kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অনড় রওশন, সাদই প্রার্থী হতাশ কাদের সমর্থকরা

লায়েকুজ্জামান   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনড় রওশন, সাদই প্রার্থী হতাশ কাদের সমর্থকরা

রংপুর-৩ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে পারিবারিক বলয় থেকে বের হতে পারেনি জাতীয় পার্টি। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া এ আসনে শেষ পর্যন্ত এরশাদ-রওশনের ছেলে রাহগীর আল মাহী সাদকেই দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল রবিবার সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের জানান জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা।

রাঙ্গা সাংবাদিকদের বলেন, ‘রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে আমরা মেনে নিয়েছি। স্পিকারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে সাদ এরশাদকে রংপুর উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনীত করায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের সমর্থক নেতারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। রংপুরের নেতাকর্মীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

এরশাদ পরিবারের এক সদস্য বলেছেন, পারিবারিক সিদ্ধান্তেই জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান, রওশনকে বিরোধীদলীয় নেতা ও সাদকে রংপুরে প্রার্থী করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এ সিদ্ধান্ত আরো আগেই নেওয়া। আগেই সমঝোতা হয়েছে। গত কয়েক দিনের ঘটনাকে নাটক বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ মারা যান গত ১৪ জুলাই। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী এরশাদের মৃতুতে শূন্য এ আসনে ভোট হবে আগামী ৫ অক্টোবর।

জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে দলটিতে গৃহদাহ শুরু হয়। এরশাদপুত্র সাদসহ এ আসনে অন্তত ছয়জন দলীয় মনোনয়ন চান। বাকি মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ছিলেন এরশাদের ভাগ্নি (মেরিনা রহমানের মেয়ে) মেহেজেবুন নেছা টুম্পা, ভাতিজা সাবেক সংসদ সদস্য হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ, রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ফখর-উজ-জামান, রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির ও জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক। এরশাদের ছোট ভাই হুসেইন মুহম্মদ মোর্শেদ আপেলের নামও আলোচনায় এসেছিল। মনোনয়ন নিয়ে এরশাদের পরিবার বিভক্ত হয়ে পড়ে।

উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে এমন পরিস্থিতির মধ্যে দলের চেয়ারম্যান পদ ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার পদ নিয়ে এরশাদের ছোট ভাই ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের সঙ্গে সাদের মা রওশন এরশাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

গত ৪ সেপ্টেম্বর গুলশানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। গত সপ্তাহজুড়ে দলে পাল্টাপাল্টি নানা কর্মসূচি চলে। ভাঙনের মুখে পড়ে দলটি। শেষ পর্যন্ত পার্টির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও এরশাদ পরিবারের কয়েকজন সদস্য সুরাহার উদ্যোগ নেন। তাঁদের উদ্যোগে শনিবার রাতে রাজধানীর বারিধারার কসমোপলিটন ক্লাবে একটি সমঝোতা বৈঠক হয়। জি এম কাদেরের পক্ষের চারজন ও রওশন এরশাদের পক্ষের চারজন বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সমঝোতা হয় জি এম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও রওশন এরশাদ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন। গতকাল দলের মহাসচিব রাঙ্গা এ ঘোষণা দেন।

কিন্তু রংপুর উপনির্বাচনে সাদকে প্রার্থী করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়েছিল। শনিবার রাতের বৈঠক শেষে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা কালের কণ্ঠকে বলেন, সাদের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করা হয়নি। অন্যদিকে বৈঠকে অংশ নেওয়া দলের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য এ এস এম ফয়সাল চিশতী বলেন, সাদকে প্রার্থী করা হয়েছে।

গতকাল সকাল ১১টায় জাতীয় পার্টির বনানী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা আরো বলেন, ‘রংপুর উপনির্বাচনে প্রার্থী ঠিক করা হয়নি। পার্টির চেয়ারম্যান ও আমি আলোচনা করে প্রার্থী চূড়ান্ত করব।’ এরপর বিকেলে জাতীয় সংসদে রাঙ্গা সাংবাদিকদের জানান, রংপুর উপনির্বাচনে সাদকে প্রার্থী করা হয়েছে।

জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাদের প্রার্থিতা চূড়ান্ত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হন রওশন এরশাদ। সাদকে প্রার্থী করা না হলে তিনি আগের অবস্থানে ফিরে যাবেন বলে হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর এ ব্যাপারে রাজি হন কাদেরপন্থী নেতারা।’

জাতীয় পার্টির একটি সূত্র জানায়, একসময় রংপুরে বিকল্প নেতা ছিলেন মসিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি বারবার এরশাদকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন, আবার দলেও ফিরেছেন। তাঁকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল। রংপুরে তাঁর একটি নিজস্ব বলয় আছে। তবে এরশাদের মৃত্যুর পর রংপুরে একচেটিয়া নেতা হয়ে উঠেছিলেন জি এম কাদের। এতে লাগাম পরাতেই সাদকে প্রার্থী করে কৌশলী খেলা খেলেছেন রাঙ্গা।

তবে বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে রাঙ্গা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পার্টি বাঁচাতে, আগুন নেভাতে যা ভালো আমি সেদিকে কাজ করেছি।’

জাতীয় পার্টির রংপুরের একজন নেতা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, জি এম কাদেরের বাড়ি রংপুর-৩ আসনে। তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন লালমনিরহাট থেকে। জি এম কাদের যাতে আগামীতে রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচন করতে না পারেন সে কারণে কৌশলে এরশাদের ছেলেকে এ আসনে বসিয়ে দেওয়া হলো।

সাদকে প্রার্থী করায় হতাশা ব্যক্ত করে রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা একজন স্থানীয় নেতাকে প্রার্থী করার আবেদন জানিয়েছিলাম, তাঁরা (দলের নেতারা) শোনেননি। এখন যাঁরা সাদকে মনোনয়ন দিয়েছেন, তাঁরা রংপুরে এসে নির্বাচন করবেন। আমরা নির্বাচনের সঙ্গে নেই।’

জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রংপুরের মানুষ হিসেবে আমি হতাশ-ক্ষুব্ধ। পার্টি তৃণমূলকে কোনো পাত্তাই দিল না। আগামীতে রংপুরে কী হয়, সৃষ্টিকর্তাই বলতে পারবেন।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা