kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

চিকিৎসকদের অর্ধেকও হিসাবমতো কর দেন না

বিএমডিসিকে চিঠি দিয়ে চিকিৎসকদের ই-টিআইএন ছাড়া নিবন্ধন না দেওয়ার অনুরোধ

ফারজানা লাবনী   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চিকিৎসকদের অর্ধেকও হিসাবমতো কর দেন না

অনেক চিকিৎসক আছেন যাঁরা মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করলেও নামমাত্র রাজস্ব পরিশোধ করছেন। অনেকের করযোগ্য আয় থাকলেও ইলেকট্রনিক ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ই-টিআইএন) গ্রহণই করেননি। নিলেও আয়কর বিবরণী দাখিল করেন না। আবার যাঁরা আয়কর বিবরণী জমা দিচ্ছেন তাঁদের অনেকেই রোগী দেখে কত আয় করেন এবং তাঁরা কী পরিমাণ সম্পদের মালিক তার প্রকৃত তথ্য বিবরণীতে উল্লেখ করছেন না। কর অঞ্চল-১০-এর এক প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকদের প্রায় অর্ধেকই হিসাবমতো রাজস্ব পরিশোধ করছেন না।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার নির্দেশে চলতি অর্থবছর এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও কর অঞ্চল-১০ যৌথভাবে চিকিৎসকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম জোরদার করেছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবে সারা দেশে ই-টিআইএন গ্রহণ করেছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে প্রতিবছর গড়ে আয়কর বিবরণী জমা দিচ্ছে ২০ লাখ। শুধু রাজধানীতে ই-টিআইএন আছে এমন চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার। সারা দেশে আরো প্রায় ৫০ হাজার ই-টিআইএনধারী চিকিৎসক আছেন। সারা দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। চিকিৎসকদের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে রয়েছে এনবিআরের কর অঞ্চল-১০। এরই মধ্যে চিকিৎসকদের রাজস্ব পরিশোধে স্বচ্ছতা আনতে এনবিআর বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম কর অঞ্চল-১০ বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) চিঠি দিয়ে চিকিৎসকদের নিবন্ধনের সময়ে ই-টিআইএন বাধ্যতামূলক করার অনুরোধ জানিয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কর অঞ্চল-১০ ও সিআইসি রাজধানীর নামিদামি যেসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চেম্বারে চিকিৎসকরা রোগী দেখেন তার তালিকা করেছে। এসব জায়গায় পরিচয় গোপন করে এনবিআর কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে রোগী দেখার তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করার চেষ্টা করছেন। আবার নোটিশ ছাড়াই হাজির হয়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের আয়-ব্যয়ের তথ্যের সত্যতা যাচাই করছেন। তদন্তকালে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যেসব চিকিৎসক নিয়মিত রোগী দেখে থাকেন তাঁরা গড়ে প্রতিদিন কতজন রোগী দেখছেন সেই তথ্য হাসপাতাল ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সংগ্রহ করছেন।

তদন্তকালে রোগী দেখা ছাড়া চিকিৎসককের অন্য কোনো আয় আছে কি না এনবিআর কর্মকর্তারা সে তথ্যও জোগাড় করছেন। চিকিৎসকদের আয় ও সম্পদের সব তথ্য জোগাড় করার পর তাঁদের আয়কর বিবরণীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। এভাবে এনবিআর কর্মকর্তারা চিকিৎসকদের রাজস্ব ফাঁকির তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করছেন। 

কর অঞ্চল-১০ এর কমিশনার মো. আবু তাহের চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের কাছ থেকে হিসাবমতো রাজস্ব আদায়ে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের রোগী দেখার জন্য বিএমডিসি থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। আমরা সেখানে নজর দিয়েছি। ই-টিআইএন ছাড়া কোনো চিকিৎসককে নিবন্ধন না দিতে এরই মধ্যে আমরা চিঠি দিয়ে বিএমডিসিকে অনুরোধ করেছি। আশা করছি প্রতিষ্ঠানটি তা মেনে চলছে।’

প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ে তথ্য-প্রমাণের অভাব এবং তদবির সুপারিশকে অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এনবিআর।

তথ্য-প্রমাণের অভাব : রাজস্ব ফাঁকিবাজ চিকিৎসকরা রোগীর সিরিয়াল নেওয়ার একাধিক খাতা (রেজিস্টার) রাখছেন। যে খাতায় প্রকৃত তথ্য থাকে সেটা তাঁরা (রাজস্ব ফাঁকিবাজ চিকিৎসকরা) গোপন রাখেন। এনবিআর কর্মকর্তারা তদন্তে গেলে তাঁদের কাছে অল্প কয়েকজন রোগীর সিরিয়াল উল্লেখ করা খাতা জমা দেন। এ ছাড়া অনেক চিকিৎসক পাসওয়ার্ড দিয়ে অনলাইনে রোগীর সিরিয়াল নেন। এতে করে পাসওয়ার্ড না জানলে চিকিৎসক প্রতিদিন কতজন রোগী দেখছেন অন্য কারো পক্ষে সেটা জানা সম্ভব হয় না।

এনবিআরে তলব : কর অঞ্চল-১০ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে অনেক চিকিৎসককে এনবিআর দপ্তরে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রতিদিন বা মাসে গড়ে কতজন রোগী দেখছেন এবং কত করে নিচ্ছেন তা জানতে চাওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ নামিদামি চিকিৎসক এ সময় এনবিআর কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন তাঁরা দৈনিক চার-পাঁচজনের বেশি রোগী দেখেন না। এ সময় এনবিআরের তদন্ত কর্মকর্তারা ওই চিকিৎসকের সামনেই তাঁর কাছে রোগী দেখানোর জন্য তাঁর চেম্বারে ফোন করলে জানা হয় আগামী ১৫-২০ দিন বা এক মাসে কোনো সিরিয়াল দেওয়া যাবে না। তখন ওই চিকিৎসক জানান, তিনি পাঁচজনের কাছ থেকে অর্থ নিলেও অন্যদের বিনা পয়সায় দেখেন।

প্রভাবশালীদের তদবির : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নামিদামি চিকিৎসকদের কাছে সমাজের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চিকিৎসা নিতে আসেন। এতে তাঁদের মধ্যে সুস্পর্ক গড়ে ওঠে। এনবিআর থেকে হিসাবমতো রাজস্ব আদায়ের জন্য যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দিয়ে রাজস্ব পরিশোধে চাপ না দিতে তদবির করান। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজস্ব ফাঁকিবাজ চিকিৎসক প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছেও সঠিক তথ্য দেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক চিকিৎসক এনবিআর কর্মকর্তারা রাজস্ব আদায়ের নামে ঘুষ নিতে এসেছেন বলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে মিথ্যা তথ্য দেন। ঘুষ দিয়ে এনবিআর কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করা গেলে তো আর প্রভাবশালীকে দিয়ে তদবির করানো প্রয়োজন হতো না।’

হাসপাতালের সঙ্গে যোগসাজশে রাজস্ব ফাঁকি : রোগী দেখার জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আগেই চিকিৎসকদের অনেকে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কতজন রোগী দেখবেন তার প্রকৃত তথ্য কোথাও সরবরাহ না করার শর্ত দেন। হাসপাতাল বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের প্রচার-প্রসারের স্বার্থে তা মেনে নিয়ে থাকে বলে এনবিআরের তদন্তে উঠে এসেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা