kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

এত অভিযোগ তবু বহাল ভিসি

শরীফুল আলম সুমন   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এত অভিযোগ তবু বহাল ভিসি

গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিন এখন নিজেকে বড় আওয়ামী লীগার হিসেবে পরিচয় দেন। অথচ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপি-জামায়াত সমর্থক শিক্ষকদের প্যানেল সোনালি দলের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি। এর পরও তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই।

নিয়োগে দুর্নীতি, ভর্তি বাণিজ্য, প্রকল্পে দুর্নীতি, বিউটি পার্লার ব্যবসা, গোবর ব্যবসা, শিক্ষার্থীদের কটূক্তি, কথায় কথায় বহিষ্কার ইত্যাদি অভিযোগ আছে ওই উপাচার্যের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ নিজের পদ বাঁচাতে বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগও উঠেছে। এখন শুধু বশেমুরবিপ্রবি নয়, দেশের বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁর পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও যেকোনো মূল্যে তিনি পদ ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হলেন ভিসি। শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়ানো ভিসির মূল কাজ। কিন্তু খোন্দকার নাসিরউদ্দিন এসব বাদ দিয়ে দুটি দিকে নজর দিয়েছেন বেশি। প্রথমত, যেকোনো মূল্যে পদ ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকেই বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া।

জানা যায়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঠেকাতে গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও আন্দোলন থেমে নেই, বরং জোরদার হয়েছে। সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি গতকাল সোমবার বৃষ্টিতে ভিজেও আন্দোলন চালিয়ে গেছেন বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা। এবার সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর পরও বহাল আছেন ভিসি খোন্দকার নাসিরউদ্দিন।

উপাচার্যের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আগে থেকে তদন্ত করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। গত শনিবার বর্তমান পরিস্থিতি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বশেমুরবিপ্রবির প্রকৃত ঘটনা ও বর্তমান অবস্থা জানাতে ইউজিসিকে চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। এসব বিষয়ে গত রবিবার ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ্ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ব্যাপারে তদন্ত চলমান রয়েছে। এর পরও মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের নতুন কোনো নির্দেশনা দিলে সে অনুযায়ী আমরা কাজ করব। আমরা দ্রুতই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করব।’

‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ পত্রিকায় মন্তব্য প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য এই প্রশ্নটি ফেসবুকে লিখেছিলেন বশেমুরবিপ্রবির আইন বিভাগের ছাত্রী এবং একটি জাতীয় দৈনিকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া। তাতেই খেপে যান ভিসি। তিনি ওই ছাত্রীকে শোনান কুরুচিপূর্ণ কথা। ফোনে ওই ছাত্রীকে ভিসি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী, তা তোর আব্বার কাছে শুনিস! গেছে কোনো দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে? এটা (ল ডিপার্টমেন্ট) আমি খুলছিলাম বলেই তো তোর চান্স হইছে, নইলে তুই রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়াতি। বেয়াদব ছেলে-মেয়ে। তিন দিনের বাছুর তুই আবার জানতে চাস বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ ওই ঘটনার জের ধরেই জিনিয়াকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। যদিও পরে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকেনি।

বশেমুরবিপ্রবির ভিসির বিরুদ্ধে নানা আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ আছে, তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে এমএলএসএস পদে নিয়োগ দিয়েছেন। বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এসএসসি বা সমমানের পাস বলা হলেও অষ্টম শ্রেণি পাস প্রার্থীদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ বা ২.৫০ জিপিএপ্রাপ্ত প্রার্থীদেরও নিয়োগ দিয়েছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবিধির পরিপন্থী। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সময় ব্যয় না হওয়া প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে তুলে নিয়ে আত্মসাত্ করার অভিযোগও আছে। প্রায় দুই কোটি টাকার অধিক মূল্যের বই ক্রয় এবং দুই থেকে তিন গুণ অধিক মূল্যে কোটি টাকার বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ অসংখ্য অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে।

অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ‘ভিসি কোটা’র নামে নিয়মবহির্ভূতভাবে ফার্মেসি বিভাগ, আইন বিভাগ ও বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি করানোর অভিযোগ আছে ভিসির বিরুদ্ধে। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ফার্মেসি বিভাগে মেধাক্রম ২০৮৪ নিয়েও ভর্তি হয়েছেন এক শিক্ষার্থী। ১৩৩৩ মেধাক্রম নিয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন আরেকজন। অথচ এসব বিভাগে এক থেকে ১৫০ জন ছাত্রের বেশি ভর্তি হওয়ার কথা নয়। এমনকি পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের ভর্তি করারও অভিযোগ আছে।

ভিসি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাংলোয় একটি বিউটি পার্লারও খুলেছিলেন। তিনি নিজে বিউটি পার্লারের সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে গোবর বাণিজ্যেরও অভিযোগ। তিনি মূলত একজন উদ্ভিদ গবেষক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েও তিনি গাছ নিয়েই বেশি ব্যস্ত। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭ সালে গবেষণায় ব্যয় ১০ লাখ টাকা। অথচ গাছ কেনা, পরিচর্যা ও গোবর কেনায় ব্যয় করেছেন প্রায় কোটি টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় বাংলা চত্বরের বিপরীত পাশে প্রতিনিয়তই থাকে গোবরের স্তূপ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা