kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থে অনেক কিছুই হজম করে যাচ্ছি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থে অনেক কিছুই হজম করে যাচ্ছি

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দোষে-গুণে মানুষ। আমাদেরও অনেক কিছুই বলার আছে। কারণ আমরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। তার পরও দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, জনগণের উন্নয়নের স্বার্থে অনেক কিছু হজম করে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, দেশের উচ্চ আদালত সাবেক সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখলকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এই রায়ের পর এ দুজনকে আর রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা যায় না।

বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদের মৃত্যুতে গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এরশাদের মৃত্যুতে গতকাল সংসদে সর্বসম্মতভাবে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। শোক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে দেশ একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সফল রাষ্ট্রনায়ক এবং নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবককে হারাল।’

আলোচনার পর এক মিনিট নীরবতা পালন ও মোনাজাত করা হয়। পরে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী রেওয়াজ অনুযায়ী আজ সোমবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৮২ সালে এরশাদকে ক্ষমতা দখলের সুযোগ করে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এ কারণেই তিনি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়াকে শুধু দুটি বাড়িই নয়, নগদ ১০ লাখ টাকাসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন। যে কারণে জিয়া হত্যার ব্যাপারে চট্টগ্রামে যে মামলা হয়েছিল সেই মামলা বিএনপি কখনো চালায়নি। বহু বছর পরে ১৯৯৪ সালের দিকে এরশাদকে তাঁর স্বামী হত্যার জন্য দায়ী করেন খালেদা জিয়া। এর আগে কখনো দায়ী করেননি।

সংসদ নেতা বলেন, ‘অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আমাকে চলতে হয়েছে। আমি দেশে ফিরে আসার পরে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের আমাদের বাড়িতে জেনারেল জিয়া আমাকে ঢুকতেই দেননি।’ তিনি বলেন, প্রথমে সামরিক আইন জারি করে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। এরপর তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। প্রথম ক্ষমতা দখল করেছিলেন জিয়াউর রহমান। জাতির পিতাকে হত্যার পর ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন তিনি। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন এরশাদ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন বিচারপতি সাত্তার। তাঁকে কিন্তু সেনাপ্রধান হিসেবে প্রার্থী করেছিলেন জেনারেল এরশাদ। একটি বিদেশি পত্রিকায় তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন বিচারপতি সাত্তার সাহেব তাঁর প্রার্থী।’

এরশাদের শাসনামলে দমন-পীড়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সব সময় গণতন্ত্র চেয়েছি, যেন গণতন্ত্র অব্যাহত থাকে। যে কারণে অনেক প্রতিকূল অবস্থায়ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম ১৯৮৬ সালে। যদি সেই নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে হতো, তাহলে হয়তো তাঁকে (এরশাদ) এই ধরনের বিতর্কিত হতে হতো না।’

সমালোচনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী এরশাদের প্রশংসাও করেন। তিনি বলেন, প্রয়াত বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদ অমায়িক ছিলেন এবং মানুষের প্রতি তাঁর দরদ ছিল। সংসদ নেতা বলেন, জিয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিলেও কখনো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেননি। যেটা করেছেন জেনারেল এরশাদ। তিনি আসার পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অসমাপ্ত কাজ বা সাভার স্মৃতিসৌধের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেছেন। সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি।

অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার এরশাদ, সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম, মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য ন্যাপ সভাপতি মোজাফফর আহমদ, সাবেক সংসদ সদস্য খালেদা হাবিব ও আনোয়ারা বেগমের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এ ছাড়া ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আ ন ম শফিকুল হক, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হানিফ, কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর নুরুল ইসলাম, সমাজসেবী ঝর্ণা ধারা চৌধুরী, ভাষাসংগ্রামী খালেকুল আল আজাদ, জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম অধিনায়ক আনোয়ারুল কবির শামীমের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ও টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে বন্দুকধারীদের হামলায়, সুদানে বন্যায় এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রকাশ করা হয়।

এরশাদের মৃত্যুতে সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত

স্বৈরশাসক হিসেবে পরিচিত সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ গত ১৪ জুলাই মারা যান। গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ তাঁর স্বামী ব্যক্তিজীবনে কোনো ভুলত্রুটি করে থাকলে তাঁর জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, ‘অসম্ভব জনপ্রিয়, বিনয়ী ও জনদরদি নেতা ছিলেন এরশাদ।’

এরশাদকে ‘অসম্ভব জনপ্রিয় নেতা’ উল্লেখ করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘গণতন্ত্র রক্ষা ও বিকাশে এরশাদ কাজ করেছেন। তিনি সকল রাজনীতির সমীকরণে প্রধান নিয়ামকও ছিলেন।’ তিনি আরো বলেন, এরশাদের শাসনামলকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগকে উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় ভাগের বিষয়ে উচ্চ আদালত নেতিবাচক কোনো মন্তব্য করেননি।

সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, ‘দোষে-গুণে মানুষ। এ মুহূর্তে এরশাদকে নিয়ে কোনো আলোচনা করতে চাই না। আমরা তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।’

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের সময় আমাদের মধ্যে মত-পথের পার্থক্য ছিল। আমরা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, তবে ব্যক্তিগতভাবে এরশাদ অত্যন্ত বিনয়ী ও নরম হূদয়ের সজ্জন মানুষ ছিলেন।’

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘এরশাদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্ষমতায় থাকতে খুনি জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এরশাদও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করেছেন, ঘৃণিত খুনি কর্নেল ফারুককে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করেছিলেন।’

শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় আরো অংশ নেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য শাজাহান খান, জাতীয় পার্টির মসিউর রহমান রাঙ্গা, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফকরুল ইমাম, কাজী ফিরোজ রশীদ, বিএনপির হারুনুর রশীদ ও তরিকত ফেডারেশনের মুজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী প্রমুখ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা