kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

দেশজুড়েই কিশোর গ্যাংয়ের জাল

‘অ্যাডভেঞ্চারের’ নামে দলে ভিড়িয়ে সন্ত্রাস

এস এম আজাদ   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘অ্যাডভেঞ্চারের’ নামে দলে ভিড়িয়ে সন্ত্রাস

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলীয় যোগাযোগে (গ্রুপ চ্যাটিং) গ্যাং গ্রুপে জড়িয়ে পড়ছে স্কুলপড়ুয়া কিশোররা। অপরাধে জড়িয়ে পড়া এক শ্রেণির বখাটে ফেসবুক পেজ খুলে অ্যাডভেঞ্চারের (সাহসী কর্মকাণ্ড) কথা বলে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে। এভাবে পেজে বাড়ে বন্ধু-অনুসারী (ফলোয়ার)। এদের মধ্যে দলীয় যোগাযোগে ঘনিষ্ঠরাই গ্যাং গ্রুপের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এলাকা ও ফেসবুকের পেজের নামে আলাদা হচ্ছে গ্রুপ। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে নিয়মিত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। দিচ্ছে হুমকিও। শনাক্ত হওয়া গ্রুপগুলোর ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এসব তথ্য পেয়েছেন র‌্যাব ও পুলিশের তদন্তকারীরা। এরই মধ্যে র‌্যাব ও পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট প্যাট্রলিংসহ অনলাইনে নজরদারি কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জঙ্গি ও রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারের মতোই গুরুত্ব দিয়ে গ্যাং গ্রুপের ওপর নিয়মিত নজরদারি রাখতে হবে।

এদিকে ধারাবাহিক অভিযানে উঠতি বয়সী বখাটেরা ধরা পড়লেও অপরাধীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে না। গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর হাতিরঝিলে অভিযান চালিয়ে ১১২ কিশোরকে আটক করে পুলিশ। যাচাই করে অপরাধ না পাওয়ায় ১০৫ জনকেই ছেড়ে দিতে হয়। এমন অভিজ্ঞতার কারণে নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারা।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী রবিবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘গ্যাং কালচারের নামে শিশু-কিশোররা সমাজে নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। দেশের কোথাও যেন কিশোর গ্যাং কালচার গড়ে উঠতে না পারে সে ক্ষেত্রে সব পুলিশ সদস্যকে তত্পর থাকতে হবে।’

র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লে.  কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্যাং গ্রুপগুলোর বিশেষত্ব হলো, তারা সদস্যদের নিয়ে ফেসবুক পেজ করে থাকে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য এলাকা নির্ধারণ করে নেয়। এরা নিজেদের মধ্যে মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সোস্যাল অ্যাপসে যোগাযোগ রক্ষা করে। টার্গেট কিশোরদের বন্ধু হতে অনুরোধ পাঠায়। এরা সরাসরি মিটিং করার পাশাপাশি গ্রুপ চ্যাট করে। এরা অনলাইন ও অফলাইনে অন্য গ্রুপের সদস্যদের হুমকি দেয়। ছুরি-কাঁচি প্রদর্শন এবং কথিত অ্যাডভেঞ্চারের ছবি আপলোড করে। এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘ফেসবুকে অপতত্পরতার ওপর আমাদের নজর আছে। অভিযানের কারণেও এরা সরাসরি যোগাযোগ কমিয়েছে। জঙ্গি ও অপপ্রচারের মতোই কিশোর গ্যাং গ্রুপকে শনাক্ত করা হবে। চলতি বছরই ১৪টি বড় অভিযান চালিয়ে ২০৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।’

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা কালের কণ্ঠকে বলেন, “কিশোর গ্যাং গ্রুপের দুটি রূপ আছে, একটি হলো নিজস্ব সার্কেলে গোপন যোগাযোগ। এটিকে প্রযুক্তির ভাষায় ‘এটিএল’ (অ্যাবাভ দ্য লাইন) বলা হয়। ভারতের নাটক-সিনেমায় গ্যাং গ্রুপের এমন যোগাযোগ দেখা যায়। অন্যটি হলো প্রদর্শন করা বা বিটিএল (বিলো দ্য লাইন)। ধানমণ্ডি, কলাবাগানসহ অনেক এলাকায় দেয়ালে গ্রুপের নাম ও কর্মকাণ্ড প্রচার করতে দেখা যায়। জোহা আরো বলেন, বিটিআিরসির কমিটি জঙ্গি ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড শনাক্তে যেভাবে কাজ করছে, সেভাবে গ্যাং গ্রুপের বিষয়টি আমলে নেয়নি। তবে এটাকে এখন গুরুত্ব দেওয়া দরকার। ফেসবুকে আইডির কর্মকাণ্ড শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে।”

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধ করতে ডিএমপি ৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কোনো কিশোর যেন বখাটে অপরাধী গ্রুপে যুক্ত হতে না পারে। এ জন্য ডিএমপি ও র‌্যাবের সাইবার ক্রাইম শাখা কাজ করছে। তারা গ্রুপ ও পেজগুলো শনাক্ত করে সদস্যদের ওপর নজর রাখছে। এরই মধ্যে ঢাকায় ৩২টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ শনাক্ত করা গেছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, গ্যাং গ্রুপে জড়িয়ে অপরাধী হওয়ার আগেই বিপথগামীদের শনাক্ত করার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিএমপির প্রতিটি থানা এলাকায়ই নজরদারি আছে। অভিভাবকদের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি অনলাইনের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে।

গত ২৬ জুন বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ খুনের আগে ‘০০৭ বন্ড’ নামে ফেসবুক গ্রুপে পরিকল্পনা হয় হত্যার। এ ঘটনার পর জানা যায়, নয়ন নামের এক তরুণ নয়ন বন্ড নাম নিয়ে গ্যাং গ্রুপে নেয় অনেক স্কুলে-কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের।

এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরার কিশোরদের দুটি ‘নাইন স্টার’ গ্রুপের প্রধান রাজুর ফেসবুকে নাম ‘তালাচাবি রাজু’। ‘ডিসকো বয়েজের’ প্রধান ছোটন খান এলাকায় ছিনতাইকারী। তবে তাদের গ্রুপে বন্ধু উত্তরার বেশ কিছু নামিদামি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে সংঘাতের জেরে ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি ট্রাস্ট কলেজের ছাত্র আদনান কবিরকে হত্যা করে নাইন স্টার গ্রুপ। পরে ডিসকো বয়েজ গ্রুপের সদস্যরা ফেসবুকে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণাও দেয়। পুলিশের অভিযানে কয়েকজন ধরা পড়লে এরা ‘নিউ নাইন স্টার’ নামে সক্রিয় হয়। গ্রুপের প্রধান হাবিবুর রহমান দাড়িয়া ছদ্মনামে অনলাইনে সদস্য সংগ্রহ করছে। এখন শাহরিয়ার বিন সাত্তার সেতু চালায় ‘ডিসকো বয়েজ গ্রুপ’। উত্তরায় এখন ফার্স্ট হিটার বস (এফএইচবি) নামে একটি গ্রুপও সক্রিয়। এটি তুফান গ্রুপ নামেও এলাকায় পরিচিত। ‘বিগ বস’ গ্রুপ তৈরি করেছে আক্তারুজ্জামান ছোটন।

মোহাম্মদপুরের স্থানীয় সূত্র জানায়, রায়েরবাজারে ‘স্টার বন্ড’ ও ‘মোল্লা রাব্বী’ দলের বিরোধ এলাকায় অধিপত্য নিয়ে। গত বছর স্টার বন্ড গ্রুপের সদস্য আমিনুলকে হত্যা করে মোল্লা রাব্বী গ্রুপ। আমিনুলের জন্য দোয়া মাহফিলের ছবি তাদের ফেসবুক পেজে শেয়ার করলে মোল্লা রাব্বী গ্রুপের একজন ‘হা হা রিয়েক্ট’ (হাসির চিহ্ন) দেয়। সম্প্রতি এ নিয়ে আবার উত্তেজনা দেখা দেয়। র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ১৭ জনকে ধরলেও স্টার বন্ড গ্রুপের প্রধান মুন্না এবং মোল্লা রাব্বী গ্রুপের প্রধান রাব্বী এখনো অধরা।

গত বছরের ১ মার্চ পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের শনিমন্দিরের সামনে হলি উত্সবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় রওনক নামের এক কিশোরকে। এ ঘটনায় রিয়াজ আলম ফারহানসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, এক কিশোরের সঙ্গে প্রেমের ঘটনার জেরে ফেসবুকে বিরোধ হয় দুই গ্রুপের। এরপর পরিকল্পনা করেই ঘটায় ওই হত্যাকাণ্ড।

গত বুধবার মোহাম্মদপুরে চাইল্ড হ্যাভেন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র মহসিনকে হত্যা করে ‘আতঙ্ক গ্রুপ গ্যাং স্টার’ গ্রুপের সদস্যরা। গ্রুপ থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে এবং এক তরুণীকে নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, এই গ্রুপের সদস্যরাও ফেসবুক যোগাযোগে রক্ষা করে।

গত ২৮ জুলাই মোহাম্মদপুর থেকে ‘লাড়া দে’ গ্রুপের প্রধান তামিমুর রহমান মীম, ‘লেভেল হাই’ গ্রুপের প্রধান মানিকসহ ২২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার আনিসুর রহমান জানান, মীম ও মানিক স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না পারলেও ফেসবুকের মাধ্যমে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাও তাদের বন্ধু হয়ে গ্রুপে ঢুকে পড়েছে।

এদিকে সম্প্রতি হাজারীবাগে ‘লাভলেট’ নামের গ্রুপের নেতা ইয়াসিন আরাফাতকে হত্যা করে প্রতিপক্ষ ‘বাংলা গ্রুপ’। ফেসবুকে হুমকি দেওয়ার জেরে ‘বাংলা’ প্রধান সাখাওয়াত হোসেন সৈকত ওরফে বাংলার নেতৃত্বে হামলার ঘটনা ঘটে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা