kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

অবশেষে সম্রাট গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অবশেষে সম্রাট গ্রেপ্তার

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার সম্রাটকে তাঁর কাকরাইল কার্যালয়ে নিয়ে সেখানে তল্লাশি শেষে লাইফ জ্যাকেট ও হাতকড়া পরিয়ে আদালতে নেওয়া হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

কখনো অফিসে দলেবলে অবস্থান। কখনো আত্মগোপনে। আবার কখনো আটকের খবর! টানা ১৯ দিন তাঁকে ঘিরে চলছিল নানামুখী আলোচনা। ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি। এরপর গতকাল রবিবার ভোরে দুর্নীতি ও ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানে উঠে আসা বহুল আলোচিত সেই ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের একটি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তারের খবর জানায় র‌্যাব।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির পদে থাকা এই বিতর্কিত নেতাকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জশ্রীপুর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় যুবলীগের একই কমিটির সহসভাপতি এনামুল হক আরমানকে, যিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। গতকালই যুবলীগ থেকে এ দুজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সম্রাটকে ঢাকায় আনার পর তাঁকে নিয়ে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাকরাইলের ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব। সেখানে আরো অনেক কিছুর সঙ্গে ক্যাঙ্গারুর দুটি চামড়া পাওয়ায় সম্রাটকে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর আগেচৌদ্দগ্রামের ওই বাড়িটিতে আরমানকে মদ্যপ অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। আরমানকে গতকাল বিকেলের দিকে কুমিল্লার কারাগারে এবং রাতে সম্রাটকে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। ডিভিশনপ্রাপ্ত না হওয়ায় সম্রাটের স্থান হয়েছে কারাগারের সাধারণ ওয়ার্ডে।

র‌্যাবের আলাদা আরো চারটি দল শান্তিনগরে সম্রাটের পারিবারিক বাসা, ধানমণ্ডির বাসা, মহাখালীর ডিওএইচএসে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর বাসা এবং মিরপুরে আরমানের বাসায় অভিযান চালায়। দিনভর এসব অভিযান চলার সময়ে সম্রাট র‌্যাবের হেফাজতে ছিলেন। আজ সোমবার তাঁকে কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে বলে জানা গেছে।

সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল দুপুরে র‌্যাবের মহাপরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর দু-এক দিন পরই ঢাকা ছেড়ে আত্মগোপনে ছিলেন সম্রাট। এ ক্ষেত্রে তিনি এমন সব পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, যাতে সহজে তাঁকে খুঁজে না পাওয়া যায়। আমরা যেসব জায়গায় ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি, সেসব জায়গা থেকে সম্রাটের নাম একাধিকবার এসেছে। আমাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে তাঁকে লোকেট করতে।’

যেভাবে সম্রাট গ্রেপ্তার

নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদ থেকে অপসারণের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় তিনি বলেন, যুবলীগ নেতারাও বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যমসহ নানা মহলে আলোচনায় আসতে শুরু করে যুবলীগ নেতাদের নানা অপকর্ম। এসবের মধ্যেই গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান। প্রথম দিনই গ্রেপ্তার হন একটি ক্লাবে পরিচালিত ক্যাসিনোর মালিক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এর দুই দিনের মধ্যেই গ্রেপ্তার হন আরো দুই ক্যাসিনো পরিচালক জি কে শামীম ও শফিকুল আলম ফিরোজ। এই তিনজনই অবৈধ আয়ের ভাগ দিতেন সম্রাটকে। পরে গ্রেপ্তার করা হয় অনলাইন ক্যাসিনো ডন সেলিম প্রধানকে। তাঁর সঙ্গেও নাম উঠে আসে সম্রাটের।

অভিযান শুরুর প্রথম তিন দিন প্রকাশ্যে ছিলেন সম্রাট। ফোনও ধরতেন। কয়েক দিন কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানসনের কার্যালয়েও অবস্থান করেন সম্রাট। সেখানে শতাধিক যুবক তাঁকে পাহারা দিয়ে রেখেছিলেন। পরে অন্যত্র চলে যান সম্রাট। এরপর তাঁর অবস্থান নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর সম্রাটের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেশের বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে পাঠানো হয়। তাঁর ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়। গত বৃহস্পতিবার দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে তাঁর চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধের তথ্যও প্রকাশ পায় এরই মধ্যে। মতিঝিলসহ গোটা এলাকার চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির একক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কারণে অপরাধজগতে তিনি ছিলেন প্রতাপশালী। এরই মধ্যে সম্রাট গোয়েন্দা জালে আটক আছেন বলেও খবর ছড়ায়। গত কয়েক দিন এই আটক বা নজরদারির গুঞ্জনের ব্যাপারে দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি পরিষ্কার কোনো বক্তব্য দেননি।

গতকাল সকালে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারওয়ার বলেন, ভোর ৫টার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জশ্রীপুর গ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকায় আনা হয়েছে।

জামায়াত নেতার বাসায় আত্মগোপন পালাতে চেয়েছিলেন ভারতে

র‌্যাবের একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, চৌদ্দগ্রামের ওই গ্রামটি ভারত সীমান্তের কাছাকাছি। সেখানে অবস্থান করে সম্রাট ভারতে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বলে তথ্য মিলেছে। কুমিল্লা থেকে কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, যে বাড়ি থেকে সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বাড়িটি এক জামায়াত নেতার। তিন-চার দিন আগে ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে ওই বাড়িতে আশ্রয় নেন সম্রাট ও আরমান। শনিবার মধ্যরাতে সেখানে অভিযান চালায় র‌্যাব।

এলাকাবাসী জানায়, বাড়িটি জামায়াত নেতা ও পরিবহন ব্যবসায়ী মনির চৌধুরীর। তিনি ফেনী পৌরসভার মেয়র আলাউদ্দিনের ভগ্নিপতি। চৌদ্দগ্রামে বাড়ি হলেও মনির চৌধুরী ফেনীতে থাকেন। গ্রামের বাড়িতে কম আসা-যাওয়া করলেও কয়েক দিন ধরে ফেনী থেকে ঘন ঘন ওই বাড়িতে আসছিলেন তিনি। শনিবার সন্ধ্যায়ও মনির চৌধুরী বাড়িতে এসেছিলেন।

প্রতিবেশী এমরান হোসেইন বলেন, মনির চৌধুরী ফেনীতে ব্যবসা করেন এবং সেখানেই থাকেন। বাড়িতে বৃদ্ধ মা ছাড়া তেমন কেউই থাকতেন না। কিন্তু তিনি প্রায়ই গাড়িতে করে নতুন নতুন মেহমান নিয়ে বাড়িতে আসতেন।

আলকরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এ কে এম গোলাম ফারুক বলেন, বাড়িটি স্টার লাইন পরিবহনের পরিচালক মনির চৌধুরীর। একসময় তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এখন জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

সম্রাটের সাম্রাজ্যে র‌্যাবের হানা

দুপুর দেড়টা। কাকরাইলের ব্যস্ত সড়কের পাশে বহুতল ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টার ঘিরে ফেলেন র‌্যাব-পুলিশের সদস্যরা। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে র‌্যাবের একাধিক গাড়ি এসে থামে। একটি গাড়ি থেকে নামানো হয় সম্রাটকে। হাতকড়া পরানো অবস্থায় মাথায় হেলমেট ছিল তাঁর। এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোওয়ার আলমকে সঙ্গে নিয়ে তল্লাশি অভিযান শুরু করে র‌্যাব। টানা পাঁচ ঘণ্টা ভবনটির তিন ও সাত তলায় তল্লাশি চালিয়ে টর্চার সেলের দুটি ইলেকট্রিক মেশিন, দুটি লাঠি, পাঁচ রাউন্ড গুলিসহ একটি চায়নিজ পিস্তল, ১৯ বোতল বিদেশি মদ ও এক হাজার ১৬০ পিস ইয়াবা এবং দুটি ক্যাঙ্গারুর চামড়া জব্দ করা হয় বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম।

এত দিন সম্রাট কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন, ‘আমাদের জানা নেই।’ সম্রাটের গডফাদারদের গ্রেপ্তার করা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তথ্য পেলে গডফাদারদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।’

৯ তলা ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টার ছিল সম্রাটের রাজনৈতিক ও ব্যাবসায়িক কার্যালয়। কার্যালয় ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি ফ্লোরে সম্রাটের ছবি টাঙানো। রয়েছে বাগান, পুকুর, হাঁটার ব্যবস্থা, ভবনটির ছাঁদে বাগানে দামি আসবাবসহ আরো অনেক সরঞ্জাম।

অভিযানে র‌্যাবের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরাও কাকরাইলের রাজমনি ঈশা খাঁ হোটেলের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। এ সময় ভূঁইয়া সেন্টারের নিচতলার সব দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। চারপাশে ভিড় করে ছিল উত্সুক জনতা। ওই ভবনের সামনে দুই পিলারের একটিতে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, অন্যটিতে সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদের ছবি টাঙানো রয়েছে। হারুনের ছবির নিচেই রয়েছে সম্রাটের হাস্যোজ্জ্বল ছবি।

গতকাল অভিযানের সময় আশপাশের অনেক মানুষের ভিড়ে সম্রাটের অনেক কর্মী-সমর্থক থাকলেও তারা ছিল অনেকটাই নীরব। তবে অভিযান শেষে সম্রাটকে নিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন কর্মী কিছুটা হট্টগোল শুরু করে। তখন র‌্যাব তাদের শান্ত করে।

শান্তিনগরের ফ্ল্যাট ফাঁকা, স্বজনরা লাপাত্তা 

দুপুরে শান্তিনগরের ১৩৮, ১৩৮/১ ও ১৩৯ নম্বরের শেলটেক রহমান ভিলার ফ্ল্যাটে অভিযানে গিয়ে কাউকে পায়নি র‌্যাব। ভবনটির নিরাপত্তাব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা আব্দুল মাজেদকে সঙ্গে নিয়ে ভবনটির পাঁচতলায় ওঠেন র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাব-৩-এর ম্যাজিস্ট্রেট আক্তারুজ্জামান পাঁচ তলার ৫/সি ফ্ল্যাটে ঢুকে তল্লাশি শুরু করেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত সেখানে তল্লাশি চালিয়ে দুই লাখ টাকা, ভারতীয় রুপি, ডলারসহ পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার জব্দ করেন। আব্দুল মাজেদ বলেন, ফ্ল্যাটটিতে সম্রাটের ভাই বাদল থাকতেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পরপরই তিনি ফ্ল্যাটে তালা লাগিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

আরো তিন বাসায় অভিযান 

গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সম্রাটের আরো দুই বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। এর মধ্যে মহাখালী ডিওএইচএসের ২৯ নম্বর সড়কের ৩৯২ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাসা থেকে কিছু নথিপত্র জব্দ করা হয়। এখানে সম্রাটের স্ত্রী শারমিন চৌধুরী র‌্যাবের কাছে দাবি করেন, তাঁর সঙ্গে সম্রাটের এখন যোগাযোগ নেই। দুই বছর তিনি ওই বাসায় যান না।

সম্রাটের ধানমণ্ডির বাসায় অভিযান চালানো র‌্যাব-২-এর পরিচালক আশিক বিল্লাহ বলেন, ধানমণ্ডির বাসায় সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী থাকেন। সেখানেও তল্লাশি চালিয়ে বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।

বিকেলে আরমানের মিরপুরের এক নম্বরের সি ব্লকের বাসায় র‌্যাবের অভিযানের আগমহূর্তে তাঁর স্ত্রী বীথি পালিয়ে যান। র‌্যাবের দল তিনটি তালা ভেঙে ভেতর থেকে ১০টি দলিলসহ কিছু সরঞ্জাম জব্দ করে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক। পরে বাসাটি সিলগালা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা