষ্কারের ব্যাপারেও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি থাকবে না। আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং মামলার খরচ বুয়েট কর্তৃপক্ষ বহন করবে। বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে সরকারকে চিঠি দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আপডেটও জানানো হবে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে সরকারের পক্ষ থেকে এত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এর আগে আমি দেখিনি। সরকার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে আশ্বস্ত করেছে।’

উপাচার্য আরো বলেন, ‘বুয়েটে র‌্যাগিং বন্ধ হবে। আর আগের ঘটনাগুলোর জন্য শেরেবাংলা হল ও আহসানউল্লাহ হল থেকে দুটি কমিটি ও কেন্দ্রীয়ভাবে আরেকটি কমিটি করা হবে। তাদের সিদ্ধান্তের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর যদি কোনো ঘটনা ঘটে সে ব্যাপারেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি ফ্লোরে সিসি ক্যামেরা বসবে। আর এরই মধ্যে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্ট পদত্যাগ করেছেন।’

আবরারের জানাজায় অংশগ্রহণ না করার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে সব সময়ই সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে কথা বলেছি। তবে আবরারের মরদেহ যে ক্যাম্পাসে আনা হবে তা আমার জানা ছিল না। অনেকটা মিস কমিউনিকেশনের কারণে আমি জানাজায় উপস্থিত হতে পারিনি। এ জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’

অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা একটি দুঃখজনক ঘটনার জন্য একত্রিত হয়েছি। আমরা শোকে বিহ্বল। আমার ঘাটতি ছিল, পিতৃতুল্য হিসেবে আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। সামনে ভর্তি পরীক্ষা। অভিভাবকরা এই পরীক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন। সফলভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য তোমাদের সহায়তা চাচ্ছি।’

স্থায়ী বহিষ্কারের ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘স্থায়ী বহিষ্কার করতে হলে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হয়। তাদের প্রতিবেদন শৃঙ্খলা বোর্ডে যায়। এরপর বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট স্থায়ী বহিষ্কার করবে। আমরা সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছি। শনিবারই তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।’

আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে উপাচার্য বলেন, ‘আবরারের পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু সরকারের টাকায় চলে, তাই আমি উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করেছি। আবরারের পরিবার থেকে একটি আবেদন দিলে তা নিয়ে আমরা প্রক্রিয়া শুরু করব। সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করব।’

ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দলের কাছে অনুরোধ করব, তারা যেন বুয়েটে কোনো কমিটি না দেয়। আর যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা হয়েছে, তাই কেউ নিজেকে ছাত্রনেতা হিসেবে দাবিও করতে পারবে না। এমনকি শিক্ষক রাজনীতিও বন্ধ করা হলো।’

বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক কে এম মাসুদ গত বুধ ও বৃহস্পতিবার তাঁদের সংগঠনের পক্ষ থেকে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। গতকাল উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠককালে তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘সামনে ভর্তি পরীক্ষাসহ আরো কিছু অবস্থা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করব।’

বুয়েট ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবাই যদি অঙ্গীকারবদ্ধ হই, তাহলে আর কোনো সমস্যা হবে না। সামনে মিডটার্ম পরীক্ষা। আন্দোলনের কারণে অনেকে পড়ালেখা করতে পারেনি। তাই মিডটার্ম পরীক্ষার তারিখও পুনর্নির্ধারণ করা হবে।’

আবরার ফাহাদ হত্যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলটিমেটামের শেষ দিন ছিল গতকাল। আলটিমেটাম না মানলে বুয়েটে তালা ঝুলানোর আলটিমেটাম দিয়ে রেখেছিলেন শিক্ষার্থীরা। এমন পরিস্থিতিতে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। গতকাল বিকেল সোয়া ৫টায় বুয়েট কেন্দ্রীয় অডিটরিয়ামে উপস্থিত হন উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক কে এম মাসুদ, ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মীজানুর রহমান ও বিভিন্ন অনুষদের ডিনরা। মিলনায়তনে শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার শুরুতে আবরারের রুহের মাগফিরাত কামনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

আবরারের খুনিদের ফাঁসিসহ শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি নিয়ে শুধু বুয়েটের বর্তমান শিক্ষার্থীদের (১৫তম, ১৬তম, ১৭তম ও ১৮তম ব্যাচ) সঙ্গে আলোচনায় বসেন উপাচার্য। এর আগে গণমাধ্যমের সামনে আলোচনা করতে রাজি না হলেও অনেক আলোচনা ও আন্দোলনের পর গণমাধ্যমের সামনে আলোচনা করতে রাজি হয়েছেন উপাচার্য।

উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনায় বুয়েটের শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেখে মিলনায়তনে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। টেলিভিশন চ্যানেল, দৈনিক পত্রিকা ও পরিচিত অনলাইন গণমাধ্যমের দুজন করে সংবাদকর্মীকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। আলোচনা চলাকালে সরাসরি সম্প্রচার করতে দেওয়া হয়নি। তবে আলোচনা শেষে প্রচারের জন্য ভিডিও নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।

এদিকে গতকাল সকাল থেকেই আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে টানা পঞ্চম দিনের মতো বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টায় তাঁরা ১০ দফা দাবিতে বুয়েটের শহীদ মিনার চত্বরে সমবেত হলে স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি মাহমুদুর রহমান সায়েম সকাল সোয়া ১১টায় শহীদ মিনার চত্বরের সমাবেশ থেকে বলেন, ‘আমরা যে ১০ দফা দাবি দিয়েছি, এখনো এর দৃশ্যমান অগ্রগতি আমরা দেখিনি। দাবিগুলো বাস্তবায়নে সদিচ্ছার অভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে উপাচার্য সবার উপস্থিতিতে আলোচনায় সম্মত হয়েছেন। এ জন্য আমরা শুক্রবার দুপুর ২টা পর্যন্ত যে আলটিমেটাম দিয়েছিলাম, তা বাড়িয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত করা হলো। তবে দাবি মানা না হলে বুয়েটের সব ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।’

গতকাল মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি দুপুরে প্রতিবাদী পথনাটক ও গ্রাফিতি আঁকার কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া বুয়েট ডিবেটিং ক্লাবের আয়োজনে একটি প্রতীকী বিতর্কেরও আয়োজন করা হয়।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নতুন পাঁচ দফা

১. আবরার হত্যায় জড়িত সবাইকে সাময়িক বহিষ্কার করতে হবে। চার্জশিটে যাঁদের নাম আসবে তাঁদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে মর্মে বুয়েট প্রশাসনকে নোটিশ জারি করতে হবে।

২. আবরার হত্যা মামলার সব খরচ বুয়েট প্রশাসন বহন করবে এবং আবরারের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে প্রশাসন বাধ্য থাকবে। এটিও নোটিশে লেখা থাকতে হবে।

৩. অবৈধভাবে হলে থাকাদের উত্খাত করতে হবে এবং রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর অফিস রুম সিলগালা করতে হবে। বুয়েটে সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পরও যদি কেউ ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত হন বা ছাত্র নির্যাতনে জড়িত হন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর কী ব্যবস্থা নেবে, তার জন্য বিস্তারিত নোটিশ জারি করতে হবে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্সে যুক্ত করা হবে—এটি নোটিশে উল্লেখ থাকতে হবে।

৪. বুয়েটে আগে ঘটে যাওয়া ছাত্র নির্যাতন, হয়রানি ও রাগের ঘটনা প্রকাশের জন্য বিআইআইএস একটি কমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। সেটি মনিটর করা ও শাস্তি বিধানের জন্য একটি কমিটি গঠন করতে হবে। এই বিষয়গুলোও নোটিশে উল্লেখ থাকতে হবে।

৫. প্রতিটি হলের সব ফ্লোরে সবদিকে সিসিটিভি স্থাপন করতে হবে এবং সিসিটিভি ফুটেজ ২৪ ঘণ্টা মনিটর করতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা