kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নদ-নদী রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা

নিখিল ভদ্র   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নদ-নদী রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত  কর্মপরিকল্পনা

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব এবং দখল-দূষণের কারণে দেশের নদ-নদীর সংখ্যা ও আয়তন প্রতিনিয়ত কমছে, যা পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এ অবস্থায় নদ-নদী রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ২৫ বছর মেয়াদি ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। সচেতনতা বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণও শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বর্তমানে নদ-নদী রক্ষায় কাজ করছে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এর মধ্যে নদীর পানির প্রবাহ ঠিক রাখা ও দখল রোধে প্রধান দায়িত্ব পালন করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পানি উন্নয়ন বোর্ড। নদীপারের বন্দরগুলো দেখভালের দায়িত্ব নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের। আর নদীর দূষণ ঠেকানোর কাজে রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সর্বশেষ নদীর দখল ও পরিবেশদূষণ ঠেকাতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। যাদের নেতৃত্বে নদী রক্ষায় সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।

জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিবেদেন দেশের নদ-নদী রক্ষায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫ বছর (২০১৫-২০৪০) মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন স্থানে ২২০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীপথ সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রায় এক হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও ৩৫০ কিলোমিটার নৌপথ সংরক্ষণ করা হবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট ছিলেন বর্তমানে এ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রমেশ চন্দ্র সেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নদীর দখল এখন থেকেই সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এ জন্য আগেই আন্ত মন্ত্রণালয়ের সভায় বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যার বাস্তবায়নের জন্য সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে সংসদীয় কমিটিকে দেওয়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কথা জানানো হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের দুই পাশে ১৬ হাজার ২২৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছে। এর মধ্যে পাকা দুই হাজার ৫৭৭টি, আধাপাকা এক হাজার ৬৯৬টি ও অন্যান্য স্থাপনা ১১ হাজার ৯৫২টি। উদ্ধার হওয়া তীরভূমি ও জায়গার পরিমাণ ৬০১ দশমিক ৩২ একর। উচ্ছেদ চালানোর সময়ে ঢাকা নদীবন্দরে ৪১ লাখ ২৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে ২১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে চলতি বছরে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে তিন হাজার ২০০ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও ৯১ একর ভূমি উদ্ধার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩২টি নদীবন্দর রয়েছে। তবে ২৮টি নদীর সীমানা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। যে কারণে বন্দরের অনেক এলাকা দখলদারদের কবলে পড়লেও তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো বন্দর এলাকায়ও নদীগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার নদীর সীমানা নির্ধারণের পাশাপাশি সারা দেশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করেছে। একই সঙ্গে আবহমান বাংলার চিরায়ত নদীকে স্বরূপে ফেরানোর লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে নদীকে স্বরূপে ফেরাতে কর্মপরিকল্পনার মধ্যে আট ধরনের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সারা দেশের পানিসম্পদের সদ্ব্যবহার, নদ-নদী দূষণরোধে ও রক্ষায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত এবং পাঠ্যপুস্তকে নির্দিষ্ট কারিকুলাম সংযোজন করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর ভবিষ্যতে নদীর জায়গা বেদখল হওয়া বন্ধে জনগণকে সম্পৃক্ত করা, জমি ক্রয়ের আগে কোনো নদীর অংশ কি না তা উল্লেখ করতে আইনের ধারা সংযুক্ত করা, আবর্জনা যথাস্থানে ফেলতে বাক্স বা ঝুড়ি সংরক্ষণ এবং নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য, নির্গত আবর্জনা ও ময়লা ফেলা বন্ধে প্রচারপত্র বিলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নদীর বর্জ্য উত্তোলনের জন্য বর্জ্য উত্তোলন উপযোগী জাহাজ কেনার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

নদীবন্দরের পাশাপাশি নদ-নদী রক্ষায় সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, নদীর তীরসহ নদীসমূহের সার্বিক চিত্র পরিদর্শন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার দখলদারদের উচ্ছেদের পাশাপাশি ভবিষ্যতে দখল বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। যার মাধ্যমে সারা দেশে নদ-নদীসমূহ দখলকারীদের হাত থেকে রক্ষা নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে সরকারের এ উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক মিহির বিশ্বাস। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, নদ-নদী রক্ষায় মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবে প্রকৃত সুফল পাওয়া যায় না। নজরদারির অভাবে উচ্ছেদের পরও দখলদাররা ফিরে আসে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাপা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী রক্ষায় সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেছে। যা বাস্তবায়ন করা হলে নদ-নদীর প্রবাহ অনেকটা স্বাভাবিক হবে বলে তিনি দাবি করেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা