kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

উপাচার্যদের স্বেচ্ছাচারিতায় উত্তপ্ত শিক্ষাঙ্গন

শরীফুল আলম সুমন   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উপাচার্যদের স্বেচ্ছাচারিতায় উত্তপ্ত শিক্ষাঙ্গন

কিছুদিন আগেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে আলোচনা ছিল তুমুল। নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম। আন্দোলনকারীদের একাংশ তাঁর পক্ষে। অন্য অংশ তাঁর বিরোধী। উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বিদায় নিতে হয়েছে। আলোচনা স্তিমিত হয়ে এলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো আন্দোলন চলছে।

আর নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়েছে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। যথারীতি এই আন্দোলনেরও মূলে উপাচার্য খন্দকার নাসিরউদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও একটি জাতীয় দৈনিকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ফাতেমা-তুজ জিনিয়ার ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করেই উত্তাপের সূত্রপাত। ফেসবুকে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী’ লেখায় ওই ছাত্রীকে বহিষ্কার করেই ক্ষান্ত হননি উপাচার্য, তাঁর বাবা ও পরিবার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও পরে ওই ছাত্রীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন উপাচার্য। কিন্তু তাঁর পক্ষ হয়ে এক দল বহিরাগত গত শনিবার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এতে অনেকেই আহত হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ই বন্ধ ঘোষণা করে। এ ঘটনার পর উপাচার্য নাসিরউদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীরা কঠোর আন্দোলনে নেমেছেন। এমনকি কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এ উপাচার্যের কুশপুত্তলিকাও দাহ করা হয়েছে।  

জানা যায়, অধ্যাপক খন্দকার নাসিরউদ্দিন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকাকালে বিএনপিপন্থী শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর পরও তিনি গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। দ্বিতীয় দফায়ও তাঁর মেয়াদ বৃদ্ধি হয়। সাম্প্রতিক এ ঘটনার আগে থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তদন্ত করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, অনিয়ম-দুর্নীতি করে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিউটি পার্লারের ব্যবসা চালু করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হওয়ার পর আবারও উপাচার্যের বিরুদ্ধে গত শনিবার তদন্ত কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। অভিভাবকের দায়িত্ব হলো সব শিক্ষার্থীকে আগলে রাখা। কিন্তু বেশ কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা উল্টো স্বেচ্ছাচারিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন। নানা বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েছেন। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়া অনেক উপাচার্যই নিয়ম-নীতির খুব একটা ধার ধারেন না। এমনকি তাঁদের ক্যাম্পাসে থাকার কথা থাকলেও তা মানছেন না। তাঁদের অনেকেই রাজধানীতে লিয়াজোঁ অফিস খুলে এখান থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস গাজীপুরের বোর্ডবাজারে হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াজোঁ অফিস ধানমণ্ডিতে। সেখানে উপাচার্যের বাসভবনও রয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগও উঠেছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে। বর্তমানে ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সদ্য সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে ইউজিসি।

ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, যাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে তাঁদের মধ্যে আছেন টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আলাউদ্দিন, গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য খন্দকার নাসিরউদ্দিন, ঢাকার ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য এস এম ইমামুল হক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. আবদুস সাত্তার, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. মতিয়ার রহমান হাওলাদার, দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মু. আবুল কাশেম ও রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কামাল উদ্দিন আহাম্মদ।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশেষ করে মফস্বলের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে রাজনৈতিক ব্যাপার বেশি কাজ করে। আগে থেকেই গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। অন্য আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ব্যাপারেও তদন্ত চলছে। আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত দিতে পারি। তবে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরই।’

জানা যায়, ইউজিসি যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করছে, সেগুলো মূলত নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে চিরকুটের মাধ্যমে ভর্তির অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তিনি অস্বীকার করলেও বিষয়টি বেশ আলোচিত হচ্ছে। কারণ নিয়ম না মেনে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের উপাচার্যের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমামুল হক শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরেই প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া বর্তমানে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করেও সেখানে উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছে। 

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয়ই বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ফলে যিনি নিয়োগ পাচ্ছেন তিনি সব কিছুকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন। এ ছাড়া প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রতিবছর বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ হয়। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে বাণিজ্যও এখন ওপেন সিক্রেট। এ বাণিজ্যে উপাচার্যদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন। আর ভাগ-বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে বিতর্কেরও সৃষ্টি হচ্ছে।

শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সমাজের প্রবণতা হলো যেকোনো উপায়েই হোক মুনাফা লিপ্সা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তো বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠান নয়। এখানকার কাজগুলো অন্য রকম হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, তাই এখানে জবাবদিহি ও সবার অংশগ্রহণ থাকা উচিত। কিন্তু তা দেখা যায় না। শিক্ষক সমিতিও দলীয়। ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয় না। উপাচার্য নিয়োগও যথাযথ হয় না। দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আসলে যোগ্য লোককে যোগ্য জায়গায় না বসালে সমস্যার সমাধান হবে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা