kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

বুয়েট চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে

বিশেষ প্রতিনিধি   

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



বুয়েট চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার যে দাবি উঠেছে, তা নাকচ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তিনি বলেছেন, ‘বুয়েট চাইলে নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। তাদের সিনেট আছে, এটা তারা করতে পারে। তবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিতে হবে, এটা তো মিলিটারি ডিক্টেটরদের (সামরিক শাসক) কথা। এখানে রাজনীতিটা কোথায়? এর কারণটা কোথায়? এটা খুঁজে বের করতে হবে।’ শুধু ঢাকা নয়, সারা বাংলাদেশের প্রতিটি হল খুঁজে খুঁজে দেখা হবে বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে আমরা কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করব না। তাই বলে ছাত্ররাজনীতিকে দোষারোপ করা, এটা তো রাজনীতি না।’

জাতিসংঘ ও ভারত সফর থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টায় গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এলে এই সময়ে আলোচিত বুয়েটের প্রসঙ্গটিও ওঠে।

ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মীর নির্যাতনে আবরারের মৃত্যুর পর বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিও উঠেছে।

শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকে তাদের সবগুলোকে বহিষ্কার করতে বলেছি। পুলিশকে বলেছি তাদের গ্রেপ্তার করতে। কাউকে ছাড় দেব না। অন্যায়কারীর বিচার হবেই।’ তিনি বলেন, ‘কিসের ছাত্রলীগ—সে বিচার করব না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবেই। অপরাধী অপরাধীই। ‘কেউ যদি কোনো অপরাধ করে, তা কোন দলের, কে করে সেটা দেখি না। অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত করি।’

প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে তাঁর সাম্প্রতিক দুই সফর নিয়ে কথা বলেন। পরে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টার প্রশ্নোত্তর পর্বের দ্বিতীয় প্রশ্নেই চলে আসে আবরার হত্যা প্রসঙ্গ। এ হত্যাকাণ্ডকে অমানবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন ‘একটা বাচ্চা ছেলে, ২১ বছর বয়স। তাকে কী অমানবিকভাবে হত্যা করেছে পিটিয়ে পিটিয়ে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বুয়েটে যে ঘটনা ঘটেছে, সকালে জানার পরই পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম অপরাধীদের ধরতে। অনেকেই ধরা পড়েছে। ছাত্ররা নামার আগেই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’ আবরারকে সাধারণ পরিবারের ছেলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এত ব্রিলিয়ান্ট একটা ছেলে। তার মায়ের কষ্ট আমি বুঝি, বাবার কষ্ট বুঝি। কারণ আমিও হত্যার বিচার চেয়ে পাইনি।’

ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে তারা আমার পার্টির, এটা আমি কখনোই মেনে নেব না।’

রাজধানীসহ সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হলে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বলেন, ‘নামমাত্র টাকা ভাড়া দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ও আবাসিক হলে কারা থাকছে, কারা মাস্তানি করছে তা খতিয়ে দেখা হবে।’

ছাত্ররাজনীতি থাকার পক্ষে যুক্তি : শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই দেশে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা কিন্তু ছাত্ররাই নিয়েছে। সেই ছাত্রলীগ করা থেকেই আমাদের ভাষা আন্দোলন। এই যে একটা সন্ত্রাসী ঘটনা (আবরার হত্যা) বা এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো সংগঠন করা নিষিদ্ধ আছে। বুয়েট যদি মনে করে তারা সেটা নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। এটা তাদের ওপর।’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু একেবারে ছাত্ররাজনীতি ব্যান করে দিতে হবে, এটা তো মিলিটারি ডিক্টেটরদের কথা। আসলে তারা এসেই সব সময় পলিটিকস ব্যান, স্টুডেন্ট পলিটিকস ব্যান, রাজনীতি ব্যান, এটা তো তারাই করে গেছে।’

ছাত্ররাজনীতি থাকার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দেশের নেতৃত্ব উঠে এসেছে তো ওই স্টুডেন্ট পলিটিকস থেকেই। আমি ছাত্ররাজনীতি করেই কিন্তু এখানে এসেছি। দেশের ভালো-মন্দ চিন্তাটা আমার মাথায় ওই ছাত্রজীবন থেকে আছে বলেই আমরা দেশের জন্য কাজ করতে পারি। কিন্তু যাঁরা উড়ে এসে বসেন, তাঁরা আসেন ক্ষমতাটাকে উপভোগ করতে। তাঁদের কাছে তো দেশের ওই চিন্তাভাবনা থাকে না। এইটা একটা শিক্ষার ব্যাপার, জানার ব্যাপার, ট্রেনিংয়ের ব্যাপার। এটা কিন্তু ওই ছাত্ররাজনীতি থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। আর আমাদের দেশের সমস্যা হলো বারবার এই মিলিটারি রুলাররা আসছে আর মানুষের চরিত্র হরণ করে গেছে। তাদেরকে লোভী করে গেছে। তাদেরকে ভোগবিলাসের লোভ দেখিয়ে গেছে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমি যেখানে নিজেই ছাত্ররাজনীতি করে আসছি, সেখানে আমরা ব্যান করব কেন? কোনো প্রতিষ্ঠান যদি করতে চায় সেটা করতে পারে। স্বাধীনতা ভালো তবে তা বালকের জন্য নয়, এটাও একটা কথা আছে। স্বাধীনতার যে মর্যাদা দিতে পারবে না তার জন্য স্বাধীনতা ভালো না।’

এর আগে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে যোগ দিতে আট দিনের সফর এবং পরে চার দিনের ভারত সফর নিয়ে কথা বলেন।

এ বিষয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে ছিল ত্রিপুরায় এলপিজি এবং ফেনী নদীর পানি দেওয়ার বিষয়ে সাম্প্রতিক চুক্তি নিয়ে। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এলপিজি প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। আমাদের দেশে উৎপাদন হয় না। আমরা যে অপরিশোধিত তেল কিনে নিয়ে আসি, এর বাইপ্রডাক্ট হিসেবে একটা অংশ এলপিজি হয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে ছেলেটাকে (বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ) হত্যা করল, এটা তো কোনো রাজনীতি না। বসুনিয়াকে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া) যে হত্যা করেছিল সেটা রাজনৈতিকভাবে।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ কিন্তু মোতায়েন আছে সব জায়গায়। আবার পুলিশ যখন আলামত সংগ্রহ করতে গেল সেখানে বুয়েটের ছাত্ররা আপত্তি জানাল, এখানে পুলিশ কেন? আলামত সংগ্রহ করতে গেলে বাধা দিল। এখন এদের সেফটি সিকিউরিটিটা কে দেবে? কিভাবে দেব? এখন যদি পুলিশ পাঠাই, কেউ পুলিশের ওপর একটা ঢিল মারল, কেউ একটা বোমা মারল, যারা এইভাবে মানুষ মারতে পারে তারা মারল, তারপর যদি পুলিশ রিঅ্যাক্ট করে তার দায়দায়িত্ব কে নেবে?’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি তারা দূরে থাকবে। যারা আন্দোলন করছে, করতে থাক। যত দিন খুশি আন্দোলন করতে থাক কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তাদের নিজেদের ভেতরেই যদি কিছু হয় তো সেটার দায়িত্ব কে নেবে? আমি সেটা জিজ্ঞেস করি। সে দায়িত্ব তো আমরা নিতে পারব না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এ ধরনের মানুষ খুন করতে পারে, তারা অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে—এই সিকিউরিটিটা কিভাবে দেওয়া হবে? তারা ভিসিকে আলটিমেটাম দিল, ভিসি কিন্তু সেখানে গেল, তারা ভিসিকেই আটকাল। ভিসির সঙ্গে যে টোনে যেভাবে কথা বলছে, কে ছাত্র কে ভিসি সেটাই তো বোঝা মুশকিল। ছাত্রদের আচার-আচরণ অন্তত সম্মানজনক হওয়া উচিত। তারা হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলছে, এখনই এটা পাস করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘একটা ছাত্র মারা গেছে, তাদের মনে ক্ষোভ আছে, দুঃখ আছে, তারা সেটা দেখাচ্ছে। আন্দোলন করছে, করুক। আমরাও তো আন্দোলন করে করেই এই জায়গায় এসেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে, খরচ কিন্তু আবার সরকারকেই বহন করতে হয়। একটা ছাত্রের জন্য বছরে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়, সেই হিসাব কিন্তু কেউ রাখে না।’

জুয়াড়িদের ভাসানচরে পাঠাতে চান প্রধানমন্ত্রী : ক্যাসিনো প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এখন ক্যাসিনো খেলায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে বা এ ধরনের জুয়া খেলায় অভ্যস্ত, কেউ হয়তো দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, কেউ হয়তো নানা ফন্দি আঁটছে, তাদের বলছি, একটা দ্বীপ খুঁজে বের করেন, সেই দ্বীপে আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব। ভাসানচর বিশাল দ্বীপ। এক পাশে রোহিঙ্গা আরেক পাশে আপনাদের ব্যবস্থা করে দেব। সবাই ওখানে চলে যান।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে যেখানে অনিয়ম আছে সেখানেই আমরা ধরব। কত দূর যাবে আর কত দূর যাবে না সেটা কোনো কথা নয়। এটা বহুদিন ধরে ছিল, কেউ কখনো বলেনি, খেয়ালও করেনি। আমি যদি বলি আপনারা সাংবাদিকরা কোনো দিন বলেননি যে এ রকম একটা অনিয়ম হচ্ছে। এত খবর আপনারা রাখেন, আপনাদের ক্যামেরা এত জায়গায় ঘোরে। তো কই এই জায়গায় কেন পৌঁছায় নাই? সে প্রশ্নের জবাব কি দিতে পারবেন? পারবেন না। বাস্তবতা হলো—আমি যখনই এ খবর পেয়েছি তখনই ব্যবস্থা নিয়েছি এবং এ রকম ব্যবস্থা নিতেই থাকব।’

তিস্তার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন মোদি : তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আশ্বস্ত করেছেন বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে পানি সমস্যার সমাধান করা হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা ফেনী নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি প্রসঙ্গে বলেন, ‘ত্রিপুরায় যে পানি দেওয়া হচ্ছে তা হচ্ছে খাবার পানি। কেউ খাবার পানি চাইলে তা যদি না দিই তাহলে কেমন হয়!’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ত্রিপুরা আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার মানুষ আমাদের আগলে রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে। সেই ত্রিপুরায় সামান্য খাবার পানি দেওয়ার জন্য আপত্তি থাকতে পারে না।’

শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল কোথায়। পরে তিনি নিজেই এর উত্তর দিয়ে বলেন, ‘ফেনী নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশের খাগড়াছড়িতে হলেও এই নদীর বেশির ভাগ ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক নদী। আমরা সামান্য ১.৮২ কিউসেক পানি দিচ্ছি ভারতকে। এ নিয়ে হৈচৈ করার কী আছে?’ তিনি বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক নদীগুলো খননের পরিকল্পনা নিয়েছি। ভারত তাতে সহায়তা করবে। যৌথ নদীগুলোর সমস্যা সমাধানে আমরা আলোচনা করে যাচ্ছি, কাজ চলছে।’

আত্মজীবনী লেখা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী : বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি মানুষের মাঝেই থাকতে চান। মানুষের জন্যই কাজ করে যেতে চান। কাজের বাইরে আপাতত আত্মজীবনী লেখার ভাবনা নেই তাঁর। শেখ হাসিনা এমন মন্তব্য করেন।

ইমদাদুল হক মিলন প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, দীর্ঘ রাজনৈতিক এবং সংগ্রামী জীবন নিয়ে কোনো আত্মজীবনী লেখার ভাবনা আছে কি না?

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করে যেতে চাই। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। মানুষের জন্য কাজ করছি। এটাই আমার জীবন।’

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বান্ধবী লেখক বেবী মওদুদের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তিনি আমার কাজ এবং আমাকে নিয়ে লিখেছেন। আমাকে নিয়ে অনেকেই লিখছেন। আপাতত আত্মজীবনী লেখার ভাবনা আমার নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা