kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

নির্বাচন কমিশনের সার্ভার ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের এনআইডি বানিয়ে দিত এরা

জয়নালের বাসা ছিল ‘নির্বাচন অফিস’!

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জয়নালের বাসা ছিল ‘নির্বাচন অফিস’!

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের এনআইডি বানিয়ে দিত এরা। জালিয়াতচক্রের এমন তিন হোতা বাঁ থেকে সোমাইয়া আক্তার, বিজয় দাশ ও জয়নাল আবেদিন। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভোটার হতে ইচ্ছুক কয়েকজন রোহিঙ্গার তথ্য হাতে জমা হলেই সাপ্তাহিক ছুটির আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি অফিস থেকে গোপনে ডিএসএলআর ক্যামেরা, ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার, সিগনেচার প্যাড তাঁর বাসায় নিয়ে যেতেন। আর শুক্র ও শনিবার বাসায় বসে সে ল্যাপটপের সঙ্গে সেসব সরঞ্জাম জুড়ে তথ্য তৈরি (ডাটা ক্রিয়েট) করে তাতে রোহিঙ্গাদের আঙুলের ছাপসহ মেইলে ঢাকায় জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতচক্রের অন্য সদস্য সাগরের কাছে পাঠাতেন। আবার রবিবার অফিস খোলার দিন আগেভাগে অফিসে এসে সব কিছু যথাস্থানে রেখে দিতেন। এভাবেই চট্টগ্রাম নির্বাচন অফিসের পিয়ন জয়নাল আবেদীনের বাসা যেন হয়ে উঠেছিল অলিখিত নির্বাচন অফিস।

সাগর নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে অবৈধভাবে ঢুকে তথ্য আপলোডসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রিন্ট কপি এসএ পরিবহনের মাধ্যমে জয়নালের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। প্রতিটি পরিচয়পত্র তৈরির জন্য জয়নাল রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা করে নিতেন।

২০০৮ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন প্রকল্পে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কাজ করা সাগর ও সত্য সুন্দর দের সঙ্গে মিলে জয়নাল জালিয়াত সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। গত দুই বছর ধরে নির্বাচন কমিশনকে রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে এই চক্র। পাসপোর্ট অফিসগুলোতে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ একের পর এক রোহিঙ্গা শনাক্ত হলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) কোনোভাবেই চক্রটির সন্ধান পাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত গত সোমবার রাতে তাঁর ঘর থেকেই জয়নালকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে জালিয়াতির পুরো বিষয়টি উন্মোচিত হয়েছে। চক্রের অন্য দুজন সাগর ও সত্য সুন্দর পলাতক থাকলেও জালিয়াতিতে সহায়তাকারী জয়নালের বন্ধু বিজয় দাশ ও তাঁর বোন সীমা দাশ ওরফে সুমাইয়া আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ।

মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এই তিনজনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপ থেকে ৫১ জন রোহিঙ্গা ভোটারের ডাটা উদ্ধার করেছেন ঢাকা থেকে আসা এনআইডি উইংয়ের তদন্ত কর্মকর্তা।

মামলার বাদী ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কর্মকর্তা পল্লবী চাকমা বলেন, ‘জয়নাল আমাদের সন্দেহের তালিকায় ছিল। কিন্তু আমাদের কাছে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। ঢাকা থেকে এনআইডি উইংয়ের তদন্তদল এসে তাঁর মোবাইলে জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কিছু রোহিঙ্গা ভোটারের তথ্য পাওয়া যায়, যা আমাদের কাছে রক্ষিত তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়।’

ঢাকা থেকে আসা এনআইডি উইংয়ের তদন্তদলের প্রধান ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের উপপরিচালক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘জয়নালের কাছে থাকা ল্যাপটপ উদ্ধার করে সেখানে আমরা ৫১ জন ভোটারের তথ্য পেয়েছি। সেসব ভোটারের ডাটা এনআইডি সার্ভারে ইনপুট দেওয়া হয়েছে কি না তা তদন্তে করে দেখা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধনের জন্য যত ধরনের ডিভাইস প্রয়োজন হয় তার পুরো সেট তাদের কাছে আছে। পরে সুযোগমতো তারা নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত ল্যাপটপটিও সরিয়ে ফেলে।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সাগর ও সত্য সুন্দর পাসওয়ার্ড হ্যাক করে চাইলে সব উপজেলা ও জেলা অফিসের কম্পিউটারে ঢুকে সার্ভারে তথ্য আপলোড দিতে পারেন। যে কারণে সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসের তদন্তে ৪৬ জন রোহিঙ্গা ভোটারের তথ্য এনআইডি ডাটা বেইসে আপলোড দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়, যাদের ফরম নম্বর পাশাপাশি হলেও ভোটার এলাকা আলাদা উপজেলা ও জেলা শহরে।

তদন্তদলের অন্য সদস্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আমরা তদন্ত শুরু করেছি—এটা জানার পর থেকে জয়নাল যতটুকু পেরেছে ল্যাপটপ থেকে তথ্য সরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এর পরও ল্যাপটপটি হাতে পাওয়ার পর এক্সপোর্ট ডাটা থেকে আমরা ৫১ জন ভোটারের তথ্য পেয়েছি।’

কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জেনেছি, জয়নাল ২০০৪ সাল থেকে নির্বাচন অফিসে চাকরি করছে। বিভিন্ন অপরাধে এ পর্যন্ত ১০ বার বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে বদলি করা হয়েছে। সে শুরু থেকে অসাধু উপায়ে এনআইডি কার্ড জালিয়াতির কাজ করত। আমরা সোমবার রাতে তার আন্দরকিল্লার বাসায় অভিযান চালাই। কিন্তু তার স্ত্রী আগেই বাসায় তালা লাগিয়ে সরে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘যারা আগে থেকে এনআইডি সার্ভারে ইনপুট দিতে পারত এমন দুজনের সঙ্গে যোগসাজশ গড়ে তোলে চক্রটি। মূলত এনআইডি প্রকল্পে অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করা সাগর ল্যাপটপটি সরিয়ে জয়নালের কাছে রাখতে দেয়। চট্টগ্রাম থেকে ছবিসহ যাবতীয় তথ্য ঢাকায় পাঠানো হতো। সেখানে সাগর নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে অবৈধভাবে ঢুকে তথ্য আপলোডসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রিন্ট কপি এসএ পরিবহনের মাধ্যমে জয়নালের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। প্রতিটি পরিচয়পত্র তৈরির জন্য জয়নাল রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ৫০-৬০ হাজার টাকা করে নিতেন।’ জয়নাল গত দেড় থেকে দুই বছর ধরে রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড করে দেওয়ার কাজটি করে আসছিলেন বলে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা