kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাভার চামড়া শিল্প নগরী

সিইটিপির কাজ শেষই হয় না

আরিফুর রহমান   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সিইটিপির কাজ শেষই হয় না

এবার ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদে কাঁচা চামড়ার দাম কমে যাওয়া নিয়ে দেশজুড়ে যখন ব্যাপক সমালোচনা চলছে তখন জানা গেল, চতুর্থবারের মতো সাভার চামড়া শিল্প নগরী প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছরের জন্য বাড়ানো হচ্ছে। ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলে শুরু হওয়া প্রকল্পের কাজ ১৬ বছরেও শেষ করতে পারেনি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোসহ বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। সময় বাড়ানোর এই প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বললেও বিশেষ বিবেচনায় তা অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু করছে কমিশন। এবার ঈদে কাঁচা চামড়ার দরপতনের পাশাপাশি চামড়া রপ্তানিতে ধস নামার পেছনে সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারাকে দায়ী করে আসছেন ট্যানারি মালিকরা।

যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ দুবারের বেশি বাড়াতে নিরুত্সাহ করে পরিকল্পনা কমিশন। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া সাভার চামড়া শিল্প নগরী প্রকল্পের বেলায় কেন চারবার সময় বাড়ানো হচ্ছে তার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রকল্পটিকে ‘রুগ্ণ’ উল্লেখ করে চিঠি দিয়েছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ে। সিইটিপি নির্মাণকাজের ঠিকাদার চীনা কম্পানির কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে পরিকল্পনা কমিশনের। কিন্তু চীনা ঠিকাদারকে বাদ দিয়ে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে অন্য ঠিকাদার দিয়ে কাজ করাতে গেলে সিইটিপি নির্মাণের কাজ আরো পিছিয়ে যাবে—এমন বাস্তবতায় প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) সাহিন আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এভাবে বছরের পর বছর একটি প্রকল্পের কাজ চলতে পারে না। এতে একদিকে যেমন সরকারি টাকার অপচয় হয়, অন্যদিকে মানুষও প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। সাভার চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের মেয়াদ চতুর্থবারের মতো বাড়ানোর প্রস্তাব আমাদের কাছে এসেছে। আমরা কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছি বিসিককে। তারা যদি সেগুলো সংশোধন করে আনে, আমরা প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাঠাব।’

বাংলাদেশের অনেক পরে শুরু করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বানতলায় এশিয়ার সর্ববৃহত্ চামড়া শিল্পনগরীতে এরই মধ্যে চারটি সিইটিপি নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। আরো চারটি সিইটিপি নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পথে। অথচ ১৬ বছরেও সিইটিপি নির্মাণের কাজ শেষ করতে পারেনি বিসিক। এটি শেষ করতে না পারায় ট্যানারি মালিকরা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডাব্লিউজি) থেকে পরিবেশগত আন্তর্জাতিক সনদ পাচ্ছেন না। ফলে চামড়া শিল্পনগরী পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে পণ্য রপ্তানি কমে গেছে। কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে চলছে অরাজকতা। ধলেশ্বরী নদীও পড়ছে হুমকিতে। গত জুনে সিইটিপি নির্মাণের কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখন বিসিক বলছে, পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আরো এক বছর লাগবে। 

সংশোধনী প্রস্তাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকাজের পদে পদে অদক্ষতা ও সক্ষমতার ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। পরিকল্পনায়ও ছিল গলদ। ২০০৩ সালে প্রকল্প অনুমোদনের সময় বলা হয়েছিল, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে তৈরি হওয়া বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হবে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে স্লাজ পাওয়ার জেনারেশন সিস্টেম (এসপিজিএস) নির্মাণে ১১৪ কোটি টাকা রাখা হয়েছিল। কিন্তু ১৬ বছর পর কর্মকর্তাদের উপলব্ধি হলো, চামড়া শিল্পনগরী থেকে যতটুকু বর্জ্য তৈরি হবে, তা দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন সম্ভব নয়। সে কারণে গত রবিবার পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় এই প্রকল্প থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ার কথা থাকলেও এখনো এর কাজই শুরু হয়নি। এই খাতে ১২ কোটি টাকা রাখা হলেও তা এখনো ব্যয় হয়নি। বিসিক নতুন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরামর্শ নিয়ে সলিড বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ার পরিবর্তে তিনটি ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। ওই তিনটি ডাম্পিং ইয়ার্ডের নকশা তৈরি করে দেবে বুয়েট। গত রবিবারের আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিসিক চেয়ারম্যান মোস্তাক হাসান জানান, নকশা পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। কাজটি শেষ করতে ছয় মাস লাগবে। এ জন্য প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, চতুর্থবারের মতো তাঁদের কাছে পাঠানো প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবে কিছু বিষয় হাস্যকর। প্রকল্প শুরু করার ১৬ বছর পরে এসে বিসিক এই প্রকল্পের আওতায় ট্যানারি মালিকদের সচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ছয় লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। ৪৯০টি উপজেলায় কোরবানির পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর পাঁচ হাজার কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই খাতে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে পাঁচ কোটি টাকা। এ ছাড়া ল্যাব টেকনিশয়ানদের প্রশিক্ষণের জন্য ছয় লাখ টাকা এবং ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনার জন্য আরো ছয় লাখ টাকা রাখার প্রস্তাব করেছে বিসিক। পাশাপাশি শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি চামড়া নীতিমালা তৈরি করার টাকাও এই প্রকল্প থেকে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, যেখানে প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করার দিকে কর্মকর্তাদের মনোযোগ থাকার কথা, সেখানে বাড়তি কাজ হাতে নিয়ে প্রকল্পের কাজ আবারও বাড়ানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে। যদিও এসব প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত থাকবে না বলে জানিয়েছেন কমিশনের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি সংস্থার দক্ষতা ও সক্ষমতা কতটুকু তার প্রমাণ এই প্রকল্প। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে না পারায় চামড়াপণ্য রপ্তানি কমে গেছে। এবারের কোরবানির ঈদে চামড়ার দাম কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ এই সিইটিপি নির্মাণের কাজ শেষ না হওয়া।

বিসিকের চেয়ারম্যান মোস্তাক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বিসিকের দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র ছয় মাস হলো। দায়িত্ব গ্রহণ করেই সাভারে গিয়ে দেখি সিইটিপি নির্মাণকাজ বন্ধ। সবার অভিযোগ ছিল চীনা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই মুহূর্তে চীনা ঠিকাদারকে বাদ দিয়ে অন্য ঠিকাদার নিয়োগ করতে অনেক সময় চলে যাবে। খরচও বাড়বে। তাই চীনা ঠিকাদার দিয়েই কাজটি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সিইটিপি নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পথে। বাকি কাজ করতে আমরা এক বছর বাড়তি সময় চেয়েছি। আশা করছি, এই সময়ের মধ্যেই আমরা প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারব।’

পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য মতে, চামড়াশিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য অবকাঠামো সুবিধা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পনগরী গড়ে তুলতে সাভারের হেমায়েতপুরে ১৯৯ একর জমির ওপর চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ২০০৩ সালে। ওই সময় খরচ ধরা হয়েছিল ১৭৬ কোটি টাকা। ২০০৫ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। এরপর প্রথম দফায় ২০১০ সালে, দ্বিতীয় দফায় ২০১৬ সালে, তৃতীয় দফায় ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে এক হাজার ৭৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। পরিকল্পনা কমিশনের মত হলো, এই ধরনের চামড়া শিল্পনগরী করার মতো অভিজ্ঞতা বিসিকের নেই। প্রকল্পের দায়িত্ব বিসিককে দেওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় এখনো সীমানাপ্রাচীরের কাজও শেষ হয়নি। পানি সরবরাহের কাজ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণের কাজও বাকি। এসব কাজ আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ হবে বলে জানিয়েছেন বিসিক চেয়ারম্যান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা