kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রংপুর-৩ উপনির্বাচন

তিন দলের প্রার্থী ঠিক হলেও নেতাকর্মীদের দোনামোনা

নওশাদ জামিল ও স্বপন চৌধুরী, রংপুর থেকে   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিন দলের প্রার্থী ঠিক হলেও নেতাকর্মীদের দোনামোনা

রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে তিন বড় দলই। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শূন্য এ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে জাতীয় পার্টিতে নানা কোন্দল ও দ্বন্দ্ব থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলটির মনোনয়ন পেয়েছেন এরশাদপুত্র রাহগীর আল মাহী সাদ এরশাদ। বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন রিটা রহমান। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশের (পিপিবি) সভাপতি ছিলেন তিনি। গতকাল দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছে পিপিবির নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন দলের রংপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, তিন দলের প্রার্থী ঠিক হলেও রংপুরের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দোনামোনা করছে। জাতীয় পার্টি ও বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর গতকাল রবিবার রংপুরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সাদ এরশাদ ও রিটা রহমানের বিষয়ে রংপুরের জাতীয় পার্টি ও বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছে, তাঁরা দুজনই এখানকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। দুজনই উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। তৃণমূলে তাঁদের কোনো জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতাও নেই। ফলে উপনির্বাচন নিয়ে দুই দলের নেতাকর্মীদের উৎসাহে এখন যেন ভাটার টান লেগেছে। অন্যদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেও দোনামোনা দেখা গেছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছে, রেজাউল করিম রাজু যোগ্য প্রার্থী হলেও মহাজোটের স্বার্থে তিনি ‘বলির পাঠা’ হতে পারেন। এর আগে রংপুর-৩ আসনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামানকে একাধিকবার মনোনয়ন দিলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। এ ছাড়া মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগের অনেক প্রার্থীর মধ্যে দেখা গেছে ক্ষোভ ও হতাশা।

রংপুরের শাপলা চত্বর মোড়ে চায়ের স্টলে উপনির্বাচন ঘিরে দেখা গেল লোকজনের তুমুল তর্ক-বিতর্ক। শুনে বোঝা গেল, সাদ এরশাদ ও রিটা রহমানকে রংপুরবাসী চায় না। কিন্তু বেশির ভাগই লাঙল প্রতীকে ভোট দিতে চায়। সাদ এরশাদ নয়, তারা মূলত এরশাদের জন্য লাঙলে ভোট দেবে।

স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষকরা জানান, সাদের বিজয় সুনিশ্চিত করতে জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগকে প্রার্থী প্রত্যাহারের অনুরোধ করতে পারে। মহাজোটের স্বার্থে যদি আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রত্যাহার করে, তাহলেই সাদের বিজয়ের পথ খুলবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রাজু যদি মনোনয়নবঞ্চিতদের নিয়ে একযোগে কাজ করতে পারেন তাহলে পাশার দান ঘুরে যেতে পারে। মূলত এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে লাঙল ও নৌকার মধ্যে।

স্থানীয় সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক ডা. শাহিন হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টির সাদ ও আওয়ামী লীগের রাজুর মধ্যেই লড়াই হবে। রিটা রহমানের পক্ষে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা না থাকলে তাঁর ভরাডুবি নিশ্চিত। এরশাদের সেই আবেগ এখন ভাটার দিকে। এরশাদের জনপ্রিয়তা যেহেতু কমেছে, ফলে লাঙল প্রার্থী যে জিতবেই, তা বলা যাবে না। মানুষ এখন অনেক সচেতন।’

রংপুরে পারিবারিক বলয় থেকে মুক্ত হয়ে স্থানীয় পর্যায় থেকেই প্রার্থী চূড়ান্ত করার দাবি ছিল জাতীয় পার্টির তৃণমূল নেতাকর্মীদের। সাদকে প্রার্থী করায় নাখোশ তারা। এ ছাড়া তৃণমূলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই এমন বহিরাগত কাউকে নির্বাচনে প্রার্থী করলে বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে মনে করছে রংপুরের এরশাদভক্তরা।

সূত্র বলছে, দুই দিন আগে জাতীয় পার্টি নানা হিসাব-নিকাশ করে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছিল দলের মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক এম এম ইয়াসিরকে। পরে গতকাল রওশনপন্থীদের চাপে মনোনয়ন দেওয়া হয় সাদ এরশাদকে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সাদ এরশাদের পক্ষে রংপুরে তেমন সমর্থন নেই। বরং দুই দিন আগেও সাদ এরশাদকে রংপুরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা সরাসরি অবস্থান নেন এরশাদপুত্রের বিরুদ্ধে। এবার তাঁদের মনোভাব কতটুকু পাল্টাবে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকছেই।

মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম স্থানীয় প্রার্থীকে লাঙল বরাদ্দ দেওয়া হোক। এ কারণেই আমরা সাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলাম। পার্টি বৃহত্তর স্বার্থে সাদকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমরাও পার্টির স্বার্থেই সাদকে সমর্থন দেব।’

বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন রিটা রহমান। এর আগেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে দলীয় প্রার্থীকে সরিয়ে তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছিল দলটি। তখন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা রিটা রহমানের পক্ষে মাঠে নামেনি। এবারও সে রকম ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে দলের স্থানীয় নেতা ও কর্মীরা। বিএনপির মনোনয়ন প্রার্থী হিসেবে রংপুরে আলোচনায় ছিলেন অন্তত পাঁচজন।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে, শেষ মুহূর্তে উপনির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন নৌকার প্রার্থী। মহাজোটের স্বার্থে আগেও প্রার্থী প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছে। এবার প্রার্থী প্রত্যাহার করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠে না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

রংপুর জেলা কৃষক লীগের সহসভাপতি সামছুল ইসলাম লিচু কালের কণ্ঠকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনে কয়েকবার দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল চৌধুরী খালেকুজ্জামানকে। শেষ পর্যন্ত মহাজোটের কারণে জাতীয় পার্টির এরশাদকেই সমর্থন দেওয়া হয়েছিল। আসন্ন উপনির্বাচনেও তেমনটি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে নৌকার প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন আর উপনির্বাচন এক নয়। জাতীয় নির্বাচনে বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এবার সেই আশঙ্কা নেই। আমরা রংপুরের কেন্দ্রভূমিতে নৌকার পাল ওড়াতেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা