kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

আড়তে পেঁয়াজের পাহাড় বাজারে দাম চূড়ায়

রবিবার সকালে ৮০, সোমবার বিকেলে ১৩০

শওকত আলী   

১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আড়তে পেঁয়াজের পাহাড় বাজারে দাম চূড়ায়

রাজধানীতে গতকাল পেঁয়াজের আড়তগুলো ঘুরে দেখা যায়, কোনো কোনো দোকানে পেঁয়াজের বস্তা প্রায় ছাদ ছুঁয়েছে। সব আড়তে বস্তায় বস্তায় পেঁয়াজ। ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার পরও এদিন হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ১৪টি ট্রাকে পেঁয়াজ দেশে এনেছেন ব্যবসায়ীরা, যাতে ছিল ২৬৮ টন। আগের দিন রবিবার ১৯টি ট্রাকে ৪৩৭ টন ভারতীয় পেঁয়াজ দেশে ঢোকে শুধু হিলি স্থলবন্দর দিয়ে। আবার গতকাল এক দিনেই টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ ঢুকেছে রেকর্ড পরিমাণ ৫৩৬ টন। এসব পেঁয়াজ ট্রাকে করে সরাসরি দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আগের দিন কনটেইনারে দুই চালানে আসে মিয়ানমারের ১৭৪ টন পেঁয়াজ। একই সময়ে খালাস হয়েছে মিসর থেকে আসা ১৪৫ টন।

এদিকে সরকারও গতকাল বলেছে, এখনো প্রায় তিন লাখ টন পেঁয়াজ চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছে মজুদ আছে। যা দিয়ে আগামী ৫০ থেকে ৫৫ দিন দেশের পেঁয়াজের চাহিদা মেটানো সম্ভব। আর এই সময়ের মধ্যে আমদানি করা প্রচুর পেঁয়াজ দেশে ঢুকবে।

কিন্তু বাজারের অবস্থাটা কী? পশ্চিম রামপুরার ওয়াপদা রোডের মুদি দোকানি আব্দুল জব্বার। ছোট্ট একটি দোকানে পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও আলু বিক্রি করেন। গত রবিবার সকালে দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৮০ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি করেছেন ৭৫ টাকায়। ভারত সরকার রপ্তানি বন্ধ করার খবর শোনার পর তিনি ওই রাতেই দুই ধরনের পেঁয়াজই ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি শুরু করেন। রাত পোহানোর পর তিনি একই পেঁয়াজ ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি শুরু করেন। অর্থাৎ রাতারাতি প্রতি কেজিতে দাম বাড়িয়েছেন ৫০ টাকা।

১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা পেঁয়াজ কবে কিনেছেন জানতে চাইলে আব্দুল জব্বার বলেন, ‘এগুলো দুই দিন আগের কেনা। কিন্তু এর আগে একবার বেশি দামে পেঁয়াজ কিনেও কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। ভারত রপ্তানি বন্ধ করেছে মানে পেঁয়াজের দাম বাড়বে। তাই বাড়িয়ে বিক্রি করছি।’

শুধু আব্দুল জব্বার নন, ঢাকার সব মুদি দোকানি, পাইকারি বিক্রেতা, আড়তদার ও আমদানিকারক এখানে একজোট। রাতারাতি তাঁরা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। অতি মুনাফা করতে কেউই কম যাচ্ছেন না। রবিবার সকালেও ঢাকার খুচরা বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজ ৭০-৭৫ টাকা কেজি এবং দেশি পেঁয়াজ ৮০ টাকায় পাওয়া গেছে। কিন্তু গতকাল ১১০ টাকার নিচে পেঁয়াজ মেলেনি। বেশির ভাগ বিক্রেতাই ১২০-১৩০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন।

গুলশান গুদারাঘাটের মুদি দোকান রাফসান জেনারেল স্টোর ১২০ টাকা কেজি দরে আমদানি করা এবং ১৩০ টাকা কেজি দরে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করছে। এর থেকে দুটি দোকান পরে এক বিক্রেতা দুই ধরনের পেঁয়াজই ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে ১২৫-১৩০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। একই এলাকায় আগোরার সুপারশপে গিয়ে ১০০ টাকা কেজিতে আমদানি ও ১১০ টাকা কেজি দরে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা যায়।

বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কোনো দোকানেই পেঁয়াজের ঘাটতি নেই। আমদানি বা দেশি দুই ধরনের পেঁয়াজেরই সরবরাহ পর্যাপ্ত। কারওয়ান বাজারের আড়তগুলোতে ঘুরে দেখা গেল, কোনো কোনো দোকানে পেঁয়াজের বস্তা প্রায় ছাদ পর্যন্ত রাখা হয়েছে। ৫৬ নম্বর মেসার্স মাতৃভাণ্ডার আড়তে দেখা গেল পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ। অথচ দাম আকাশছোঁয়া। রবিবার যেসব পেঁয়াজের কেজি ৬০-৬৫ টাকা ছিল তা এখন ৯০-১০৫ টাকা। এর মধ্যে দেশি পেঁয়াজ ১০০-১০৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৯০-৯২ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেল। এই বাজারের বেশ কয়েকটি আড়ত ঘুরে সরবরাহের কোনো ঘাটতিই দেখা যায়নি। পেঁয়াজের বড় পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত শ্যামবাজার। এই বাজারেও ৯০-৯৫ টাকায় আমদানি করা পেঁয়াজ এবং দেশি ১০০-১০৫ টাকায় বিক্রি করছে বলে জানা গেছে।

ভারত সে দেশের বাজারে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। গতকাল এ খবর চাউর হলে রাতারাতি প্রতি কেজি পেঁয়াজে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যায়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত বাজারের সুবিধাটা ব্যবসায়ীরা নিচ্ছেন। যদি নিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থা থাকত তাহলে ব্যবসায়ীরা এভাবে রাতারাতি অতি মুনাফার প্রতিযোগিতায় নামতেন না। কারণ কত টাকার পেঁয়াজ কত টাকায় বিক্রি হবে এ বিষয়ে সরকারের কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা থাকে না। উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যেও সমন্বয় করা হয় না। তবে বাড়তি দামের এ সুবিধা কিন্তু কৃষক পায় না। সবটাই পকেটে পুরছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। তাও আবার একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। যেখানে ক্রেতারা অসহায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অতি মুনাফা যাতে না করতে পারে সে জন্য সরকারের আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। উৎপাদন মৌসুমে সরকারের উচিত একটি যৌক্তিক মূল্য ঘোষণা করা। এই তথ্যটা থাকলে ভোক্তারা একটা শক্তি পাবে। ব্যবসায়ীরাও যখন খুশি দাম বাড়াতে পারবে না। বর্তমান সময়ে অনিয়ন্ত্রিত একটি বাজারে সবাই মওকা বুঝে লাভ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই পেঁয়াজের বাজারে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। সরকার এটা মোকাবেলায় মৌসুমের সময় পেঁয়াজের মজুদ রাখতে পারে। এর জন্য আলাদ করে গুদাম তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কিভাবে সরাসরি ক্রয়-বিক্রয়ের পথ তৈরি করা যায় তার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।’

ভারতের ঘোষণার পর হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ার আগেও ১৪টি ট্রাকে পেঁয়াজ দেশে এনেছেন ব্যবসায়ীরা। যাতে ২৬৮ টন পেঁয়াজ ছিল। এর ঠিক আগের দিনই ১৯টি ট্রাকে ৪৩৭ টন পেঁয়াজ দেশে ঢুকেছে শুধু হিলি স্থলবন্দর দিয়ে। হিলির এক পাইকারি ব্যবসায়ী আহম্মদ আলী নিজেই দাবি করেছেন, আমদানিকারকরা বিভিন্ন গুদামে পেঁয়াজ মজুদ রেখেছেন। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তাঁরা মূল্য বৃদ্ধি করছেন। পাইকারদের কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন না।

দেশে পেঁয়াজের সংকট নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যসচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, চাহিদার তুলনায় দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলেও বিকল্প পথে তুরস্ক ও মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। তুরস্কের পেঁয়াজ এখন পথে। আরো আগে থেকেই মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে।

পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতার কোনো কারণ নেই উল্লেখ করে বাণিজ্যসচিব বলেন, দেশে প্রতিদিন ছয় হাজার টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুর, পাবনাসহ সারা দেশে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় তিন লাখ টন পেঁয়াজ চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছে মজুদ আছে। যা দিয়ে আগামী ৫০ থেকে ৫৫ দিন দেশের পেঁয়াজের চাহিদা মেটানো সম্ভব। আর এই সময়ের মধ্যে দেশে নতুন পেঁয়াজ আমদানি করা হবে।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন হয় ১৭ থেকে ১৯ লাখ টনের মতো। তাতে চাহিদা পূরণ না হওয়ায় আমদানি করতে হয় সাত থেকে ১১ লাখ টন। যার বেশির ভাগটাই আমদানি হয় ভারত থেকে।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে পেঁয়াজের সর্বোচ্চ চাহিদা হলো ২৪ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। পাশাপাশি সামান্য ঘাটতি যা থাকে তার জন্য সারা বছরই দেশে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। এর পরও বাজারে কয়েক দিন পরপরই অস্থিরতা তৈরি হয়। কারো কাছে অবৈধ মজুদ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ১০টি টিম বাজার মনিটরিংয়ে নেমেছে বলে জানিয়েছেন মো. জাফর উদ্দীন।

রপ্তানি বন্ধের আগে ভারত সরকার পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এই খবরেও দেশে পেঁয়াজের দাম বেড়েছিল ২০-২৫ টাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা