kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

ঋণের উচ্চসুদে হুমকির মুখে পেপার মিল

শরীফুল আলম সুমন   

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঋণের উচ্চসুদে হুমকির মুখে পেপার মিল

প্রধানমন্ত্রী বারবার ব্যাংকঋণের সুদহার সিঙ্গল ডিজিটে নামিয়ে আনার কথা বলেছেন। কিন্তু সেই নির্দেশনা মানছে না ব্যাংকগুলো। ফলে ঋণের উচ্চসুদে হুমকির মুখে পড়েছে পেপার মিলগুলো। এ ছাড়া বন্ডের আওতায় অবৈধভাবে আমদানি হচ্ছে কাগজ। দফায় দফায় বাড়ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম। পরিবহনে লোড সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল বন্দর ব্যবস্থাপনায় সমস্যায় পড়েছে পেপার মিলগুলো। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, নিম্নহারে রপ্তানি প্রণোদনাও এই শিল্পকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পেপার মিল। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১০ লাখ মানুষ।

জানা যায়, দেশে একসময় পেপার মিলের সংখ্যা ছিল ১০৭টি। কিন্তু বর্তমানে চালু আছে মাত্র ৪২টি, আর আংশিক চালু রয়েছে ৯টি। বন্ধ হয়ে গেছে ৫৬টি। তবে ভালোভাবে চালু রয়েছে এমন পেপার মিলের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টির বেশি নয়। নানা কারণে দিন দিন নিম্নমুখী অবস্থায় যাচ্ছে বেশির ভাগ পেপার মিল। অথচ যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমাণ কাগজ বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পেপার মিলগুলোর ঋণের সুদের হার বর্তমানে ১৪ শতাংশের ওপর। আবার যথাসময়ে কেউ ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে পেনাল্টি হিসেবে এই সুদের হার বেড়ে যায় আরো ৪-৫ শতাংশ। যা একটি পেপার মিলের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পেপার মিল।

বর্তমানে বন্ধ ম্যাফ নিউজ প্রিন্টের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে মূলত কাগজের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া একসময় কাঁচামাল ডিউটি ফ্রি ছিল। সেখানে এখন ৫ শতাংশ কর দিতে হয়। বেড়েছে সিঅ্যান্ডএফ ও পরিবহন খরচ। এ অবস্থায় এ খাতকে বাঁচাতে সরকারকে অবশ্যই বিশেষ নজর দিতে হবে। সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’

ক্যাপিটাল পেপার অ্যান্ড পাল্প ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক হেড অব ফাইন্যান্স কাজী আবদুস সালাম বলেন, ‘পেপার মিলগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে মূল কারণ কাগজের উৎপাদন খরচ বেশি। আমাদের ব্যাংক ঋণের সুদ বেশি। আবার সময়মতো কিস্তি দিতে না পারলে পেনাল্টি দিতে হয়। গ্যাস, বিদ্যুতের দামও বেশি। সব মিলিয়েই প্রডাকশন কস্ট বের করা হয়। এর সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে অনেক পেপার মিল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই কারণে ক্যাপিটাল পেপার মিলও বন্ধ হয়ে গেছে।’

ঋণের উচ্চ সুদের হারের বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৯ শতাংশ সুদের হার কেন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না সেটা ব্যাংকগুলোই ভালো বলতে পারবে। কারণ, তারাই এই সুদহারের ঘোষণা দিয়েছিল। আমার মনে হয়, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও আমানত সংগ্রহের সুদ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ঋণের সুদহার কমছে না। তবে ঋণের সুদহার যাতে কমে সে ব্যাপারে ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’  

তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্পসহ নানা ধরনের শিল্পের প্যাকেজিংয়ের সুবিধার্থে কাগজ আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দিয়েছে সরকার। এ সুযোগের অপব্যবহার করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কাগজ আমদানি করছেন। অতিরিক্ত সেই কাগজ কম দামে দেশের বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এ ছাড়া মিথ্য ঘোষণা দিয়েও আনা হচ্ছে কাগজ। ফলে অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কাগজ। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ কাগজ উৎপাদন হওয়ার পরও বিপুল পরিমাণ কাগজ কেন আমদানি হচ্ছে, সরকার তা খতিয়ে দেখছে না। এর ফলে একদিকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় কাগজশিল্পের উদ্যোক্তারা বাজার হারাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় উদ্যোক্তারা কাগজ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাছে বিএসটিআইয়ের প্রত্যয়নপত্র দাখিলের বিধান করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তা ছাড়া কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য আমদানির সময় সব ধরনের পরীক্ষা ও এইচএস কোড যাচাই করে পণ্য খালাসের অনুরোধ জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই।

দেশে সরকারি মালিকানাধীন তিনটি কাগজ ও একটি মণ্ড তৈরির কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু কর্ণফুলী পেপার মিলটি চালু আছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সেগুলো হলো—নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস লিমিটেড (পাকশী), খুলনা নিউজ প্রিন্ট মিলস লিমিটেড ও সিলেট পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস লিমিটেড (ছাতক)।

সূত্র জানায়, দফায় দফায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলেও দেশীয় পেপার মিলগুলো ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। এ ছাড়া নিয়মিত সঠিকভাবে গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় অনেক পেপার মিলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় দিন দিন ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে পেপার মিলগুলোর। এমনকি গ্যাস সরবরাহ বন্ধের কারণে বারবার উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম)। উৎপাদন বন্ধ থাকলে প্রতিদিন ওই মিলটিকে ১৫-২০ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি গুনতে হয়।

এ ছাড়া পরিবহনের ধারণক্ষমতা ও দুর্বল বন্দর ব্যবস্থাপনাও কাগজশিল্পকে হুমকির মুখে ফেলছে। একটি ট্রাকে সাধারণত ২০ টন পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও কাগজ তৈরির কাঁচামাল পরিবহনে লোড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে ১৬ টন। এতে কাগজের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া পেপার মিলগুলোর জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বড় অভাব। এ খাতে নিম্নহারে রপ্তানি প্রণোদনা কাগজশিল্পকে সংকটের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) সেক্রেটারি নওশেরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সব পেপার মিলের বছরে প্রডাকশন ক্যাপাসিটি ১৬ লাখ টন। আর আমাদের চাহিদা রয়েছে ৯ লাখ টন। এর ওপর আবার তিন লাখ টন কাগজ আমদানি হচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের পেপার মিলগুলো বাঁচাতে আমদানি বন্ধ করতে হবে। আমাদের রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এখনো রপ্তানি হচ্ছে। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় রপ্তানিতে আমরা খুব একটা এগোতে পারছি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘পেপার মিলগুলোকে ঋণের উচ্চহারে সুদ দিতে হয়। এ ছাড়া গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহনেও সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে আমাদের কাগজ রপ্তানিতে ১০ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ দেওয়া হয়। সরকারের কাছে সেটা আমরা ৩০ শতাংশে উন্নীত করার অনুরোধ করেছি। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার যদি এগিয়ে আসে তাহলে আমাদের কাগজশিল্প বাঁচবে। একই সঙ্গে জিডিপিতেও এই শিল্পের অবদান আরো বাড়বে, সমৃদ্ধ হবে দেশ।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা