kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

যুবলীগ নেতা শামীমের অফিসে টাকার ছড়াছড়ি

যুবলীগ নেতা খালেদের দেওয়া তথ্যে গ্রেপ্তার
চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



যুবলীগ নেতা শামীমের অফিসে টাকার ছড়াছড়ি

রাজধানীর নিকেতন এলাকায় যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের অফিস থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা, ডলার, এফডিআরের কাগজ, অস্ত্র ও মদ উদ্ধার করে র‌্যাব। ছবি : কালের কণ্ঠ

অভিজাত কার্যালয়ের একটি টেবিলের ওপর বিপুল অর্থ, অস্ত্র, মদের বোতল রাখা। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন যুবলীগ নেতা গোলাম কিবরিয়া (জি কে) শামীম। তাঁর চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। কথা বলতে চাইলে হাত নেড়ে না সূচক জবাব দেন তিনি। তখন র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁকে (শামীম) এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে। এ সময় সাংবাদিকরা ছবি তুলতে চাইলে শামীম বলেন, ‘আমার ছবি তুইলেন না। আমার একটা সম্মান আছে। আমাকে বেইজ্জতি কইরেন না প্লিজ।’

গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর নিকেতনে ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর বাসায় জি কে শামীমের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জি কে বিল্ডার্সের (জি কে বি অ্যান্ড কম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড) কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। দুপুর ১টার দিকে ওই বাসায় ঢুকে দেখা যায় হাফ হাতা শার্ট ও প্যান্ট পরা শামীম কখনো দাঁড়ানো, আবার কখনো বসা অবস্থায় তাঁর কার্যালয় থেকে জব্দ করা টাকাসহ অন্যান্য বিষয়ে র‌্যাব সদস্যদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছিলেন। বিকেল ৫টায় অভিযান শেষ করে র‌্যাব।

এরপর ওই বাসার নিচতলায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, জি কে শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি নিজেকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সমবায়বিষয়ক সম্পাদক বলে দাবি করেছেন। সকালে শামীমকে তাঁর নিকেতনের ১১৩ নম্বর বাসা থেকে আটক করা হয়। এরপর তাঁকে নিয়ে নিকেতনের ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর চারতলা ভবনে অভিযান চালান র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে ১৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) কাগজ ও নগদ এক কোটি ৮০ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর জিম্মা থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র, তাঁর দেহরক্ষীদের সাতটি শটগান, গুলি ও পাঁচ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সকাল থেকে আমরা শামীমের বাসা ও অফিসে অভিযান শুরু করি। শামীম ও তাঁর সাতজন দেহরক্ষীকে প্রথমে আটক করা হয়।’ তিনি জানান, ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের মধ্যে ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর শামীমের মায়ের নামে। বাকি ২৫ কোটি টাকার এফডিআর তাঁর নিজের নামে। এ ছাড়া তাঁর অফিস থেকে ৯ হাজার মার্কিন ডলার ও ৭৫২ সিঙ্গাপুরি ডলারও জব্দ করা হয়েছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব কর্মকর্তা সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির ক্ষেত্রে শামীমের নাম এসেছে। তাঁর কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে। এগুলো কিভাবে এসেছে আমরা তদন্ত করে বের করব।’

ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে। আমরা সেসব তদন্ত করছি।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘শামীমের অফিস থেকে জব্দ করা এফডিআরের টাকাগুলো বিভিন্ন অবৈধ সোর্স (উৎস) থেকে এসেছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। আমাদের কাছে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল যে কিছু অবৈধ সোর্স থেকে তাঁর এফডিআরের টাকাগুলো এসেছে। সেসব অভিযোগ আমরা তদন্ত করে দেখছি। এ বিষয়ে মানি লন্ডারিং আইনে তদন্তকাজ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শামীমকে আদালতে এফডিআরগুলোর সোর্স বৈধ প্রমাণ করতে হবে।’ জব্দ করা আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জব্দ অস্ত্রগুলো বৈধ। তবে অভিযোগ রয়েছে এগুলো অবৈধ কাজে ব্যবহার হতো। এ জন্যই আমরা সেগুলো জব্দ করেছি।’

শামীমের রাজনৈতিক পরিচয় বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘তাঁর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি না তা নির্ধারণ করবেন তাঁর দল ও নেতারা। এ দায়িত্ব আমাদের নয়। যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার স্বীকারোক্তিতে বিভিন্ন অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে শামীমের নামও উঠে আসে। মূলত খালেদের তথ্যের ভিত্তিতেই শামীমকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালানো হয়।’

ব্রিফিংয়ের পর গতকাল সন্ধ্যায় শামীম ও তাঁর সাত দেহরক্ষীকে র‌্যাব-১-এর কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, এর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরী হত্যায় প্ররোচক হিসেবে শামীমকে সন্দেহ করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের সময় চট্টগ্রামে জি কে বিল্ডার্সের একটি ঠিকাদারি কাজ চলছিল। ওই সময় ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে দিয়াজ খুন হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতেই শামীমের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। 

সরেজমিন : গতকাল সকাল ১১টা থেকে জি কে শামীমের নিকেতনের ডি ব্লকের ৫ নম্বর রোডের ১৪৪ নম্বর বাসা ঘিরে ফেলে র‌্যাব। এর আগে নিকেতন এলাকায় শামীমের আরেকটি বাসা থেকে তাঁকে ডেকে আনা হয়। পরে তাঁকে আটক করেই অভিযান চালায় র‌্যাব।

দুপুর ১টার দিকে চারতলার ওই বাসায় ঢুকে প্রথমেই দেখা যায় বিশাল গ্যারেজ। গ্যারেজের পাশে কাচ দিয়ে ঘেরা একটি অফিসকক্ষ, এখানে কর্মচারী ও কর্মকর্তারা বসেন। গ্যারেজে একটি মাইক্রোবাস ও তিনটি প্রাইভেট কার দেখা যায়। কাচ দিয়ে ঘেরা অফিসকক্ষের দেয়ালের পুরোটাই সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে শামীমের ছবি টানানো রয়েছে। এক পাশের দেয়ালে টেলিভিশন লাগানো। এরপর সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে চোখে পড়ে প্রতিটি ফ্লোরেই ছোট ছোট কক্ষে জি কে বিল্ডার্সের কর্মকাণ্ড চলছে। অভিযানের সময় অফিসগুলোতে অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছিলেন। তবে কথা বলতে চাইলে কেউই শামীমের বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। ভবনের তিনতলার একটি কক্ষে শামীমের বসার কক্ষ। প্রায় ৩০ ফুট লম্বা ও ২০ চওড়া কক্ষটি। পুরো কক্ষটিতে দামি বাতি, কাঠ দিয়ে সাজানো। বড় আকারের দুটি টিভি রয়েছে ঘরে। তিন সেট সোফা ও একটি বড় টেবিল রয়েছে। ওই টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে টাকার বান্ডিল, মদের বোতল ও অস্ত্র। এগুলো ওই কক্ষ থেকে পাওয়া গেছে। ওই কক্ষের পাশেই আছে শামীমের ব্যক্তিগত কক্ষ।

শামীম সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার দক্ষিণপাড়া গ্রামের মো. আফসার উদ্দিন মাস্টারের ছেলে শামীম। তিনি গণপূর্তের ঠিকাদার।

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী দাবি করেন, জি কে নামে যুবলীগে কোনো নেতা নেই। সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু বলেছেন, যুবলীগে শামীমের কোনো পদ না থাকলেও তিনি নিজেকে সংগঠনের সমবায়বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি আরো বলেন, ‘জি কে শামীম একসময় যুবদলের সহসম্পাদক ছিল। এখন সে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বলে শুনেছি।’ 

তবে গতকাল আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেছেন, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কমিটিতে জি কে শামীম বলে কেউ নেই।

উল্লেখ্য, গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠে জি কে শামীমকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তিনি যুবদল থেকে যুবলীগে যোগ দিয়েছেন। দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি চলাফেরা করতেন।

এর আগে গত বুধবার অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। পাশাপাশি তাঁর মালিকানাধীন রাজধানীর ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থসহ ১৪২ জনকে আটক করেছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

যেসব কাজ করছে শামীমের প্রতিষ্ঠান : রাজধানীর সবুজবাগ, বাসাবো, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত জি কে শামীম। গণপূর্ত ভবনে ঠিকাদারি কাজে তাঁর দাপটের খবর এরই মধ্যে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।

সচিবালয়, র‌্যাব সদর দপ্তর, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতালসহ বড় বড় ১৭টি প্রকল্পের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারির কাজ করছেন র‌্যাবের হাতে আটক হওয়া এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম।

তাঁর মালিকানাধীন জিকেবি অ্যান্ড কম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের নামে তিনি এসব কাজ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।

র‌্যাবের পক্ষ থেকে শামীমকে আটকের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই শামীমের অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা জিকেবির নামে পাওয়া টেন্ডারের তথ্য সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন। তাঁদের একজন দিদার। তিনি নিজেকে শামীমের একান্ত সচিব (পিএস) বলে দাবি করেন।

দিদারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শামীম তাঁর প্রতিষ্ঠানের নামে বড় বড় ১৭টি প্রকল্পের কাজ পেয়েছেন। এর মধ্যে ৪০০ কোটি টাকার কাজ সোহরাওয়ার্দী

হাসপাতালের। ৩০০-৩৫০ কোটি টাকার কাজ পঙ্গু হাসপাতালের।

এ ছাড়া বড় প্রকল্পের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার কাজ র‌্যাব সদর দপ্তরের, ১৫০ কোটি টাকার সচিবালয়, ৪০০ কোটি টাকার এনবিআর, ১৫০ কোটি টাকার সচিবালয় ক্যাবিনেট ভবন, ২০০ কোটি টাকার মহাখালী ডাইজেস্টিভ ও বেইলি রোডে ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প রয়েছে।

এর পাশাপাশি ২০-২৫ কোটি টাকার অ্যাজমা, ২০-২৫ কোটি টাকার ক্যান্সার, ২০-২৫ কোটি টাকার সেবা মহাবিদ্যালয়, ৮০ কোটি টাকার নিউরোসায়েন্স, ৮০ কোটি টাকার বিজ্ঞান জাদুঘর, ১২ কোটি টাকার পিএসসি, ৩০-৬০ কোটি টাকার র‌্যাব ফোর্স, ৬৫ কোটি টাকার এনজিও ফাউন্ডেশন এবং মিরপুর-৬ নম্বরে ৩০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ রয়েছে শামীমের হাতে।

এসব প্রকল্পের তথ্য দিয়ে দিদার বলেন, ‘জি কে শামীম স্যার সম্মানী ব্যক্তি। সরকারের বড় বড় প্রায় সব প্রকল্পের কাজ তিনি পেয়েছেন। সুতরাং স্যারের কাছে কোটি টাকা থাকা কোনো ব্যাপার না। আমরা চাই তাঁকে যেন তাঁর যোগ্য সম্মানটা দেওয়া হয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা