kalerkantho

মেট্রো রেলের কাজে উড়ন্তগতি

পার্থ সারথি দাস   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেট্রো রেলের কাজে উড়ন্তগতি

ফ্লাইওভারের মতো দেখতে এই অবকাঠামোকে বলে ভায়াডাক্ট। এর ওপর দিয়ে নভেম্বর থেকেই বসবে মেট্রো রেলের লাইন। শেওড়াপাড়া-আগারগাঁও অংশের গতকালের ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

একের পর এক খুঁটির ওপর ছাইরঙা অবকাঠামো (ভায়াডাক্ট) প্রলম্বিত হচ্ছে। মূল সড়কের মধ্যভাগে বিভাজক বরাবর প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ চলছে দিনরাত। চলাচলের পথ অর্ধেক করা হয়েছে বহু আগেই। কখনো কখনো বন্ধ থাকে কোনো কোনো লেন। চলতে হয় বিকল্প পথে। এসব ঝক্কি-ঝামেলার পরও যাত্রী, পথচারী, গাড়িচালক আগারগাঁও, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া এলাকায় গেলে চলার পথে প্রতিদিনের কষ্ট ভুলে ভীষণ খুশি হয়। মিরপুর-১০, ১১, ১২ নম্বর সেকশনে মূল সড়কে চলার পথে মাথার ওপরে ক্রমেই প্রলম্বিত হতে থাকা বিশাল অবকাঠামো সবার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ দেখে নগরবাসী বুঝে নেয়, মেট্রো রেলপথ নির্মাণ প্রস্তুতির বড় অংশই এরই মধ্যে শেষ। গতকাল শুক্রবার সকালে শেওড়াপাড়ায় খুঁটির ওপর বসানো কাঠামোর দিকে তাকিয়ে পথচারী আজহার উদ্দিন বলে ওঠেন, ‘কষ্টের দিন তাইলে শ্যাষ হইতাছে।’

দেশের প্রথম মেট্রো রেল হচ্ছে ঢাকায়। উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার মেট্রো রেলপথে বিদ্যুত্চালিত ২৪ সেট ট্রেন চলাচল করবে। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের নভেম্বর থেকে রেলপথ বসানোর কাজ শুরু হবে। জাপান থেকে রেলকোচ আসা শুরু হবে আগামী বছর ১৫ জুন থেকে। ইউরোপের তিনটি দেশ থেকে স্লিপার আনা হচ্ছে রেলপথে ব্যবহারের জন্য। ইংল্যান্ড থেকে এরই মধ্যে রেলপথ বসানোর রেলট্র্যাক আনা শেষ হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পুরো রেলপথ চালুর মধ্য দিয়ে ঢাকায় মেট্রো রেল পরিচালনা শুরু হবে।  

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা মাসট্রানজিট কম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এতে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা দিচ্ছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক কাজের অগ্রগতি ৩০.৫ শতাংশ। উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে আগারগাঁও অংশে অগ্রগতি ৪৬ শতাংশ। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশে অগ্রগতি ২৩.৫০ শতাংশ। বৈদ্যুতিক ও কারিগরি ব্যবস্থা, রেলকোচ ও ডিপোর যন্ত্রপাতি সংগ্রহে সমন্বিত অগ্রগতি ১৯.৮৭ শতাংশ। প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আটটি অংশে (প্যাকেজ) ভাগ করে প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে। এর মধ্যে প্যাকেজ-১-এর আওতায় উত্তরার দিয়াবাড়িতে ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজ নির্ধারিত সময়ের ৯ মাস আগে গত বছর ৩১ জানুয়ারি শেষ হয়েছে।

প্যাকেজ-২-এর আওতায় ডিপোর পূর্ত কাজ ২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে। এখানে ৫২টি অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তার মধ্যে রিটেইনিং দেয়াল, টেস্ট ট্র্যাক বেড, কোচ আনলোডিং এলাকা, বগি ট্রার্ন টেবিল, ওয়াস প্লান্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ওয়ার্কশপ, ট্রেন পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ চলছে। এ অংশে অগ্রগতি ৫২ শতাংশ। প্যাকেজ-৩ ও ৪-এর আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৯টি স্টেশন নির্মাণের কাজ ২০১৭ সালের ১ আগস্ট শুরু হয়। এ অংশে কাজ এগিয়েছে ৫৫ শতাংশ। পরিষেবা লাইন স্থানান্তর, টেস্ট পাইল, মূল পাইল ও আই গার্ডার নির্মাণ শেষ হয়েছে। মোট ৭৬৬টি পাইল ক্যাপের ৭০১টির কাজ শেষ হয়েছে। প্রায় ছয় কিলোমিটার অংশে ভায়াডাক্ট বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। ৯টি স্টেশনের সাবস্ট্রাকচার নির্মাণ শেষ হয়েছে। উত্তরায় দুটি স্টেশনের কনকোর্স নির্মাণের কাজ চলছে।

আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ৩ দশমিক ১৯৫ কিলোমিটার অংশে ভায়াডাক্ট ও তিনটি রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে প্যাকেজ-৫-এর আওতায়। এ অংশে অগ্রগতি ১৩.২৪ শতাংশ। গত আগস্ট থেকে এ অংশে কাজ শুরু হয়। পরিষেবা লাইন স্থানান্তর ও টেস্ট পাইল শেষ হয়েছে।

কারওয়ান বাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ৪ দশমিক ৯২২ কিলোমিটার অংশে ভায়াডাক্ট ও চারটি রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে। গত ১ আগস্ট শুরু হয়ে এ পর্যন্ত এ অংশের অগ্রগতি ১৬.৭৪ শতাংশ। ১৬০টির মধ্যে ১১টি পিয়ার বসানো হয়েছে।

রেলপাত এসেছে : প্যাকেজ-৭-এর আওতায় বৈদ্যুতিক ও কারিগরি ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ ১৬.৫০ শতাংশ এগিয়েছে। উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপনের জন্য সমীক্ষা শেষ হয়েছে। টঙ্গি ও মানিকনগর গ্রিড উপকেন্দ্রে বে নির্মাণ হয়েছে। উত্তরায় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের নির্মাণ চলছে। রেলপাত ছাড়াও ১৩২ কেভি ও ৩৩ কেভি কেবল উত্তরা ডিপোয় আনা হয়েছে।

প্যাকেজ-৮-এর আওতায় রেলকোচ ও ডিপোর যন্ত্রাংশ আমদানির কাজ ২০১৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শুরু হয়। এ অংশে অগ্রগতি ১৫.১০ শতাংশ। জাপানে রেলকোচ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে।

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন ছিদ্দিক গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রেলপথ বসানোর কাজ আগামী নভেম্বরে শুরু হবে। আগামী বছরের ১৫ জুন থেকে দুই মাসের মধ্যে ২৪টি ট্রেন আসবে। তারপরই শুরু করা হবে পরীক্ষামূলক ট্রেন পরিচালনা।’

তিনি আরো বলেন, ‘উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পুরো রেলপথ ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে উদ্বোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করবেন বলে আমরা আশা করছি।’

 

মন্তব্য