kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিল আওয়ামী লীগ

► তৃণমূল আওয়ামী লীগে ক্ষোভ-হতাশা
► স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফ কঠোর অবস্থানে
► রিটা রহমানকে নিয়ে বিএনপিতে হতাশা

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিল আওয়ামী লীগ

রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে সমঝোতা হলো আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিতে। সমঝোতার পর গতকাল আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী রেজাউল করিম প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে তাঁর সমর্থকরা সড়কে শুয়ে প্রতিবাদ জানান। ছবি : কালের কণ্ঠ

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রংপুর-৩ আসনটি জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ছেড়ে দিল আওয়ামী লীগ। দলের মনোনীত প্রার্থী রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম গতকাল সোমবার বিকেলে রিটার্নিং অফিসারের কাছে তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। এ অবস্থায় আসনটির উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেন ছয়জন প্রার্থী। তাঁরা হলেন জাতীয় পার্টির রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ, বিএনপির রিটা রহমান, স্বতন্ত্র প্রার্থী এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার, খেলাফত মজলিসের তৌহিদুর রহমান মণ্ডল, গণফ্রন্টের কাজী শহিদুল্লাহ ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির রংপুর জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রায় তিন দশক রংপুর-৩ (সদর) আসনের এমপি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কারণে শূন্য হওয়া আসনটিতে আগামী ৫ অক্টোবর উপনির্বাচন। আসনটির উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বড় দলগুলো প্রার্থী ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থীকে প্রত্যাহার করে নিল। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল জাপাকে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখতে চায়। এ জন্য এরশাদের আসনে তাঁর পুত্রকে যোগ্য প্রার্থী মনে করা হচ্ছে। আবার জাতীয় পার্টি চাচ্ছে তাদের দুর্গ বলে পরিচিত রংপুর-৩ আসনটি ধরে রাখতে; যদিও জাতীয় পার্টির প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে কোন্দলের পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার।

এদিকে নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরে দাঁড়ানোতে দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ প্রকাশ করে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপনির্বাচনে ভোটকেন্দ্র বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে দলের নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়েই সাদ এরশাদের পক্ষে মাঠে থাকবে।

গতকাল বিকেলে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম রাজু। এতে তৃণমূল ভোটারদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, রেজাউল করিম রাজু যোগ্য প্রার্থী হলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ায় তিনি ‘বলির পাঁঠা’ হয়েছেন। 

রংপুর-৩ আসনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামানকে একাধিকবার মনোনয়ন দেওয়া হলেও নির্বাচন থেকে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। রাজুর ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটল। এ নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা গতকাল আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের সামনে মনোনয়ন প্রত্যাহার না করতে অবরোধ করেন।

রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, ‘এরশাদের প্রতি সম্মান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

রংপুর নগরীর মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানগুলোতে উপনির্বাচন ঘিরে চলছে তুমুল বাগিবতণ্ডা। সাদ এরশাদ ও রিটা রহমানকে রংপুরবাসী চায় না। কিন্তু তাদের বেশির ভাগ লাঙল প্রতীকে ভোট দিতে চায়। সাদ এরশাদ নয়, তারা মূলত এরশাদের জন্য লাঙলে ভোট দেবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘জাতীয় পার্টির সাদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ারের মধ্যেই হবে মূল লড়াই। রিটা রহমানের পক্ষে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা না থাকলে তাঁর ভরাডুবি নিশ্চিত।’

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রংপুরে সাদ এরশাদের প্রতি তেমন সমর্থন নেই। কয়েক দিন আগেও সাদ এরশাদকে রংপুরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন স্থানীয় জাপার নেতাকর্মীরা। রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন সাদ এরশাদের বিরুদ্ধে। এবার ওই মনোভাব কতটুকু পাল্টাবে, তা এখন দেখার বিষয়।

জাতীয় পার্টিতে জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের সমঝোতা হলেও রংপুরে দলের একাংশে এখনো ক্ষোভ বিরাজ করছে। তা দূর করতে না পারলে দলের জন্য ক্ষতি হবে বলে মন্তব্য করছেন জাপার অনেকে। তাঁরা বলছেন, সাদের শক্ত প্রতিপক্ষ এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেওয়ায় এখন সাদের শক্ত প্রতিপক্ষ হবেন আসিফ।

এ বিষয়ে রংপুর মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির বলেন, ‘জি এম কাদের যদি নিজের অবস্থান শক্ত করতে না পারেন, তাহলে দলকে শক্তিশালী করা তাঁর পক্ষে কঠিন হবে। মনোনয়ন বোর্ড আমাকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সাদকে। রংপুরের তৃণমূল নেতাকর্মীরা আমাকে সমর্থন করেছেন। মনোনয়ন পরিবর্তন করে শুধু আমাকেই নয়, রংপুরবাসীকেও অপমান করা হয়েছে।’

সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম স্থানীয় প্রার্থীকে লাঙল প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হোক। এ কারণে সাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। পার্টি বৃহত্তর স্বার্থে সাদকে মনোনয়ন দিয়েছে। সময় আছে, দেখা যাক কী হয়।’

অন্যদিকে ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান রিটা রহমানকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এ আসন থেকে বিএনপির চারজনসহ মোট পাঁচজন মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও রিটা রহমানকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। একাদশ নির্বাচনে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা রিটা রহমানের পক্ষে মাঠে নামেননি। অংশ নেননি প্রচার-প্রচারণায়। এবারও তা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

রংপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিজু বলেন, প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে স্থানীয় বিএনপিতে দ্বন্দ্ব আছে। সে কারণে তাঁরা নির্বাচন থেকে পিছিয়ে আছেন। তবে এ নিয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা