kalerkantho

জাতিসংঘে মিয়ানমারের মিথ্যাচার

রাখাইনে ফিরতে আগ্রহ দেখাচ্ছে রোহিঙ্গারা!

মেহেদী হাসান   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



রাখাইনে ফিরতে আগ্রহ দেখাচ্ছে রোহিঙ্গারা!

মিয়ানমারের প্রতি তীব্র অনাস্থা ও অবিশ্বাসের কারণে গত ২২ আগস্ট একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হননি। কক্সবাজারে উপস্থিত থেকে এ পরিস্থিতি দেখেছেন বাংলাদেশে চীন ও মিয়ানমারের কূটনীতিকরা। অথচ মিয়ানমার গত মঙ্গলবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে দাবি করেছে, কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরার জন্য অব্যাহতভাবে আগ্রহ জানিয়ে আসছে।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী না হওয়ার কারণ হিসেবে ওই দেশটির প্রতি আস্থার ঘাটতি ও অনুকূল পরিবেশ না থাকার কথা বললেও জাতিসংঘে তা পুরোপুরি চেপে গেছেন মানবাধিকার পরিষদে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত কিয়াও মোয়ে তুন। তিনি বলেন, মানবিক পরিস্থিতি সমাধানে দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরু করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় যাচাইকৃত ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে গ্রহণ করতে মিয়ানমার প্রস্তুত থাকার কথা আবারও জানিয়েছে।

দৃশ্যত মিয়ানমারের ক্ষোভ ছিল রোহিঙ্গা সংকট ও রাখাইন পরিস্থিতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরা মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টার ইয়াংহি লির ওপর। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সামরিক অভিযানের পূর্ব প্রস্তুতির তথ্য আড়াল করে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বলেন, যে ভয়ের কারণে গণবাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে তার বীজ বুনেছিল জঙ্গিগোষ্ঠী আরসা। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের দাবি, মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টার তাঁর দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে পালন করতে ব্যর্থ ও তাঁর বক্তব্য উসকানিমূলক হওয়ায় মিয়ানমারের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে ওই দেশে নিষিদ্ধ করেছে।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘গত মাসে ৪৪৪ জন হিন্দুসহ যাচাইকৃত বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে মিয়ানমার বাংলাদেশকে বলেছিল। কক্সবাজারে আশ্রয়শিবিরে অবস্থানরত বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে অব্যাহতভাবে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তিনি জানতে চান, জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টার কি এ বিষয়টি জানেন?’

এদিকে আন্তর্জাতিক তদন্ত কাঠামো গুরুতর অপরাধে জড়ানো মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিচারের অঙ্গীকার করলেও মিয়ানমার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত কিয়াও মোয়ে তুন এক বিবৃতিতে বলেন, তাঁর দেশ মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী মিশন, আন্তর্জাতিক স্বাধীন তদন্ত কাঠামো প্রত্যাখ্যান করেছে। মিয়ানমার সরকার নিজেই তার দেশে জবাবদিহির বিষয়টি নিশ্চিত করতে আগ্রহী। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) বা বাইরের কারো তদন্ত ও বিচারের উদ্যোগ মিয়ানমার মেনে নেবে না। এর আগে গত সোমবার মিয়ানমারবিষয়ক আন্তর্জাতিক তদন্ত কাঠামোর প্রধান নিকোলাস কোমজিয়ান তাঁদের কর্মকাণ্ড নিয়ে মানবাধিকার পরিষদে প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে বলেছিলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর উদ্দেশ্যে বলতে চাই—আমরা সব দেখছি। আমরা অপরাধের বিচার নিশ্চিত করব।’

এর পরদিনই মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মানবাধিকার পরিষদকে জানান, স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী মিশন, আন্তর্জাতিক স্বাধীন তদন্ত কাঠামো সৃষ্টি করা—এগুলো জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের এখতিয়ারের বাইরে। মিয়ানমারের গণতন্ত্র, শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এগুলো কোনো কাজে আসবে না। এসব কাঠামো ও মিশন সৃষ্টি করে বিপুল অর্থ অপচয় করা হচ্ছে।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের কিছু সময় পর কথিত সমমনা দেশগুলোর গ্রুপের পক্ষে চীনের প্রতিনিধি মানবাধিকার পরিষদে বলেছেন, মানবাধিকার নিয়ে রাজনীতি করা যাবে না।

উল্লেখ্য, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তারা কবে ফিরবে তা নিশ্চিত নয়। এ মাসের শেষ সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

 

মন্তব্য