kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

সম্রাটের অঢেল টাকা বিদেশে আর নেতাদের কবজায়!

এস এম আজাদ   

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সম্রাটের অঢেল টাকা বিদেশে আর নেতাদের কবজায়!

‘সবাই ক্যাসিনোর টাকা খাইছে আর ধরা খাইলাম আমি’—র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ে এমনই মন্তব্য করেছিলেন ক্যাসিনো সম্রাট হিসেবে পরিচিত যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। তাঁর দাবি, যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতাসহ অনেক মহলে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা দিতেন তিনি।

র‌্যাবের অভিযান ও তদন্তে ১০টি ক্লাবের ক্যাসিনো, বাস-লেগুনা স্ট্যান্ডের চাঁদা এবং টেন্ডারবাজি মিলে সম্রাটের প্রতিদিন কোটি টাকা সংগ্রহের তথ্য মিলেছে। কাকরাইলের ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে তাঁর একটি ভল্ট ফাঁকা পাওয়া যায়, যেখানে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা থাকত। এ ছাড়া ঢাকায় দুটি ফ্ল্যাট, ডেমরায় কিছু জমি ছাড়া সম্রাটের কোনো সম্পদের সন্ধান মেলেনি।

র‌্যাব ও যুবলীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ক্যাসিনো ও চাঁদাবাজির অঢেল টাকার বেশির ভাগই হুন্ডির মাধ্যমে পাঁচটি দেশে পাচার করেছেন সম্রাট। চট্টগ্রামের শীর্ষ হুন্ডি কারবারি শাহিন চৌধুরীসহ কয়েকজনের মাধ্যমে টাকা পাচার হয়েছে বলে জানায় সূত্র।

সূত্রগুলো জানায়, সম্রাটের ক্যাসিনোর টাকার হিসাব ও লেনদেন করতেন তাঁর সহযোগী আরমানসহ পাঁচজন। এর মধ্যে ক্যাসিনো ও জুয়াবিরোধী অভিযান শুরু হলে জাকির ও সাঈদ নিজেদের টাকার সঙ্গে সম্রাটের শত কোটি টাকা সরিয়ে সিঙ্গাপুরে চলে গেছেন। ধরা পড়েছেন খালেদ ও আরমান। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে টাকার সূত্র মিলবে বলে ধারণা করছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। টাকা ও ব্যাংক হিসাব শনাক্ত হলে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হবে বলে জানান তাঁরা।

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার তদন্তভার পেলে ক্যাসিনোর টাকাসহ সম্রাটের অবৈধ অর্থের উৎস, ক্যাসিনোর টাকা কোথায় যেত, দেশের বাইরে অর্থপাচার হতো কি না সব বিষয়ে আমরা খোঁজ নিব।’ তিনি জানান, র‌্যাব সম্রাটের মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেতে আবেদন করেছে।

অভিযানে সংশ্লিষ্ট র‌্যাবের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ফকিরাপুল-আরামবাগ থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ওয়ান্ডারার্স, ইয়ংমেন্স, আরামবাগ, মেরিনার্স, মোহামেডানসহ ১০টি ক্লাব থেকে প্রতি রাতে তিন কোটি টাকার লেনদেন হতো। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ যেত সম্রাট সিন্ডিকেটের পকেটে। এই হিসাবে এক রাতে আয় ৭৫ লাখ টাকা।

ওই কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে সম্রাট জানিয়েছেন, ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি (বহিষ্কৃত) এনামুল হক আরমান, সদস্য জাকির হোসেন, দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার, যুবলীগের দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক (বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার মাধ্যমেই ক্যাসিনোর টাকা নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টন করতেন তিনি। সম্রাটের ভাগের অনেক টাকাও তাঁদের কাছে আছে। সম্রাট যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীসহ যুবলীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে নিয়মিত টাকা দিতেন বলে দাবি করেছেন।

ওই কর্মকর্তারা আরো বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে ঢাকায় সম্রাটের দুটি ফ্ল্যাট, ডেমরায় কিছু জমি ছাড়া তেমন কোনো সম্পদ পাওয়া যায়নি। ব্যাংকেও টাকা নেই। অথচ বিপুল পরিমাণ টাকা তাঁর হাতে গেছে। সে টাকা সরানোর আলামতও মিলেছে। এখন দেখতে হবে টাকা কোথায় গেল? সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় কিছু গেছে বলে তথ্য পাচ্ছি। রিমান্ডে পেলে জিজ্ঞাসাবাদ ও সহযোগীদের মাধ্যমে এর সূত্র মিলবে।’

যুবলীগের একটি সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের শীর্ষ হুন্ডি ব্যবসায়ী শাহিন চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সম্রাটের। তাঁর সঙ্গে সম্রাটের অনেক ছবিও আছে। এই হুন্ডি শাহিনের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের কোটি কোটি টাকা নিয়ে জুয়া খেলতেন সম্রাট। একই পন্থায় তিনি মালয়েশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ডে টাকা পাচার করেছেন। সাঈদ ও আরমানকে নিয়ে প্রায় সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া যেতেন সম্রাট। গ্লাসবয় হিসেবে পরিচিত জাকিরও প্রায়ই তাঁর সঙ্গে যেতেন। সিঙ্গাপুরে পালানোর আগে-পরে সাঈদ ও জাকির নিজেদের ও সম্রাটের শত কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে সরিয়েছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।

যুবলীগ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগের রাতেও সম্রাটের সঙ্গে জাকিরকে দেখা গেছে। জাকিরের পুরানা পল্টন, সেগুনবাগিচা, শান্তিনগর ও সিদ্ধেশ্বরীতে তিনটি বাড়ি ও ২৮টি ফ্ল্যাট আছে। সিঙ্গাপুরে জাকিরের নামে একটি কম্পানিও রয়েছে। বেনামে এটি সম্রাট চালাচ্ছেন বলেও ধারণা অনেকের। তাঁর ব্যাংক হিসাবে অন্তত সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা আছে বলেও দাবি করছে সূত্র।

এ ছাড়া ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্রাট। লন্ডনে তাঁর কাছে সম্রাট টাকা পাঠিয়েছেন বলেও দাবি করছে যুবলীগের একাধিক সূত্র।

প্রসঙ্গত, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর আলোচনায় আসেন সম্রাট। গত রবিবার ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সহযোগী আরমানসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই দিনই কাকরাইলে  ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে সম্রাটের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে র‌্যাব। ক্যাঙ্গারুর চামড়া রাখার অভিযোগে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়ে তাঁকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। গত সোমবার রমনা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা করেছে র‌্যাব। ওই মামলায় ২০ দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানির দিন আজ বুধবার ধার্য আছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা