kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

ধানের দাম কমলেও বাড়ছে চালের

প্রতি কেজি চালে ২১ টাকা মুনাফা ব্যবসায়ীদের!

শওকত আলী   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধানের দাম কমলেও বাড়ছে চালের

কৃষক ধানের ন্যায্য দাম না পেলেও চাল ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো। তাঁরা কম দামে ধান কিনেও চালের দাম বাড়িয়ে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লুটছেন। এরই মধ্যে মোটা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা, অন্যদিকে বাড়তি খরচের চাপে নাজেহাল হচ্ছে ভোক্তারা।

চালকল মালিক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা চালের বাজার অস্থির করার পাঁয়তারা করছেন। সিন্ডিকেট তৈরি করে তাঁরা এমনভাবে চালের দাম বাড়াচ্ছেন, যাতে সহজে তা সাধারণ মানুষের চোখে না পড়ে। এখন শুধু মোটা চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে বাড়ানো হয়েছে মিনিকেট চালের দামও। অথচ মিলাররা বলছেন, বিক্রি কম থাকায় তাঁরা মোটা চাল উৎপাদান একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন।

ঢাকার কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি স্বর্ণা বা গুটি চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৬ থেকে ৪০ টাকায়। কয়েক দিন আগেও ৩৪ টাকার নিচে ছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন টিসিবির বাজার বিশ্লেষণের তথ্য মতে, গত এক মাসে মোটা চালের দাম ২.৭৮ শতাংশ বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, মিনিকেট চালের দামও একটু একটু করে বাড়ছে। মানভেদে ৪৫-৫৫ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত প্রতি কেজি মিনিকেট চাল। বর্তমানে এ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা দরে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মোটা চাল ও মিনিকেট চালের দাম বেড়েছে। সামনে আরো বাড়বে বলে পাইকাররা জানিয়েছেন। রামপুরা ওয়াপদা রোডের খুচরা বিক্রেতা শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে প্রতি কেজি স্বর্ণা ৩৪ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন ৩৬ টাকার নিচে বিক্রি করার সুযোগ নেই।’ সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের খুচরা বিক্রেতা শাহিন বলেন, ‘চালের দাম একটু একটু করে বাড়ছে। সামনে আরো বাড়বে। কেবল তো শুরু!’

চালের দাম বাড়লেও ধানের দাম উল্টো কমছে। সরকার অতিরিক্ত ধান কেনার ঘোষণা দিলেও ধানের দাম বাড়েনি। সরকার গত ১১ জুলাই প্রাথমিকভাবে দুই লাখ টন সিদ্ধ চাল রপ্তানির অনুমতি দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য তো পাচ্ছেনই না, উল্টো স্থানীয় বাজারে বাড়ছে চালের দাম।

গোপালগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, ফুলপুর, হবিগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা জানান, মোটা চালের ধান ৪৫০-৪৬০ টাকা আর চিকন চালের ধান ৬০০-৬১০ টাকা মণ দরে বিক্রি করছেন কৃষকরা।

জানা গেছে, গুটি বা স্বর্ণা চাল তৈরি করার জন্য ৫০০ টাকায় ৪০ কেজি ধান কেনেন মিলাররা। ওই ৪০ কেজি ধান থেকে চাল পাওয়া যায় ২৬ কেজি। হাসকিং মিলে এক কেজি চাল তৈরি করতে খরচ পড়ে দুই টাকা ৫০ পয়সা। সে হিসাবে ২৬ কেজি চালের জন্য খরচ হয় ৬৫ টাকা। অর্থাৎ মিলে প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ পড়ছে ২১ টাকা ৭৩ পয়সা থেকে ২২ টাকা পর্যন্ত। অটো রাইসমিলে এ চাল তৈরি করলে খরচ বাড়ে সর্বোচ্চ তিন টাকা। অর্থাৎ ২৫ টাকা হচ্ছে মিলারদের খরচ। আর ৫০ কেজির একটি চালের বস্তা বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আনতে খরচ পড়ে ৫০-১০০ টাকা অর্থাৎ কেজিপ্রতি এক-দুই টাকা। দুই টাকা ধরলেও খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ২২-২৭ টাকায়। খোলাবাজারে এ চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৬-৪০ টাকা। অর্থাৎ এক কেজি চালে ব্যবসায়ীদের পকেটে মুনাফা ঢুকছে ১৩-১৪ টাকা।

একইভাবে ভালো মানের এক কেজি মিনিকেট চাল উৎপাদনে খরচ পড়ে সাড়ে ৩৪ থেকে ৩৭ টাকা। পরিবহন খরচ দুই টাকা ধরলে দাম পড়ে ৩৬-৩৯ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। এখানে ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢুকছে ১৯-২১ টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধানের দাম বাড়ে না, অথচ চালের দাম বাড়ছে। মানে হচ্ছে, বাজারটাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। এ অবস্থা থেকে বেরোতে হলে সরকারকে কাজ করতে হবে। সরকার মিলারদের শর্ত দিতে পারে, যদি কোনো মিল মালিক কৃষকদের কাছ থেকে সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া দামে ধান না কেনে, তাহলে ওই মালিকের কাছ থেকে সরকার চাল কিনবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ দেশে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নতুন নয়। এটা না ভাঙতে পারলে ভোক্তার ঘাড়ে খরচের চাপ বাড়বে। মধ্যস্বত্বভোগীদের চক্র ভাঙতে হলে কৃষকদেরও কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁরা কাঁচা ধান বিক্রি না করে সমবায় গঠনের মাধ্যমে তা শুকানো ও সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিলে লাভবান হতে পারেন।’

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে টাকাটা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যাচ্ছে, সেটা কমিয়ে আনার জন্য সরকারকে পরিকল্পনা করতে হবে। আর ধানের দাম না বাড়া সত্ত্বেও চালের দাম বাড়াটা অস্বাভাবিক। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরি করেই বাজারকে অস্থির করার চেষ্টা করছেন।’

চালের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের রনি রাইস এজেন্সির বিক্রেতা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মিনিকেট চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। মিল মালিকরা দাম বাড়িয়েছেন বলেই আমাদের বাড়াতে হয়। কারণ আমরা তো সীমিত লাভে ব্যবসা করি।’ ব্যবসায়ীরা এক কেজি মিনিকেট চালে ২১-২৩ টাকা পর্যন্ত কিভাবে লাভ করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা একটা প্রক্রিয়া হয়ে গেছে। তিন থেকে পাঁচ হাত ঘুরে খুচরা ব্যবসায়ীরা ক্রেতার কাছে চাল পৌঁছান। এর মধ্যে সবাই তো লাভ করে।’

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুরুতে মিল মালিকরাই চালের দাম বাড়ান। এ কারণে পাইকারি ব্যবসায়ীদেরও বাড়াতে হয়। কৃষি মার্কেটের পাইকারি বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মিল মালিকরা দাম না বাড়ালে আমরা বাড়াই না। তাঁদের থেকেই শুরু হয়েছে মূল্যবৃদ্ধি।’

তবে মিল মালিকদের দাবি, সরকারের কাছে পর্যাপ্ত চাল মজুদ আছে। পাইকারদের কাছে আছে আগের আমদানি করা চালের ভালো মজুদ। এ কারণে মিলারদের উৎপাদন ও বিক্রি কমে গেছে। অন্যদিকে ধানের দামও কম। সব মিলিয়ে মিলাররা লোকসান গুনে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ অটো মেজর এবং হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী বলেন, ‘চালের দাম বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। মিলাররা দাম বাড়াননি। মিলাররা চাল বিক্রি করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। সেখানে দাম বাড়াতে যাবেন কেন?’ তিনি দাবি করেন, পাইকাররা সংগঠিত হয়ে হয়তো চালের দাম বাড়াচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকারের তদারকি দরকার।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে ধানের যে দাম, তাতে চালের মূল্যবৃদ্ধির মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বাজার অস্থির করার চেষ্টা করা হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, যাতে ওএমএস কার্যক্রম চালু করা যায়। ওএমএস কার্যক্রমের আওতা বাড়ানো, কর্মসূচি দীর্ঘসময় ধরে চলমান রাখা, দাম কমিয়ে বিক্রি করার মতো কয়েকটি প্রস্তাব আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে দু-একদিনের মধ্যেই পাঠাব।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা