kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

আফিফের পর সাকিবে রক্ষা

সামীউর রহমান, চট্টগ্রাম থেকে   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আফিফের পর সাকিবে রক্ষা

নো বলে শুরু, ম্যাচের মাঝে ফ্লাডলাইট বিভ্রাট এবং শেষ পর্যন্ত সাকিব আল হাসানের বীরত্বে বাংলাদেশের জয়। এভাবেই শেষ হয়েছে ওভাই ত্রিদেশীয় সিরিজের চট্টগ্রাম পর্ব। ফাইনালের আগে বন্দরনগরী থেকে হোম অব ক্রিকেটে ফেরার সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা নিয়ে যাচ্ছে দুটো ম্যাচে জয় পাওয়ার আত্মবিশ্বাস। পাঁচ বছর পর টি-টোয়েন্টিতে আফগানদের হারানোর তৃপ্তি নিয়েই ফাইনালে নামবেন সাকিব-মুশফিকরা।

বিশ্বকাপের অতিমানবীয় ফর্মটাকে বোধ হয় কোথাও লুকিয়ে রেখেছিলেন সাকিব। দেখতে চেয়েছিলেন সতীর্থদের সামর্থ্য। কিন্তু আফগানদের সঙ্গে দ্বিতীয় ম্যাচটাতেও যখন হারের ডংকা বাজছে, তখন সাকিব গোপন কুঠুরি থেকে বের করলেন বিশ্বকাপের ফর্মটা। সুপারম্যান যেমন ক্লার্ক কেন্টের ছদ্মবেশে মিশে থাকে জনারণ্যে আর বিপদের মুহূর্তে আবির্ভূত হয় চিরচেনা সুপারহিরো রূপে, বাইরে থেকে সাকিবের তেমন ভোলবদল না হলেও ভেতরে হয়। বেরিয়ে আসে ‘সুপার সাকিব’, যেমনটা কাল হলো। প্রথমে বোলিংয়ে নবিকে আউট করেছেন, এরপর দলের বিপদে দক্ষ কাণ্ডারির মতো ৪৫ বলে ৭০ রানের ইনিংস খেলে পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে জেতালেন বাংলাদেশকে। টি-টোয়েন্টিতে ১৯তম বারের মতো পঞ্চাশ ছাড়ানো ইনিংস খেলার দিনে ম্যাচসেরার পুরস্কারটা আর কার হাতেই বা উঠতে পারে!

টসে জিতে বোলিং নিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। এরপর যা কিছু তাঁর বিপক্ষে যাওয়া সম্ভব, তার প্রায় সব কিছুই গেছে। বিশাল এক নো-বল দিয়ে শুরু সাইফ উদ্দিনের। পরের ওভারে শফিউল ইসলামের বলে মাহমুদ উল্লাহর সহজ ক্যাচ হাতছাড়া করা। পাওয়ার প্লেতে আফগানদের রান বিনা উইকেটে ৪২, এর মধ্যে মাহমুদই ষষ্ঠ ওভারে দিয়ে গেছেন ১৬ রান! হজরতউল্লাহ জাজাই ও রহমানউল্লাহ গুরবাজ মিলে যখন সমানে চার-ছয় মারছেন, আর সাকিব একের পর এক বোলার পাল্টে যাচ্ছেন, তখনই মাহমুদ ও মোসাদ্দেককে পরখ করার পর বল তুলে দিলেন আফিফ হোসেনের হাতে। সিরিজ শুরুর আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে বোলিং করেছিলেন, পেয়েছিলেন ৩ উইকেটও। কিন্তু আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে তখনো বোলিং করা হয়নি। আফিফ বল হাতে তৃতীয় বলে ৪৭ রান করা জাজাইকে ফেরালেন মুস্তাফিজুর রহমানের ক্যাচ বানিয়ে। এক বল পর আসগর আফগানও বিদায় নিলেন শূন্য রানে। এক ওভারে জোড়া আঘাতের ধাক্কাটা আর সইতেই পারল না আফগানরা। ৯ ওভারে বিনা উইকেটে ৭৫ রান থেকে ২০ ওভার শেষে ৭ উইকেটে ১৩৮ রানে থামল আফগানিস্তান। সাকিব মাত্র ৪ রানে ফিরিয়েছেন ডেঞ্জারম্যান মোহাম্মদ নবিকে। আফিফের জোড়া শিকারের সঙ্গে সাকিব, সাইফ, মুস্তাফিজ ও শফিউল নিয়েছেন একটি করে উইকেট।

১২০ বলে ১৩৯ রানের জয়ের সমীকরণটা কঠিন করে তুললেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে লিটন আউট হয়েছিলেন দারুণ একটা শুরুর পর, আফগানদের বিপক্ষে সেই শুরুটাও পেলেন না। মুজিব-উর-রহমানের বলে আলতো করে ক্যাচ তুলে দেন আসগর আফগানের হাতে। রশিদ খানের বলের মতো নাজমুল হোসেনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভাগ্যও রহস্য, নাভিন-উল-হকের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের প্রথম শিকার হয়ে তাঁর বিদায়ও ৫ রানে। এরপর সাকিব ও মুশফিকের থিতু হওয়া ব্যাটিং দেখে ফের উত্তেজনা ফিরল নিস্তেজ হয়ে আসা গ্যালারিতে। মুশফিক ব্যাট করতে এলেই প্রতিপক্ষ অধিনায়ক একজন ফিল্ডার স্থায়ীভাবে বরাদ্দ রাখেন ডিপ মিডউইকেটে। আধুনিক ক্রিকেটে ট্যাকটিকসের কাঁটাছেঁড়ায় এই তথ্য আর গোপনীয় নয়। রশিদ ফাঁদ পেতেছিলেন, মুশফিক তাতে পা দিলেন। করিম জানাতের অফস্টাম্পের বাইরের শর্ট বল টেনে মিডউইকেট দিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়ে শফিকুল্লাহ শফিকের হাতে ধরা পড়লেন মুশফিক। মহাবিপদের ঘণ্টা বাজল তখনই। খানিকটা সময় পর বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কমে গেল মাঠের আলো। অবস্থাটা যেন বাংলাদেশ দলেরই প্রতীকী, জয়ের আশার সব আলো যে ক্রমেই নিভছে!

আলো জ্বলে উঠে ফের খেলা শুরু হলো ১২ মিনিট পর। নতুন করে খেলা শুরুর পর বেশিক্ষণ টিকলেন না আগের ম্যাচে জয়ের নায়ক মাহমুদও। বোলিংয়ে এক ওভারে ১৬ রান, গুরবাজের ক্যাচ ছাড়ার পর ৮ বলে ৬ রান করে বিদায়। সব মিলিয়ে খারাপ একটা দিনই গেল মাহমুদের। অষ্টম ওভারের পঞ্চম বলে ফিল্ডিং করতে গিয়ে বাম পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ে টান পড়ে রশিদের। চলে যান মাঠের বাইরে। ফিরলেন ১৪তম ওভারে। প্রথম ওভারেই তুলে নিলেন মাহমুদকে। রশিদের পরের ওভারে আফিফ তিন স্টাম্প দেখিয়ে যেভাবে বোল্ড হলেন, তাতে মনে হতে পারে তিনি রশিদ নয় পাড়ার কোনো বোলারকে খেলতে গিয়েছিলেন! রশিদের দুই শিকারের মাঝেও অবশ্য ঘটে গেছে  মহাকাণ্ড! আমিনুল ইসলাম বিপ্লবের চোটে ফের একাদশে সুযোগ হয় সাব্বির রহমানের। তথাকথিত এই টি-টোয়েন্টি বিশেষজ্ঞ ২ বলে ১ রান করে ক্যাচ দিয়েছেন উইকেটের পেছনে। যে ভরসায় তাঁর শাস্তির মেয়াদ কমিয়ে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়া হলো, তার কিছুই অনূদিত হয়নি মাঠে। মিরপুরের ফাইনালে তাঁকে একাদশে নিতে হয়তো টিম ম্যানেজমেন্ট দুবার ভাববে।

রশিদ বনাম সাকিব, বাউটের প্রথম রাউন্ডটা জিতেছিলেন রশিদ। চট্টগ্রামে দ্বিতীয় বাউটটা জিতলেন সাকিব। ১৮তম ওভারে বল করতে আসা রশিদের ওভারে একটি চার ও একটি ছয় মেরে জয়ের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনেন সাকিব। ৪৫ বলে ৮ বাউন্ডারি আর ১ ছক্কায় খেলা ৭০ রানের ইনিংসটি চলতি বছর টি-টোয়েন্টিতে সাকিবের প্রথম হাফসেঞ্চুরি।

ফাইনালের ড্রেস রিহার্সেলে জয়ের তৃপ্তি থাকলেও সন্তুষ্টি নেই। টপ অর্ডার এখনো পারছে না ভালো একটা শুরু এনে দিতে, ফিল্ডিংয়ে ক্যাচ পড়ছে। ফাইনালে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে ফলটা কিন্তু পক্ষে নাও আসতে পারে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা