kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

ম্যাসেঞ্জারে ১৭ জনের কথোপকথন

অবশেষে অমিতসহ আরো তিনজন গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ম্যাসেঞ্জারে ১৭ জনের কথোপকথন

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনার আগে আসামিদের মধ্যে অন্তত ১৭ জন নিজেদের মধ্যে এ বিষয়ে ‘ম্যাসেঞ্জারে’ কথা বলেছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা পুলিশ সেই তথ্যও পেয়েছে।

আসামিদের মধ্যে দোষ স্বীকার করে বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সমাজসেবা বিষয়ক উপসম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আবরার হত্যা মামলার প্রথম কোনো আসামি অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিলেন। একই দিন অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহাসহ আরো তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এসবিএইচএসএল নামে ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে কথোপকথন : বুয়েটের শেরেবাংলা হল শাখা ছাত্রলীগের একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ রয়েছে। সেটির নাম এসবিএইচএসএল (শের-ই-বাংলা হল ছাত্রলীগ)। শনিবার রাতে ছাত্রলীগ নেতাদের এই গ্রুপে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন লেখেন, ‘সেভেন্টিনের আবরার ফাহাদ। মেরে হল থেকে বের করে দিবি দ্রুত। এর আগেও বলেছিলাম। তোদের তো দেখি বিগার নাই। শিবির চেক দিতে বলেছিলাম। দুই দিন টাইম দিলাম।’ এরপর একজন সেখানে লেখেন, ‘ওকে ভাই’। রবিন আবার লেখেন, ‘দরকার হলে ১৬তম ব্যাচের মিজানের সঙ্গে কথা বলবি। ও তার সঙ্গে শিবিরের ইনভলভমেন্ট থাকার প্রমাণ দিবে।’ ম্যাসেঞ্জার গ্রুপেই রবিবার রাত ৭টা ৫২ মিনিটে সবাইকে হলের নিচে নামার নির্দেশ দেন রবিন। এর পরই রাত ৮টা ১৩ মিনিটে আবরার ফাহাদকে তাঁর রুম থেকে ডেকে নিয়ে যান তানিম, বিল্লাহ, অভি, সাইফুল, রবিন, জিওন ও অনিক। রাত ১টা ২৬ মিনিটে ইফতি মোশাররফ সকাল ম্যাসেঞ্জারে লেখেন, ‘মরে যাচ্ছে, মাইর বেশি হয়ে গেছে। এখন আমরা কী করব?’ রবিন বলেন, ‘শিবির বলে পুলিশের হাতে তুলে দে।’

রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে ‘এসবিএইচএসএল ১৬+১৭’ গ্রুপ নামের আরেকটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা লেখেন, ‘আবরার ফাহাদ কি হলে আছে?’ জবাবে শামসুল ও সজীব জানান, ‘২০১১-তে আছে।’ এ কক্ষেই অমিত সাহা থাকেন। মেসেঞ্জারে অন্য আরেকটি কথোকথন পাওয়া গেছে, যা ছিল অমিত সাহা ও ইফতি মোশাররফ সকালের মধ্যে। এতে অমিত সাহা লিখেছেন, ‘আবরার ফাহাদের ধরছিলি তরা?’ ইফতি জবাব দেন, ‘হ’। আবার প্রশ্ন করেন অমিত, ‘বের করছোস?’ জবাবে ইফতি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কী হল থেকে নাকি স্বীকারোক্তি।’ এবার অমিত লেখেন, ‘স্বীকার করলে তো বের করা উচিত।’ এরপর ইফতি জবাব দেন, ‘মরে যাচ্ছে; মাইর বেশি হয়ে গেছে।’ জবাবে অমিত সাহা লেখে, ‘ওওও বাট তাকে তো লিগ্যালি বের করা যায়।’

আবরার ‘শিবির’ বলে প্রচার করেন অমিত ও মিজান : ‘আবরার ফাহাদ একজন শিবিরকর্মী। সব সময় সরকারবিরোধী কথাবার্তা বলে। তার আসলে একটা শিক্ষা হওয়া দরকার।’ এই কথা বেশ কিছুদিন ধরে ছাত্রলীগ নেতাদের বলে আসছিলেন অমিত সাহা ও মিজানুর রহমান মিজান। এরপর থেকে ছাত্রলীগ নেতারা তাঁকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ইফতির স্বীকারোক্তি : গতকাল সকালে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন রিমান্ডে থাকা ইফতি। হাকিম সাদবির ইয়াসির আহসান চৌধুরী তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ঘটনার পর ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত ইফতিকে গত মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান তাঁকে আদালতে হাজির করে জবানবন্দি গ্রহণের আবেদন জানান। জবানবন্দি দেওয়ার পর ইফতিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, আবরারকে মারধর করার বিষয়ে কার কী ভূমিকা ছিল তা বিশদভাবে হাকিমের কাছে বর্ণনা করেছেন ইফতি। তবে ঠিক কী কারণে আবরারকে হত্যা করা হলো সে বিষয়ে তিনি কী বলেছেন তা জানা যায়নি।

ইফতি তাঁর জবানবন্দিতে বলেছেন, মেহেদী হাসান রাসেল, অনিক সরকারসহ ২০-২৫ জন আবরারকে মারধর করে। ক্রিকেট খেলার স্টাম্প, মশারি টাঙানোর লোহার রড দিয়ে আঘাত করার পাশাপাশি কিল, ঘুষি, চড়-থাপ্পড় দেওয়া হয়। এক দল মারধর করে বেরিয়ে গেলে আরেক দল এসে মারধর করে। বাইরে থেকে আবার তারা ফিরে এসে মারধর করে। এভাবে দফায় দফায় আবরারকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর তাঁকে ওই কক্ষ থেকে বের করে নেওয়া হয়। এরপর ডাক্তার ডাকা হয়। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানান আবরারের মৃত্যু হয়েছে।

গত রবিবার রাতে বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরারকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অমিতসহ আরো তিনজন গ্রেপ্তার : আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে অমিত সাহাসহ আরো তিনজনকে গতকাল গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য দুজন হলেন আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমান মিজান ও এজাহারভুক্ত আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহা। তাঁদের মধ্যে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে অমিতকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাঁকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

ডিবি সূত্র জানিয়েছে, সেদিন আবরারকে ওই কক্ষে ডেকে নেওয়ার আগে অমিত মেসেঞ্জারে তাঁর এক সহপাঠীর কাছে আবরারের খোঁজ করেন, যার স্ক্রিনশট পরে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

শেরেবাংলা হল থেকেই আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিজান বুয়েটের ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

মামলার এজাহারভুক্ত ১১ নম্বর আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহাকে গাজীপুরের মাওনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তোহাও থাকতেন শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে। তিনি হল শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির পাশাপাশি আবরার হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে ডিবি। এই তিনজনকেও রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে ডিবি সূত্র।

পুলিশের ব্রিফিং : গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনসহ আলোচিত এ ঘটনার বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আবরার হত্যার মোটিভ এখনো পরিষ্কার নয়। এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথম দফায় গ্রেপ্তার হওয়া বুয়েটের ১০ শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য-প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে তারাও ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।’

মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ঘটনাস্থলে হয়তো অমিত সাহা উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে আবরার হত্যায় তাঁর পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। তদন্ত পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে তা উঠে এসেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা