kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

প্রকৌশলী-কর্মীদের হেলায় বারবার পড়ছে ট্রেন

পার্থ সারথি দাস   

৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রকৌশলী-কর্মীদের হেলায় বারবার পড়ছে ট্রেন

রেলপথ, ইঞ্জিন ও বগি রক্ষণাবেক্ষণে সাধারণ কর্মচারী থেকে প্রকৌশলীদের অবহেলায় ট্রেনের চাকা চলতে গিয়ে লাইন থেকে পড়ে যাচ্ছে। রেলপথে দুর্ঘটনার প্রায় ৭৩ শতাংশই ঘটছে ট্রেনের চাকা পড়ে যাওয়া বা লাইনচ্যুতিতে। গত ঈদ যাত্রায় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনে লাইনচ্যুত হয়ে একদিনের ট্রেন পরের দিনও চলাচল করেছে। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ কমলেও স্বাভাবিক সময়েও ট্রেনের লাইনচ্যুতি ঘটছে অহরহ। গত ঈদ যাত্রায় রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগে ট্রেন চলেছে তিন থেকে ২৩ ঘণ্টা বিলম্বে। ঈদ যাত্রার সময়সূচি বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিম রেলে মহাব্যবস্থাপক বদলি করা হয়েছে। তার পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। কারণ মাঠপর্যায়ে রেলপথ, রেল সেতু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণই হচ্ছে না, পরিদর্শন কর্মসূচিও মুখ থুবড়ে পড়েছে।

আগের দিন বিকেলে রংপুরের কাউনিয়ায় ট্রেন দুর্ঘটনায় একজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক লোক আহত হওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল শুক্রবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় জালালাবাদ এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে চার ঘণ্টা বন্ধ থাকে ওই পথে রেল যোগাযোগ।

রেলওয়ের তথ্যানুসারে, গত আগস্টে প্রথম ১৯ দিনেই ১৫টি ট্রেনের লাইনচ্যুতি ঘটে। ২০১৪ সাল থেকে গত জুন পর্যন্ত ট্রেনে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনার মধ্যে লাইনচ্যুতি ছিল ৭৩ শতাংশ। গত জুন পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে চার হাজার ৭৯৮ বার ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে, প্রাণহানি ঘটে ৩৯২ জনের।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রেনের সময়ানুবর্তিতাসংক্রান্ত প্রাত্যহিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লালমনিরহাট ও পাকশী বিভাগে এক মাসে ২৪ বার ইঞ্জিন বিকল হয়েছে। তার আগের মাসে ইঞ্জিন বিকল হয় ৩৬ বার।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ শহরের কেওয়াটখালীতে তিস্তা এক্সপ্রেসের একটি বগি রেলপথ থেকে পড়ে যায়। দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। একই দিন দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মহানগর গোধূলি ট্রেনের চাকা রেলপথ থেকে পড়ে যায় ফেনী-শার্শদী সেকশনের হরষপুরে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে রেলপথ ভেঙে সাড়ে তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। ওই দুর্ঘটনার পর খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলস্টেশনের দুই দিকের আউটার সিগন্যালের মধ্যবর্তী অংশে রেলপথে প্রয়োজনীয় পাথর নেই। চলতে গিয়ে ট্রেন স্বাভাবিকভাবে দুলে ওঠে। রেলস্টেশনের সামনে ও পাশে বাগুয়ায় আগেও দুইবার রেলপথ ভেঙে পড়েছিল। শত শত স্লিপার থেকে প্যান্ডেল ক্লিপও চুরি হয়েছে রেলপথে। রেলপথে সঠিক পরিমাণে পাথর ও স্লিপার না থাকা ছাড়াও রেলপথ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে নিযুক্ত কর্মী ও প্রকৌশলীদের অবহেলা, ইঞ্জিন ও বগি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অবস্থা আরো সঙ্গিন হয়েছে। এ বিষয়ে রেল ভবনে অভিযোগও এসেছিল; কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত দিনে ৩২টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। একটি ট্রেনের বঙ্গবন্ধু সেতু পার হতে ২৭ মিনিট লাগছে। তার ওপর স্থানে স্থানে রেলপথের সেতুও ত্রুটিপূর্ণ। ঢাকা থেকে ঈশ্বরদী রেলপথে দেড় মাস আগে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বঙ্কিরোটে ২৮ নম্বর ও কামারপাড়ায় ২৯ নম্বর রেল সেতুর গার্ডারে ফাটল ধরে। প্রতিদিন এ অংশ দিয়ে ট্রেন চলছে ২০ কিলোমিটার গতিতে। বর্ষার অজুহাতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সংস্কারকাজও করেনি।

দেশে রেলের কমপক্ষে ৩০০ সেতু ঝুঁকিতে আছে। কুড়িগ্রাম-রমনা ২৮ কিলোমিটার রেলপথের ৩০টি সেতুই ঝুঁকিপূর্ণ। সেতুগুলোর ওপর স্লিপার ঠিক রাখতে লাগানো হয়েছে বাঁশের ফালি। লালমনিরহাটের তিস্তা থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারীর রমনা স্টেশন পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার রেলপথে পাথর নেই পর্যাপ্ত।

রেলওয়ের ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, রেলপথ বা ট্রেনের ত্রুটি হলে বগি লাইনচ্যুত হয়। রেলপথে পাথর কম থাকা, স্লিপার ও নাটবল্টু আলাদা হলে ট্রেনের চাকা রেলপথ থেকে পড়ে যায়। জীর্ণ রেলপথে গতি বেশি হলেও লাইনচ্যুতি ঘটে। এ ছাড়া বগি ‘আন্ডার গিয়ারে’ ত্রুটিতেও ট্রেনের চাকা পড়ে যেতে পারে।

গত ২৩ জুন রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় উপবন ট্রেনের ছয়টি বগি লাইন থেকে পড়ে চার যাত্রীর প্রাণহানির পর তদন্ত কমিটি রেলপথে ত্রুটির বিষয়টি উল্লেখ করে এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দায়ী করে। তারপর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জুলহাসকে বদলি করা হয়। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ, কুলাউড়াসহ বিভিন্ন স্থানে রেল সেতু সংস্কার করা হয়নি।

প্রায় দুই কিলোমিটার পর পর রেলপথ দেখভাল করে ‘গ্যাং’ নামে রেলের কর্মী বাহিনী। কিম্যান, ওয়েম্যান, গ্যাংম্যানদের রেলপথ নিয়মিত পাহারা দেওয়ার কথা। কিম্যান রেলপথে এক পাশ দিয়ে একবার হেঁটে অন্য পাশ দিয়ে ফিরে আসে। তাতে নাটবল্টু, ক্লিপ, ফিশপ্লেট ঠিকঠাক আছে কি না ধরা পড়ে। নুড়িপাথর না থাকলে ঊর্ধ্বতনদের জানানোর দায়িত্ব ওয়েম্যানদের। কিম্যান ও ওয়েম্যানের কাজের সমন্বয়কারী গ্যাংম্যানদের মাঠে পাওয়া যায় না বলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ আসছে। কয়েকটি গ্যাং নিয়ে গঠিত ম্যাট। ম্যাটগুলোর কাজ দেখভাল করেন পরিদর্শক ও প্রকৌশলীরা। ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশের প্রকল্প পরিচালক আতিকুর রহমান বলেন, ‘পরিদর্শকরা মাঠে নিয়মিত যান না। কোনো এলাকায় বছর গেলেও পরিদর্শন করা হয় না বলে আমরা জানতে পেরেছি।’

রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার পর ওয়েম্যান-গেটম্যান-গ্যাংম্যানদের বড় অংশই মাঠে থাকছে না। যেমন—ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা-টঙ্গী রেলপথে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও ৩১ জন কর্মচারী সেখানে না থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে কাজ করছিলেন বলে সম্প্রতি অভিযোগ ওঠে। তারপর গত আগস্টে রেল মন্ত্রণালয় থেকে সাত ওয়েম্যানসহ অভিযুক্তদের কর্মস্থলে যাওয়ার আদেশ জারি করা হয়। তার পরও তাঁরা কর্মস্থলে নিয়মিত যাচ্ছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক শামছুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যমুনা নদীর ওপর পৃথক রেল সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। এ ছাড়া ডাবল লাইন ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ হলে ট্রেনের সংখ্যা ও গতি বাড়বে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর অবস্থা পরিবর্তনের জন্য কিছু জায়গায় কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবর্তন করা হয়েছে। আমি সবাইকে বলেছি, কাজ করতে হবে, না হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেলপথ ও রেল সেতুর অবস্থা পরীক্ষার জন্য টাস্কফোর্স গঠন করেছি।’

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০ শতাংশ বগিই পূর্ব রেলে চলাচল করছে বার্ষিক মেরামত ছাড়া। পশ্চিম রেলে মিটার গেজের ১২ শতাংশ বগি সময়মতো মেরামত হচ্ছে না। যাত্রীবাহী ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছার পর ইঞ্জিন ও বগি ৪৫ মিনিট পরীক্ষার নিয়ম আছে। ইঞ্জিন গন্তব্যে যাওয়ার পর নিয়মিত পরীক্ষা ও দেড় মাসে একবার কারখানায় পরীক্ষা করার কথা। এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। কারণ স্টেশনে বেশি অপেক্ষা করে দেরিতে গন্তব্যে আসার পর ফেরার জন্য ট্রেন দ্রুত ছেড়ে দেওয়ার চাপ থাকে। রেলওয়ের ২৭২টির মধ্যে ১৯৫টি ইঞ্জিনের মেয়াদ পার হয়েছে। ফলে এসব ইঞ্জিন পথে পথে বিকল হচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা