kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

আবরারের বাড়িতে ঢুকতে পারলেন না উপাচার্য

গ্রামবাসীর বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত ৩

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া   

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আবরারের বাড়িতে ঢুকতে পারলেন না উপাচার্য

আবরারের কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়িতে সমবেদনা জানাতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন বুয়েটের ভিসি। শেষ পর্যন্ত পথ থেকেই ফিরে আসতে হয় তাঁকে। ছবিতে ভিসিকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিব্যক্তি আবরারের ছোট ভাই ফায়াজের। ছবি : কালের কণ্ঠ

গ্রামবাসীর বাধার মুখে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) নিহত ছাত্র আবরার ফাহাদের বাড়িতে ঢুকতে পারেননি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। ফলে আবরারের বাড়ির সামনে থেকেই ফিরে যেতে হয় উপাচার্যকে। এ সময় গ্রামবাসীর সঙ্গে পুলিশের ধাওয়াধাওয়ি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আবরারের ভাই ও এক ভাবিসহ তিনজন আহত হন।

গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে আবরারের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে বিপুলসংখ্যক র‌্যাব ও পুলিশের উপস্থিতিতে গ্রামে পৌঁছে বুয়েট উপাচার্য আবরারের কবর জিয়ারত করতে যান। সে সময় তিনি সেখানে আবরারের দাদা গফুর বিশ্বাস, বাবা বরকতউল্লা ও একমাত্র ছোট ভাই ফায়াজকে সামনে পেয়ে তাঁদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন। এরপর ভিসি তাঁদের সঙ্গে নিয়ে কবর জিয়ারত করেন।

কবর জিয়ারত শেষে কবরস্থান থেকে বের হওয়ার সময় প্রথম বাধার মুখে পড়েন বুয়েট উপাচার্য। এ সময় আবরারের ছোট ভাইসহ অনেকে উপাচার্যকে প্রশ্ন করতে থাকেন, ‘আপনি কেমন ভিসি যে আপনার একজন ছাত্রকে মেরে ফেলল, আপনি তাকে দেখতে যেতে পারলেন না? আপনি কেমন ভিসি যে তার জানাজায় যেতে পারলেন না? আপনি কেমন ভিসি যে আপনার একজন ছাত্রের নিরাপত্তা দিতে পারলেন না? আর আজ এসেছেন লোক দেখানো কবর জিয়ারত করতে?’

প্রশ্নের মুখে পড়ে উপাচার্য কারণ ব্যাখ্যা করতে লাগলে হট্টগোল শুরু হয়। এ সময় পুলিশ, র‌্যাব ও ডিবির সদস্যরা তাঁকে কর্ডন করে আবরারের বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যে উপাচার্য আবরারের বাড়ির সামনের সড়কে আসেন। তখন শত শত নারী-পুরুষ উপাচার্যের সামনে আবরার হত্যার বিচার ও হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করলে সেখানে পুলিশ সদস্যরা তাঁদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সেখানে উপস্থিত জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন ও পুলিশ সুপার তানভীর আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে উপাচার্য সাইফুল ইসলাম আবরারের বাড়িতে ঢুকতে না পেরে কুষ্টিয়া শহরের উদ্দেশে ফিরে যান। এ সময় গ্রামের এক নারী ভিসির গাড়ির সামনে শুয়ে পড়লে পুলিশ সদস্যরা তাঁকে চ্যাং দোলা করে তুলে রাস্তার পাশে ফেলে দিলে তিনি আবারও উঠে পেছনে পুলিশ সুপারের গাড়ির সামনে শুয়ে পড়েন। তখন নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁকে ধরে মারতে শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় কয়েক দফা বাঁশ, কাঠ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়াধাওয়িতে লিপ্ত হয় গ্রামবাসী। এ সংঘর্ষের একপর্যায়ে অজ্ঞাতপরিচয় ওই নারী, আবরারের ফুপাতো ভাইয়ের স্ত্রী ও আবরারের ছোট ভাই সামান্য আহত হন।

এটা বাংলাদেশের কোন ধরনের পুলিশ? : বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আরবার ফায়াজকে মারধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবার বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম নিহত আবরার ফাহাদের কুষ্টিয়ার বাড়ির সামনে গেলে এলাকাবাসীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আবরারের ছোট ভাইসহ আহত হন তিনজন।

এ ঘটনায় আহত আবরার ফায়াজ বলেন, ‘আজ আমাদের এখানে ভিসি সাহেব এসেছিলেন। এখানে এসে তাঁর আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করা উচিত ছিল। তিনি এখানে দেখা করতে তো এলেনই না বরং তিনি যখন ফিরে যাচ্ছিলেন এবং আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে যাই। তখন এখানকার দায়িত্বে থাকা অ্যাডিশনাল এসপি মোস্তাফিজুর রহমান আমার বুকে কনুই দিয়ে আঘাত করেন।’

ফায়াজ বলেন, ‘কালও যখন আমার ভাইয়ের জানাজা হয় তখন তিনি বলেছিলেন দুই মিনিটের মধ্যে জানাজা শেষ করতে হবে। কিভাবে তিনি এটা বলেন? আজ এখানে আমার ভাবি ছিলেন, তাঁকেও পুলিশ দিয়ে বেধড়ক মারা হয়েছে। তাঁর কাপড়-চোপড় টেনে তাঁর শ্লীলতাহানি পর্যন্ত করা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের কোন ধরনের পুলিশ?

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত বিষয়টিকে অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আবরারের বড় ভাই ভিসি সাহেবকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে হাত তুলেছিলেন। অ্যাডিশনাল এসপি সেটা ঠেকিয়েছেন। এটাই তাঁর অপরাধ। দুই মিনিটে জানাজা শেষ করতে হবে এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে এসপি বলেন,  দুই মিনিটে জানাজা করার প্রশ্নই ওঠে না। যেটা সম্ভব না সে কথা কিভাবে বলবে। পুলিশ যেন ভিক্টিমাইজ না হয়, সেজন্য আমরা জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, অতিরক্তি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম), উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ভিসি সাহেবের সঙ্গে ওই স্থানে যাই। এর পরও এমন একটা অভিযোগ কেন উঠল বুঝতে পারলাম না।’

‘আমার ছেলেটাকে কিভাবে মেরেছে তা যদি প্রধানমন্ত্রী দেখতেন’

‘ওরা আমার ছেলেটাকে কিভাবে মেরেছে তা যদি প্রধানমন্ত্রী দেখতেন তাহলে তিনিও ঠিক থাকতে পারতেন না। এতগুলো মানুষ একসঙ্গে কিভাবে একজন মানুষকে এভাবে মারতে পারে? আমার ছেলে তো কোনো দোষ করেনি? কেন তাকে এভাবে মারা হলো? আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’

গতকাল বুধবার সকালে কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের বিভিন্ন বর্ষের নতুন ও পুরাতন ছাত্র এবং শিক্ষকদের আয়োজনে আবরারের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া অনুষ্ঠান ও মিলাদ মাহফিলে অংশগ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের আবরার ফাহাদের বাবা এ কথা বলেন।

পরে বিকেলে আবরারের কবর জিয়ারত করতে যাওয়া বরকতউল্লাহ উপাচার্যকে বলেন, ‘আপনি আসলেনই যখন তখন এত দেরি করে কেন আসলেন? আমি আপনার কাছে আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে বুয়েটে তাদের ছাত্রত্ব বাতিলের দাবি জানাই। আশা করি আপনি নিষ্ঠুর এই হত্যার সুষুম বিচার করবেন।’

উপাচার্যের বিরুদ্ধে মায়ের ক্ষোভ : গ্রামবাসীর বিক্ষোভের মুখে আবরারের বাড়িতে ঢুকতে না পেরে বুয়েট ভিসি এলাকা ত্যাগ করার পর আবরারের মা রোকেয়া খাতুন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আপনি কেমন ভিসি যে আমার ছেলে মারা যাওয়ার ৪৩ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও সেখানে আমার ছেলেকে দেখার সময় আপনার হয়নি। আর আজকে তিনি এখানে এসেছেন অথচ একজন মায়ের সঙ্গে দেখা না করেই চলে গেলেন। আপনি কেমন ভুয়া ভিসি? যে আপনি ঢাকা থেকে আসলেন আর আমার সঙ্গে দেখা না করেই চলে গেলেন?’

রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার ৭২ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু আমার ছেলেকে যারা হত্যা করল, তাদেরকে কেন আপনি বহিষ্কার করতে পারলেন না? ফুটেজ দিতে কেন দেরি করলেন? ফুটেজে হত্যাকারী যারা তাদের সবাইকে দেখা গেছে। কিন্তু অন্যতম একজন হত্যাকারী অমিত সাহাকে কেন মামলা থেকে বাদ দিলেন?’

‘হাজার হাজার ছেলেমেয়ের জীবন রক্ষায় কয়টা রক্ষক আছে?’

আবরারের নিকটাত্মীয় তমা খাতুন বলেন, ‘আবরারকে যেভাবে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে, আমাদেরও সেভাবে আজ গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে আবরারের গ্রামে। আবরারের এক ভাবিকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। তাঁর গায়ের কাপড়চোপড়, ওড়না পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আজ ভিসি সাহেব আসলেন, উনার একটা জীবন রক্ষার জন্য প্রশাসনের এত রক্ষক আসলো। আর আমাদের হাজার হাজার ছেলে-মেয়ের জীবন রক্ষার জন্য কয়টা রক্ষক আছে?’

ডিসির গাড়িতে চলে গেলেন ভিসি

আবরারের কবর জিয়ারত শেষে তাঁর বাড়িতে ঢোকার আগে ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম শত শত গ্রাবাসীর বিক্ষোভের মুখে পড়েন। একপর্যায়ে নিজের গাড়ি ফেলে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসকের গাড়িতে করে রায়ডাঙ্গা গ্রাম ত্যাগ করেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ‘ভুয়া, ভুয়া’ বলে স্লোগান দেয়।

ভিসি পদত্যাগ করতে চান না

আবরারের কবর জিয়ারতের পর বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। তাহলে পদত্যাগ করব কেন?’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা