kalerkantho

শনিবার । ১৬ নভেম্বর ২০১৯। ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অপ্রতিরোধ্য হুন্ডি, দেশ হারাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা

হুন্ডি প্রতিরোধ ও বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ উৎসাহিত করতে নানা উদ্যোগ

জিয়াদুল ইসলাম   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অপ্রতিরোধ্য হুন্ডি, দেশ হারাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা পদক্ষেপের পরও হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ প্রেরণ থামছে না। বিভিন্ন দেশে হুন্ডি কারবারিদের অপতৎপরতার কারণে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার (প্রবাসী আয়) একটা বড় অংশ দেশে আসছে না। এর পরিবর্তে দেশে আসছে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করে দেওয়ার সংকেত কিংবা মেসেজসংবলিত নির্দেশনা। সেই নির্দেশনা মেনে হুন্ডি কারবারিদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা প্রবাসীর স্বজনের কাছে সরাসরি কিংবা তাঁর নিজস্ব মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের মাধ্যমে অর্থ পৌঁছে দিচ্ছে। মোবাইলে বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করে এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল হুন্ডি। বিভিন্ন সময় সরকারি-বেসরকারি সংস্থার জরিপেও হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসার তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপে হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ৫ শতাংশ রেমিট্যান্স আসার তথ্য দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে অবশ্য হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসার হার ছিল প্রায় ২২ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোকে তাঁরা ঝামেলা মনে করেন। কারণ বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে খরচ ও সময় বেশি লাগে। অন্যদিকে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠালে মুদ্রার বিনিময় হার বেশি পাওয়া যায়। আবার প্রবাসীর পাঠানো অর্থ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যায় স্বজনরা। এসব কারণে প্রবাসীদের অনেকেই এখনো বৈধ পথে না গিয়ে অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাচ্ছেন। এমন অবস্থায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণ উৎসাহিত করতে বিদেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা, সাবসিডিয়ারি ও একচেঞ্জ হাউসের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ সাপ্তাহিক ছুটির দিনসহ সাত দিনই তাঁদের স্বজনদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

গত ৩ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নে ‘রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি ও প্রবাসীদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি’সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধিতে বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—যেসব দেশে বাংলাদেশের ব্যাংকসমূহের শাখা, সাবসিডিয়ারি ও ড্রয়িং অ্যারেঞ্জমেন্ট (একচেঞ্জ হাউস) চালু রয়েছে, সেসব দেশে এ সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং রেমিট্যান্সের জন্য সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাংকসমূহের শাখা, সাবসিডিয়ারি, ড্রয়িং অ্যারেঞ্জমেন্ট চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বৈধ চ্যানেলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনসহ সাত দিনই প্রবাসী কর্তৃক প্রেরিত রেমিট্যান্স তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ। এ লক্ষ্যে বিকল্প সার্ভিস ডেলিভারি চ্যানেল যেমন মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), এজেন্ট ব্যাংকিং ইত্যাদি প্রসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সম্প্রতি এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ পর্যন্ত নানাবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।  প্রতিনিয়ত বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউসের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্রয়িং ব্যবস্থা স্থাপন উৎসাহিত করা হচ্ছে। অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর পদ্ধতিতে (ইএফটি) ড্রয়িং ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টির সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে। বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব মালিকানায় বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউস প্রতিষ্ঠার অনুমোদন প্রদান করা হচ্ছে। রেমিট্যান্স বিতরণের নেটওয়ার্ক আরো সম্প্রসারণের জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশি ২৪টি ব্যাংকে রেমিট্যান্সের অর্থ মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে বিতরণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ উৎসাহিত করতে প্রতিবছর বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স আওয়ার্ড প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়া বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ উৎসাহিত করতে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হবে। আর এ জন্য বাজেটে তিন হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের উদ্যোগে ‘অ্যাকসেস টু ফিন্যান্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এতে দেশের ৬৪টি জেলার দুই হাজার ৮৭২ জন মানুষ অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে রেমিট্যান্স গ্রহণ করেছেন এমন মানুষের সংখ্যা ছিল ৩১৯ জন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট রেমিট্যান্স গ্রহীতার মধ্যে গড় হিসাবে হুন্ডির মাধামে অর্থ পান ৪.৯০ শতাংশ মানুষ। এর আগের দুই অর্থবছরে হুন্ডির মাধ্যমে আরো বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স আসে। এ তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় সরকারের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায়। ওই প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তদন্ত প্রতিবেদন ও সন্দেহজনক লেনদেনের ৬৭৭টি প্রতিবেদন বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠায় বিএফআইইউ। এর মধ্যে হুন্ডিসংক্রান্ত লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬০৯টি।

এ বিষয়ে বিএফআইইউ প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হুন্ডি যদি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আসে তবে সেটা জানতে পারি। ব্যাংকিং চ্যানেলে কোনো একটি লেনদেনে অনেক হাতবদল হলে বোঝা যায় ওই লেনদেনটি সন্দেহজনক। ওই লেনদেনের অর্থ দেশের বাইরে থেকেও আসতে পারে, আবার দেশের কেউ এটি জমা করতে পারে। এ রকম গতিবিধির লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে বিএফআইইউতে রিপোর্ট করে থাকে রিপোর্টিং এজেন্সিগুলো। তবে নগদ লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে হলে সেটা আমরা ধরতে পারি না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অঙ্ক ২০১৭-১৮ এর চেয়ে ৯.৬ শতাংশ বেশি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা