kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে পিটিয়ে হত্যা

দাবি না মানলে ক্যাম্পাসে তালা

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



দাবি না মানলে ক্যাম্পাসে তালা

ভিসির পদত্যাগের আলটিমেটাম ও ১০ দফা দাবিতে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা গতকালও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যায় শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি আদায়ের আলটিমেটাম আজ শুক্রবার দুপুর ২টায় শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিকেল ৫টায় উপাপচার্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বৈঠক হচ্ছে। তবে বৈঠকে সমঝোতা না হলে অর্থাৎ দাবি মানা না হলে বুয়েটের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এমনকি আগামী সোমবারের ভর্তি পরীক্ষাও বন্ধ করার হুমকি দিয়ে রেখেছেন তাঁরা।

এদিকে আবরার হত্যার ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত ১৬ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, শিগগিরই নির্ভুল ও নিখুঁত অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেছেন, আবরার হত্যাকাণ্ডে যাদের নাম বেরিয়ে আসবে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।

গতকাল চতুর্থ দিনের মতো বুয়েট ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ওই কর্মসূচি চলে। আজ শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে আবারও আন্দোলন শুরু করবেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড়। এর পাশাপাশি কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে আবরারের ছোট ভাই ও তাঁর পরিবারের ওপর পুলিশের হামলার বিচারও দাবি করেছেন তাঁরা।

দাবি মেনে নিতে শিক্ষার্থীদের দেওয়া আলটিমেটাম শেষ হওয়ার কথা ছিল আজ দুপুর ২টায়। তবে গত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আজ বিকেল ৫টায় তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসবেন। এর আগেই অবশ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে পুরো ক্যাম্পাসে তালা লাগানোর এবং ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন শিক্ষার্থীরা।

গতকাল বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা কমিটির বৈঠক ছিল। বৈঠক শেষে রাতে কমিটির সভাপতি অধ্যাপক কানাই লাল সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভর্তি কমিটির নিয়মিত বৈঠক ছিল। আর আমাদের এই কমিটি পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এই সিদ্ধান্ত শুধু সিন্ডিকেটই নিতে পারে।’

জানা যায়, শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা, আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে জড়িতদের ফাঁসি দেওয়া, হল প্রাধ্যক্ষকে প্রত্যাহার, র‌্যাগিংয়ের নামে বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের স্থায়ীভাবে ছাত্রত্ব বাতিল, র‌্যাগিং বন্ধ করতে আগের মারধরের ঘটনা জেনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং আবরার হত্যা মামলার ব্যয়ভার প্রশাসনের বহন করা। যদিও গত বুধবারই শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এখনো আদেশ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সে দাবি তাঁদের তালিকা থেকে বাদ দেননি।

তবে অদক্ষতা ও নির্লিপ্ততার অভিযোগে বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ, বুয়েটে শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে প্রশাসনের সহায়তাসহ সাতটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষক সমিতি। এ ছাড়া উপাচার্য যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে সরকার যেন তাঁকে অপসারণ করে সে সিদ্ধান্তও নিয়েছে সমিতি। গতকাল বিকেল পৌনে ৩টার দিকে বুয়েট শহীদ মিনারের পাশে শিক্ষক সমিতির নেতা ও অন্য শিক্ষকরা ওই সাত সিদ্ধান্তের কথা জানান। গত বুধবার শিক্ষক সমিতির এক জরুরি সভায় ওই সাত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা হাততালি দিয়ে শিক্ষকদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। এমনকি গত বুধবার বুয়েটের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীও আন্দোলনস্থলে উপস্থিত হয়ে উপাচার্যের পদত্যাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি বন্ধসহ সাত দফা দাবি জানান। 

কিন্তু গতকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ‘বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ড ছাড়াও এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে, তখন শিক্ষক সমিতি ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন কোথায় ছিলেন? তখন তাঁরা কেন আন্দোলনে নামেননি? কেন এখন সবাই মিলে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন? এটি আমার কাছে রহস্যজনক।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘ভিসির আর কয়েক মাস মেয়াদ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে সরানো হবে কি হবে না সেটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু করণীয় নেই। তবে আবরার ঘটনায় আমি লজ্জিত। মেধাবী এমন একজন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মারায় দেশের মানুষ মর্মাহত।’

দিনভর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : গতকাল দিনভর বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের পক্ষ থেকে উপাচার্যের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে উপাচার্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গণমাধ্যম ছাড়া কাউন্সিল অফিসে আলোচনায় বসতে রাজি বলে জানানো হয়। তবে শিক্ষার্থীরা সেটি মেনে নেননি, সবার উপস্থিতিতে আলোচনার দাবি জানানো হয়।

শিক্ষার্থীরা জানান, প্রশাসনের কোনো কর্তাব্যক্তি তাঁদের আশার বাণী শোনাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকদের এহেন আচরণে তাঁরা ক্ষুব্ধ। দাবির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হলে কঠোর আন্দোলনের কোনো বিকল্প থাকবে না। তবে তাঁদের আশা, শুক্রবার দুপুর ২টার মধ্যে উপাচার্য  তাঁদের মাঝে উপস্থিত হয়ে সমস্যার সমাধান করবেন। যদি তা না হয়, তাহলে বুয়েটের সব ভবনে তালা ঝুলবে। ভর্তি পরীক্ষাও নিতে দেওয়া হবে না।

শিক্ষার্থীরা আরো জানান, সোমবার ভর্তি পরীক্ষা। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা আসবে। তাঁরা চান না, তারা এসে কোনো সমস্যায় পড়ুক।

প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিলেন শিক্ষার্থীরা : গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, ‘পুলিশকে তিন ঘণ্টা ধরে আটকে রাখল কারা?’ ওই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁরা বলেন, তাঁরা শুনেছেন, বলা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন। আলামত আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁদের পক্ষ থেকে আলামত আটকে রাখার কোনো ধরনের চেষ্টা করা হয়নি। ঘটনাটি যখন ঘটে তখন পুলিশের একটি টিম সরাসরি হল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ থানায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল। শিক্ষার্থীদের শুধু দাবি ছিল, হলে যেন সিসিটিভি ফুটেজের একটি কপি রাখা হয়, যাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘটনার বিষয়ে জানতে পারেন।

আবরার হত্যার প্রতীকী চিত্রায়ণ : আবরার হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্দোলনস্থলে গতকাল একটি পথনাটিকা প্রদর্শন করেন তাঁর সহপাঠী, বন্ধু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রজরা। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষা আছে বলে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরলেন আবরার ফাহাদ। রুমে এসে মায়ের দেওয়া খাবারের বক্স রেখে পড়ার টেবিলে বসলেন বই-খাতা নিয়ে। একটু পরে ক্যাম্পাসে তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের দোহাই দিয়ে তাঁকে ডেকে নেয়। নানা প্রশ্নের পর শিবির করিস বলে মারধর শুরু করে। মারতে মারতে আধমরা অবস্থায় আবরার পানি চাইলেন, হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষাও চাইলেন। উল্টো মারের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। অবশেষে আবরার প্রাণ হারালেন।

টর্চার সেলের সঙ্গে পরিচিত নয় ছাত্রলীগ : আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শাস্তির দাবিতে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করেছে ছাত্রলীগ। মিছিলটি দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে কলা ভবন, টিএসসি মোড়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ফুলার রোড ঘুরে ভিসি চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।

এরপর ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ‘টর্চার সেলের সাথে ছাত্রলীগ পরিচিত নয়। টর্চার সেলের নামও ভালোভাবে জানে না ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একটি মহল চক্রান্ত করে ছাত্রলীগের সাথে টর্চার সেলকে জড়াচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্রলীগে ঢুকে পড়া অনুপ্রবেশকারীরাই নানা অপকর্ম করছে। আমরা তাদের খুঁজে বের করব। সাংগঠনিকভাবে তথ্য নেওয়ার পাশাপাশি আমরা সাংবাদিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করছি।’

শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতাসীনদের গুণ্ডামি বন্ধ করার দাবি : ছাত্ররাজনীতি নয় বরং শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতাসীনদের গুণ্ডামি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি নুরুল হক নুর। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক পদযাত্রা কর্মসূচির আগে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এ দাবি জানান।

ছাত্রলীগের মৌন মিছিলের পরই নুরের নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী পদযাত্রা করেন ক্যাম্পাসে। নুর বলেন, ‘যাদের হাতে রক্তের দাগ, যারা আবরারকে খুন করেছে, তারা নাকি আবার শোক মিছিল করেছে, এটা হাস্যকর। আবরারসহ সকল ছাত্র হত্যার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংসদ নির্বাচন চালু করতে হবে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দলীয় রাজনীতিমুক্ত করার দাবি টিআইবির : সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতিমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে এই দাবি জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আবরার হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের লালিত মারণব্যাধির লক্ষণ মাত্র। এর প্রতিকার সরকারেরই হাতে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে। দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে শিক্ষকরাও ছাত্রদের সুপথ দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।’

ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা এবং দাবি, এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করুন, দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাপুষ্ট ছাত্রসংগঠনের সব কার্যক্রম বন্ধ করুন।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা