kalerkantho

প্রতিবেশীদের লাভ ভারত-চীন টক্করে

মেহেদী হাসান   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রতিবেশীদের লাভ ভারত-চীন টক্করে

একদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই), অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ (প্রতিবেশীই প্রথম) নীতি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী ভূ-রাজনৈতিক পূর্বাভাস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটফোরের মতে, চীনের অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ওই পরিকল্পনা নরেন্দ্র মোদিকে বাধ্য করছে তাঁর ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতির আওতায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করার উদ্যোগ নিতে। বেইজিং ও নয়াদিল্লির এই টক্করে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোও সর্বোচ্চ লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে এবং তা অর্জিত হওয়ারও সম্ভাবনা আছে।

স্ট্র্যাটফোরের বিশ্লেষণ মতে, গত মে মাসে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর মোদি ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান এতে রীতিমতো স্তম্ভিত। মোদির সরকার এখন তার প্রভাববলয় ধরে রাখতে প্রতিবেশীদের দিকে আরো নিবিড় দৃষ্টি দিচ্ছে। তারা এই অঞ্চলের দেশগুলোতে অর্থ সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। প্রতিবেশীদের অবহেলার মূল্য বেশ চড়া হতে পারে—এটি ভারত অনুধাবন করে। এ জন্য মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে ভারত।

মোদি এবার তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় গেছেন। ওই দেশ দুটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের স্ট্র্যাটেজিক (সুদূরপ্রসারী সার্বিক লক্ষ্যমুখী) প্রভাব ভারতকে উদ্বিগ্ন করেছিল। মোদির ভুটান সফরকে চীনের বলয় থেকে ওই দেশটিকে বাইরে রাখার চেষ্টা হিসেবে দেখছে স্ট্র্যাটফোর।

স্ট্র্যাটফোরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করা বাংলাদেশ মোদির ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির জন্য অপরিহার্য। ওই নীতির মাধ্যমে ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ ও চীন বিআরআইয়ের আওতায় দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি সই করে। এটি মোদি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে চীন-ভারত প্রতিযোগিতা আরো বাড়িয়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। বাংলাদেশের এই লক্ষ্য পূরণে সহযোগী ভারত, চীনসহ আরো অনেকে।

স্ট্র্যাটফোরের বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত এ দেশের বিশ্লেষকরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চীন ও ভারতের মধ্যে যখন প্রতিযোগিতা হবে তখন তা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে। পাশাপাশি ওই দেশগুলো এ দেশে কেন আসছে তা-ও আমাদের দেখতে হবে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি বাংলাদেশ বুঝতে পারার আগে বিদেশি বড় শক্তিগুলো বুঝতে পেরেছে।’ তিনি আরো বলেন, ২০১৩-১৪ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মাইলফলক। মূলত ওই সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে বড় পরিসরে বাণিজ্য, স্ট্র্যাটেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। রাশিয়া, জাপানের বিনিয়োগ এসেছে। এগুলোর কারণ হলো তারা বাংলাদেশের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে।

ড. লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতায় আমরা কেবল লাভবানই হচ্ছি না, আমাদের দর-কষাকষির অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। তারা যা চাইছে তাতেই রাজি হচ্ছি তা কিন্তু নয়। তাদের দেখতে হচ্ছে, বাংলাদেশ কোনটায় রাজি হচ্ছে আর কোনটায় হচ্ছে না।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশী ফয়েজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, “ভারত ও চীন—দুই দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের সুসম্পর্ক আছে। ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু সেটি যদি ‘কনফ্লিক্টে’ (বিরোধে) রূপ নেয় তবে তা আমাদের জন্য শঙ্কার। কারণ তখন চীনের কাছ থেকে সহযোগিতা নেব, না ভারতের কাছ থেকে নেব—এ নিয়ে দোটানায় পড়তে হয়। এর চেয়ে বরং ওই দেশের মধ্যে সহযোগিতা থাকলে আমাদের জন্য আরো ভালো।”

স্ট্র্যাটফোরের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের বিশাল বাজারের প্রতি ভারতের আগ্রহের বিষয়টির উল্লেখ আছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠককে আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছে স্ট্র্যাটফোর। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে সমস্যায় আছে বাংলাদেশ। আসামে নাগরিক তালিকায় বাদ পড়া বাসিন্দাদের একটি অংশকেও যদি ভারত বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে তবে তা বড় সংকট হয়ে দাঁড়াবে।

স্ট্র্যাটফোর বলছে, ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আঞ্চলিক প্রভাব অব্যাহত রাখতে চায়। আগামী দিনগুলোতে ভারত তার প্রতিবেশী বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশে কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক আরো জোরদার করাকে অগ্রাধিকার দেবে। তবে চীনের বিআরআই উদ্যোগে বিশাল অর্থপ্রবাহ ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ।

জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক নেপাল সফরকে ওই দেশটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। হিমালয় পর্বতের কারণে চীনের সঙ্গে নেপালের অবকাঠামো নির্মাণ কঠিন। তবে নয়াদিল্লির প্রভাব কমাতে কাঠমাণ্ডু বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে।

 

মন্তব্য