kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

বিশেষ প্রতিনিধি, নিউ ইয়র্ক   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : বাসস

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকটকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি উল্লেখ করে এর স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৭৪তম অধিবেশনে চার দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন এবং আত্তীকরণে মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন দেখাতে হবে।’ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণের প্রথম প্রস্তাবে তিনি এ কথা বলেন।

স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেলে জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্যান্যবারের মতো এবারও বাংলায় ভাষণ দেন।

এ বছরের সাধারণ বিতর্কের বিষয়বস্তু হলো ‘দারিদ্র্য বিমোচন, মানসম্মত শিক্ষা, জলবায়ু কর্মসূচি এবং অন্তর্ভুক্তকরণে বহুপক্ষীয় প্রচেষ্টার উজ্জীবন।’ নাইজেরিয়ার টিজানি মুহাম্মাদ-বান্দে জাতিসংঘের ৭৪তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করতে হবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের আয়োজন করতে হবে।’

তৃতীয় প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের মাধ্যমে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী তাঁর শেষ প্রস্তাবে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণসমূহ বিবেচনায় আনতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।’

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনেও প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং রাখাইন প্রদেশে বেসামরিক তত্ত্বাবধানে সুরক্ষাবলয় প্রতিষ্ঠাসহ পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেছিলাম।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা প্রলম্বিত হয়ে তৃতীয় বছরে পদার্পণ করেছে; কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও চলাফেরার স্বাধীনতা এবং সামগ্রিকভাবে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরে যায়নি।’ এই সমস্যার অনিশ্চয়তার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুধাবনের অনুরোধ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সমস্যা এখন আর বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাংলাদেশের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিষয়টি এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু ক্রমবর্ধমান স্থান সংকট এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে এই এলাকার পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।’

রোহিঙ্গা ইস্যুকে মিয়ানমার এবং তাদের নিজস্ব জনগণের সমস্যা আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন একটি সমস্যার বোঝা বহন করে চলেছি, যা মিয়ানমারের তৈরি। এটি সম্পূর্ণ মিয়ানমার এবং তার নিজস্ব নাগরিক রোহিঙ্গাদের মধ্যকার একটি সমস্যা। তাদের নিজেদেরই এর সমাধান করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সুরক্ষিত ও সম্মানের সঙ্গে স্বেচ্ছায় রাখাইনে নিজ গৃহে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট ছাড়াও বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলায় বিশেষ করে নিরাপদ অভিবাসন, উদ্বাস্তু সমস্যা, জলবায়ু পরিবর্তন, এসডিজি এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়ে তাঁর সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

বাঙালিদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের পরিচালিত গণহত্যায় ৩০ লাখ নিরপরাধ মানুষ নিহত এবং দুই লাখ নারী নির্যাতনের শিকার হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এই নির্মম অভিজ্ঞতাই সব সময় আমাদের নিপীড়িতদের পাশে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে। যত দিন পর্যন্ত আমাদের ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের ন্যায়সংগত ও বৈধ সংগ্রাম সফল না হচ্ছে, তত দিন তাদের পক্ষে আমাদের দৃঢ় অবস্থান অব্যাহত থাকবে।’

জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে : জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের গতিশীল নেতৃত্বের জন্য তাঁর প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের ভূমিকা অপরিসীম। তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তির সংস্কৃতি ধারণাকে নিয়মিত উত্থাপন করে আসছি। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে এটি জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্যে পরিণত হয়েছে।’ এ মাসের শুরুতে এই সভাকক্ষেই কালচার অব পিস ঘোষণার ২০ বছর পূর্তি উদ্যাপনের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরো বলেন, ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি। ফলে মানুষের মনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে এসেছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী মোতায়েনে জাতিসংঘের আহ্বানে নিয়মিত সাড়া প্রদান করে আসছে। তিনি বলেন, “জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমকে ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী করে তুলতে জাতিসংঘ মহাসচিবের গৃহীত উদ্যোগের প্রতি আমরা সমর্থন ব্যক্ত করছি। তাঁর ‘অ্যাকশন ফর পিস কিপিং’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা অন্যতম চ্যাম্পিয়ন দেশ হিসেবে ওই উদ্যোগে শামিল হয়েছি। এ ছাড়া ‘টেকসই শান্তি’র ধারণাগত কাঠামো প্রণয়নে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মনে করি, বহুপক্ষীয়তাবাদ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধান এবং সর্বজনীন মঙ্গলের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। বিশ্বে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাতিসংঘই আমাদের সব আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এই আশাই ব্যক্ত করেছিলেন।’

শেখ হাসিনা ওই সময় জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে তা শুরু হতে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বিস্ময় : প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে তাঁর সরকারের গত ১০ বছরের কিছু বেশি সময়ের দেশ শাসনে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য দিকও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আজকাল প্রায়ই ‘উন্নয়নের বিস্ময়’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশ।” তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক বিশ্বে নানা অস্থিরতা এবং বিশ্বব্যাপী ক্রমাগত আর্থিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ১০ বছর ধরে সমৃদ্ধি বজায় রেখেছে। স্পেকটেটর ইনডেক্স ২০১৯ অনুযায়ী, গত ১০ বছরে মোট ২৬টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা