kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১            

উত্তরা-তুরাগে অসহায় পাউবো

৩২৫ একর জমিতে দখলবাজ ৭৩১

লায়েকুজ্জামান   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৩২৫ একর জমিতে দখলবাজ ৭৩১

উত্তরার আব্দুল্লাহপুর মৌজা থেকে তুরাগ থানার আশুলিয়া মৌজা পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৩২৫ একর জায়গা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন ৭৩১ জন প্রভাবশালী। এসব জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে কাঁচাবাজার, বহুতল ভবন ও ফলের আড়তসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

উত্তরার আব্দুল্লাহপুর মৌজা থেকে তুরাগ থানার আশুলিয়া মৌজা পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রায় ৩২৫ একর জায়গা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন ৭৩১ প্রভাবশালী দখলবাজ। গত ২৪ জুলাই দখলবাজদের এই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে পাউবো। এ ছাড়া তুরাগ নদের পারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) কয়েক একর জায়গাও দখলদারদের কবজায় চলে গেছে।

পাউবোর তালিকাসংবলিত প্রতিবেদন ও সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবৈধভাবে দখল করা জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন, ফিলিং স্টেশন, বিপণিবিতান, বিশাল আকৃতির কাঁচাবাজার, ফলের আড়ত, মাছের পাইকারি বাজার, শিল্প-কারখানা, বালু বিক্রির চাতাল ইত্যাদি। দখলবাজদের তালিকায় আছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। দখল করা জায়গা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে ওই প্রভাবশালীরা প্রতিবছর হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অর্থ।

অভিযোগ আছে, ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে অবৈধ দখলে থাকা এসব জায়গা দখলমুক্ত করার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি পাউবো। উল্টো ওই সব জায়গা দখলের ক্ষেত্রে নেপথ্যে সহায়তা করেছেন পাউবোর এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা। দখলবাজদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে দখল টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করছেন তাঁরা।

১৯৮৯ সালে ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ঢাকার চারপাশে নদীবেষ্টিত এলাকায় জায়গা অধিগ্রহণ শুরু করেছিল পাউবো। শেষ হয় ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি। ভূমি অধিগ্রহণ শেষে নির্মাণ করা হয় শহর রক্ষা বাঁধ। ওই বাঁধ নির্মাণ করার পর যে জায়গা অবশিষ্ট থাকে তা অবৈধভাবে দখল করেন প্রভাবশালীরা। শহর রক্ষা বাঁধটি শুরুতে শহরে পানি প্রবেশ রোধ করার কাজে লাগলেও বর্তমানে যান চলাচলের সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর অবৈধ দখলবাজদের দখলের কারণে বাঁধটি সরু সড়কে পরিণত হয়েছে।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করেছি। এবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সব দখলদারকে উচ্ছেদ করা হবে।’

দখলবাজদের চূড়ান্ত তালিকার ৩০ নম্বর ক্রমিকে আছে জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতা মোহাম্মাদ আলী বাবুর নাম। পাউবোর জায়গা দখল করে তিনি গাড়ির গ্যারেজ, গরুর খামার গড়ে তুলেছেন। মোহাম্মদ আলী বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকদের ১৭ লাখ টাকা দিয়ে জায়গাটা ভাড়া নিয়েছি। আমি টাকা দিয়ে ভাড়া নিলেও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা জোর করে বেশ কিছু দোকান বসিয়েছেন।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জোর করে দোকান বসিয়েছেন উত্তরা পূর্ব থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এস আই টুটুল। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন বাবুলের ছেলে।

পাউবোর জায়গার আরেক অবৈধ দখলবাজ হলেন ঢাকা মহানগর উত্তর জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কার্যকরী কমিটির সদস্য সৈয়দ হীরামন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিবিএ নেতাদের টাকা দিয়ে জমি দখলে নিলেও ক্ষমতাসীন দলের এক প্রভাবশালী নেতা বেশ কটি দোকান ছিনিয়ে নিয়ে ভাড়া দিয়ে টাকা তোলেন।’

দখলবাজদের তালিকায় ২৮ ও ১৭৪ নম্বরে নাম রয়েছে উত্তরা পূর্ব থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কুতুব উদ্দিনের। দখল করা পাউবোর জায়গায় তিনি একটি চালের গুদাম এবং ‘উত্তরা সুইটস’ নামে একটি মিষ্টির দোকান দিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুতুব উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকা সঠিক নয়। আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করিনি। মিষ্টির দোকানটি আমার নিজস্ব জায়গায়। গোডাউন কার তা জানি না। বরং পানি উন্নয়ন বোর্ড আমার ৪ শতাংশ এবং আমার ভাই জাপা নেতা বাহাউদ্দিন বাবুলের ৪ শতাংশ জায়গা দখল করেছে।’

পাউবোর জায়গার অবৈধ দখলবাজদের তালিকা প্রস্তুত করেছেন সংস্থাটির উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এ জেড এম রিদওয়ান এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী খন্দকার মিজানুর রহমান শেলী। তাঁরা কালের কণ্ঠকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে সরেজমিনে পরিদর্শন করে দখলবাজদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকা সঠিক।

তালিকার ১১৪ নম্বর ক্রমিকের সাইফুল ইসলাম গং ‘আব্দুল্লাহপুর মার্কেট’ নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। ওই মার্কেটে ২৮টি দোকান আছে। সাইফুল ইসলামের মোবাইল ফোন নম্বরে বারবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। এসএমএস পাঠানো হলেও তার জবাব দেননি তিনি। স্থানীয় লোকজন জানায়, ওই মার্কেটের সঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা জড়িত।

তালিকার ১৭০ ও ১৭১ নম্বর ক্রমিকে নাম রয়েছে অরুণ শাহ ও তরুণ শাহর। তাঁরা দুই ভাই। দখল করা জায়গায় একটি মাছের আড়তসহ একাধিক স্থাপনা তৈরি করেছেন তাঁরা। তবে তাঁদের দাবি, ওই জায়গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নয়। তাঁরা কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তিতে তাঁরা ব্যবসা করছেন।

১৭৭ নম্বর ক্রমিকে আছে মহিউদ্দিন মঈনের নাম। তিনি পাউবোর জায়গা দখল করে ‘উত্তরা ফিলিং স্টেশন’ নির্মাণ করেছেন। ১৭৮ নম্বর ক্রমিকে আছে কাজল আহমেদের নাম। তিনি একটি দোতলা অভিজাত রেস্টুরেন্ট এবং একটি ফিলিং স্টেশন নির্মাণ করেছেন। রেস্টুরেন্টটির নাম ‘ফাল্গুনী’। সপ্তাহখানেক আগেও ফিলিং স্টেশনটির নাম ছিল ‘আরএসআর সিএনজি ফিলিং স্টেশন’। গতকাল রবিবার সেখানে গিয়ে দেখা যায় নাম বদল করে লেখা হয়েছে ‘তাসিন সিএনজি ফিলিং স্টেশন’।

তালিকার ১৮২ নম্বরে আছে মোতালেব মিয়ার নাম। তিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলর। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে তিনি বড় আকারের একটি মাছের আড়ত নির্মাণ করেছেন। মোতালেব মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাছের আড়তের জায়গা আমাদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো জায়গা আমি দখল করিনি।’

২১০ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে খাদেম আলীর নাম। তিনি জায়গা দখল করে দোতলা ভবন নির্মাণ করেছেন। ২৫৫ ক্রমিকের হাজি রোকন একটি তিনতলা ভবন, ৫৭৮ ক্রমিকের হাজি আনসার আলী পাউবোর জায়গা দখল করে নির্মাণ করেছেন ছয়তলা ভবন। এই তিনজন কালের কণ্ঠকে জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা তাঁরা দখল করেননি।

৫০২ নম্বর ক্রমিকের আলম চান তুরাগের মাছিমপুর মৌজায় পাউবোর প্রায় এক একর জায়গা দখল করে ট্রাকস্ট্যান্ড নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘জায়গা আমাদের নিজস্ব। আমরা কারো জায়গা দখল করিনি।’

আব্দুল্লাহপুরে পাউবোর জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা সৈয়দ হীরামন, মোহাম্মদ আলী বাবুসহ একাধিক দখলবাজ বলেছেন, জায়গা দখলের ক্ষেত্রে পাউবো সিবিএর সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সুলতান আহমেদ তাঁদের সহযোগিতা করেছেন। তবে পাউবোর এই দুই সিবিএ নেতা অভিযোগ অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, দখলবাজরা নিজেদের বাঁচাতে এসব মিথ্যা অভিযোগ তুলেছেন।

পাউবোর জায়গা দখলের বিষয়ে জানতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মাহফুজুর রহমানকে বারবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। বার্তা পাঠিয়েও তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা