kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাতারাতি কোটিপতি খুলনার যুবলীগ নেতা লিংকন

মিল দখল করে সারের গুদাম

তৈমুর ফারুক তুষার, খুলনা থেকে ফিরে   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিল দখল করে সারের গুদাম

খানজাহান আলী থানার বিভিন্ন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন খুলনা জেলা পরিষদ সদস্য ও খানজাহান আলী থানা যুবলীগের আহ্বায়ক সাজ্জাদুর রহমান লিংকন। তিনি একাধিক জুটমিল দখল, ঘাট দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন। ১০ বছর আগেও নিজের সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন লিংকন। এখন তিনি গাড়ি, বাড়ির মালিক বনে গেছেন; করেন বিলাসী জীবনযাপন। এ মাসেই খুলনা মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মনোনীত হয়েছেন লিংকন।

খুলনার ফুলবাড়ি গেট এলাকার মীরেরডাঙ্গায় অবস্থিত অ্যাজাক্স জুট মিল। গত বুধবার মিলটিতে গিয়ে দেখা যায়, ফটক থেকে শুরু করে পুরো মিল এলাকায় রাখা আছে হাজার হাজার সারের বস্তা। বস্তার স্তূপ একেকটা ছোট টিলার আকার ধারণ করেছে। মিলের এক গজ জায়গাও আর ফাঁকা নেই। সবখানে সারের বস্তার স্তূপ। বস্তা রাখতে গিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে মিলের বাইরে রাস্তাসংলগ্ন নিরাপত্তাপ্রাচীর।

ওই সব সার সরিয়ে নেওয়ার জন্য খুলনার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার একাধিকবার চিঠি দিয়েছেন অ্যাজাক্স জুট মিল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কাওসার জামান বাবলা। গত ১২ মার্চ জেলা প্রশাসকের কাছে আইনি সহায়তা চেয়ে আবেদন করেন তিনি। এরপর ২৩ মে খুলনা পুলিশ কমিশনার এবং ২২ জুন খুলনার জেলা প্রশাসক বরাবর আবারও চিঠি লেখেন বাবলা। কিন্তু লিংকনের দখলদারি উচ্ছেদ করা যায়নি।

জেলা প্রশাসকের কাছে লেখা চিঠিতে কাওসার জামান বাবলা জানান, মিলের জায়গায় সার রাখার মাধ্যমে প্রতি মাসে ২০ লাখ টাকা করে ভাড়া আদায় করেন লিংকন। গত মে মাস পর্যন্ত লিংকন আট কোটি ৪০ লাখ টাকা আদায় করেছেন। অন্যদিকে সার রাখার ফলে জুটমিলের ৫০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে, যা আর চালু করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে সার রাখার ফলে মিলের ভবনগুলোর দেয়াল ও যন্ত্রপাতিতে নোনা ধরে গেছে। মিলের অভ্যন্তরে থাকা শ্রমিকরা নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। সার আনা-নেওয়ার কাজে ভারী ট্রাক ব্যবহার করায় মিলের ভেতরের রাস্তাটি একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে।

কাওসার জামান বাবলা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লিংকন কয়েক বছর ধরে মিলটি দখল করে সার রাখছে। শুধু সার রেখেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, মিলের মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও তার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ চুরি করেছে লিংকন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দিয়েও আমি কোনো প্রতিকার পাইনি।’

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনায় ঘাটকেন্দ্রিক সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বহু বছর ধরেই চলে আসছে। নগরীর ৪ নম্বর ঘাট ঘিরে উত্থান ঘটেছিল বহুল আলোচিত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের। বর্তমানে নগরের শিরোমণি ঘাট ঘিরে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন লিংকন। এটি বর্তমানে নগরীর ব্যস্ততম একটি ঘাট। মোংলা বন্দর থেকে পণ্য এই ঘাটে এনে খালাস করা হয়।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) এই ঘাট দরপত্রের মাধ্যমে এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হতো। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে এখানে নিজের আধিপত্যের থাবা বসান লিংকন। ১০১৪-১৫ বর্ষে ঘাটটির ইজারা পান খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য এস এম মনিরুজ্জামান। সে সময় স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় লিংকনকে অংশীদার হিসেবে নিতে বাধ্য হন মনিরুজ্জামান। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ঘাটে আধিপত্য বিস্তার করেন লিংকন। ২০১৪ সালের পর থেকে নানা কৌশলে বন্ধ করে দেওয়া হয় টেন্ডারের মাধ্যমে ঘাট ইজারা। প্রতি মাসে ‘স্পট কোটেশন’-এর মাধ্যমে মাসিক চুক্তিতে ইজারা দেওয়া শুরু হয়।

একপর্যায়ে নিম্ন আদালতের এক রায়ে গত ২৬ মে পর্যন্ত ঘাটটির ইজারা পান মনিরুজ্জামান। গত ১৪ মে উচ্চ আদালত মনিরুজ্জামানের ইজারা বাতিল করে দেন। পরদিন ১৫ মে লিংকন তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান এলআর ইন্টারন্যাশনালের নামে বরাদ্দ পান। বিআইডাব্লিউটিএর উপপরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান এক আদেশে লিংকনের মালিকানাধীন এলআর ইন্টারন্যাশনালকে মাসিক চার লাখ ২৭ হাজার টাকা হারে ওই ইজারা দেন।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, আদালতের রায়ের কপি বিআইডাব্লিউটিএতে পৌঁছানোর আগেই ইজারা পান লিংকন। ওই ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। ইজারার ক্ষেত্রে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া, ঘাটসংলগ্ন এলাকায় মাইকিং করার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি।

বিআইডাব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা জানান, দরপত্র আহ্বান করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিরোমণি ঘাট ইজারা দেওয়া হলে বছরে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়া সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবে যুবলীগ নেতাকে স্পট কোটেশনের মাধ্যমে ইজারা দেওয়ায় বছরে অর্ধকোটি টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সাজ্জাদুর রহমান লিংকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আমার বিরুদ্ধে এসব রটাচ্ছে। অ্যাজাক্স জুট মিলের মালিকানা নিয়ে সমস্যা আছে। আমি এক পক্ষের অনুমতি নিয়েই সার রাখছি। আর ঘাট ইজারাও নিয়েছি নিয়মমাফিক।’ গত ১০ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া প্রসঙ্গে লিংকন বলেন, ‘আমি বৈধ ব্যবসার মাধ্যমেই এ সম্পদ অর্জন করেছি।’

জানা গেছে, শিরোমণি ঘাটের পর দৌলতপুর মহসিন স্কুল এবং নগর ঘাটটিও দখলে নিয়েছেন লিংকন। এ নিয়ে ঘাট দুটির ইজারাদার সাইফুর রহমান সুজন ও খুলনা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছে লিংকনের।

লিংকনের দাপটে অসহায় স্থানীয় প্রশাসনও। বছরখানেক আগে লিংকনের সহযোগী মনিরুজ্জামান মুকুলকে আটক করেছিল খানজাহান আলী থানার পুলিশ। প্রতিবাদে লিংকনের নেতৃত্বে তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। তখন মুকুলকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় কোনো মামলা না হলেও ওই থানার ওসিকে বদলি করা হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা