kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দেবর-ভাবির কোন্দলে টালমাটাল জাপার দুর্গ

নওশাদ জামিল ও স্বপন চৌধুরী, রংপুর থেকে   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেবর-ভাবির কোন্দলে টালমাটাল জাপার দুর্গ

জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতৃত্ব ও আসন্ন রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনের প্রার্থিতা ঘিরে দলটির শীর্ষ দুই নেতা জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে কোন্দল-বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। সম্পর্কে তাঁরা দুজন দেবর-ভাবি। মূলত দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নিয়ে তাঁদের এই বিরোধ। রংপুরের উপনির্বাচনে জাপার মনোনয়ন নিয়ে বাড়তে থাকে এ দ্বন্দ্ব। পরে দুই নেতাই নিজেকে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। সংসদে বিরোধী দলের নেতা হতে দুজনই স্পিকারের কাছে পাল্টাপাল্টি চিঠি পাঠিয়েছেন। দেবর-ভাবির এই কোন্দলে টালমাটাল হয়ে উঠেছে জাপার দুর্গ হিসেবে পরিচিত উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগ।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দিনভর রংপুর শহরে দেখা গেছে চায়ের স্টলে, অফিসে, পাড়া- মহল্লায় মানুষের মুখে মুখে জাপার দুই নেতার বিরোধ নিয়ে আলোচনা। রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোডে জেলা ও মহানগর জাপার কার্যালয়। গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, নেতাকর্মী ও সমর্থকরা হতাশ হয়ে তাকিয়ে আছে দুই নেতার দিকে। রংপুর শহরে গতকাল টক অব দ্য টাউন ছিল কাদের-রওশন কোন্দল। শীর্ষ নেতাদের বিরোধে রংপুরের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা গভীর সংকটে পড়েছে। কাদেরপন্থী ও রওশনপন্থী হিসেবে এরই মধ্যে নেতাকর্মীরাও চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে তারা সংঘর্ষেও লিপ্ত হচ্ছে। রংপুরে জাপার তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও শোনা যাচ্ছে ভাঙনের সুর। এ অবস্থায় রংপুর জাপার শীর্ষ নেতা ও স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষকরা জানান, দুই নেতার বিরোধে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে। টালমাটাল হয়ে পড়বে জাপার দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর।

কদিন আগেও ভোটের হিসাবে রংপুর ছিল জাতীয় পার্টির দুর্গ। কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতা, দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাবে দিন দিন দুর্বল হচ্ছে এই দুর্গ। ‘রংপুরের ছাওয়াল’ জাপার চেয়ারম্যান এরশাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে দলটির ভাঙনের ঘণ্টাও যেন বেজে উঠেছে। যদি জাপার শীর্ষ দুই নেতার সমঝোতা না হয়, তাহলে দলটি ভাঙনের মুখে পড়বে।

রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা নিয়ে রংপুর বিভাগ। আট জেলায় রয়েছে ৩৩টি সংসদীয় আসন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৩২টিতে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ২৪টি ও জাতীয় পার্টি ৭টি আসন। একটি আসন পায় বিএনপি।

একাদশ নির্বাচনে গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ী) আসনে ঐক্যফ্রন্ট সমর্থিত প্রার্থী জাপার (জাফর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. টি আই এম ফজলে রাব্বী চৌধুরী গত বছর ২০ ডিসেম্বর মারা গেলে ভোট স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। পরে গত ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাপা আলাদাভাবে নির্বাচন করে। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. ইউনুস আলী সরকার বিপুল ভোটে পরাজিত করেন জাপার প্রার্থী দিলারা খন্দকারকে।

রংপুর বিভাগের প্রাণকেন্দ্র রংপুর-৩ (সদর) আসন বরাবরই ছিল জাতীয় পার্টির দখলে। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এখানে জয় পেয়েছে জাপা। কিন্তু এরশাদের মৃত্যুর পর কোন্দল-বিরোধে আসনটি হারানোর উপক্রম হয়েছে।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য, রংপুর মহানগর জাপার সভাপতি ও সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এরই মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে যদি এরশাদপুত্র সাদ এরশাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, রংপুর জাপা তা মেনে নেবে না। এ ছাড়া স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনোনয়ন ঘিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিরোধ আরো তীব্র হয়েছে কাদের-রওশনের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘জাপা যে আবেগ দিয়ে ভোটার টানত, তার অসারতা প্রমাণ হয়ে গেছে। রংপুরবাসীর ভাগ্যোন্নয়নে কোন সরকার কতটুকু কাজ করেছে, তারা তা বিবেচনায় নিচ্ছে। মহাজোটের বদৌলতেই রংপুর-৩ আসন এবার পেয়েছিল জাপা। কিন্তু আলাদা নির্বাচন হলে জাপার ভরাডুবির সম্ভাবনা রয়েছে। রংপুরের মূল কেন্দ্রে জাপার পরাজয় হলে গোটা বিভাগে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের কাছে জাপার গ্রহণযোগ্যতা নেই। তরুণদের তারা কখনোই মূল্যায়ন করেনি। রংপুরের উন্নয়নেও তারা জোরালো ভূমিকা পালন করেনি। এ অবস্থায় জাপার শীর্ষ দুই নেতার বিরোধে গোটা দলই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।’

রংপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র টাউন হল চত্বরে কথা হয় নাট্যকর্মী রাজ্জাক মুরাদের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আবেগ আর রাজনীতি এক নয়। সেটা রংপুরের মানুষ এখন বুঝতে পারছে। এরশাদের মৃত্যুর পর জাপার পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সম্প্রতি তাদের বিরোধে এলোমেলো হয়ে পড়েছে রংপুরে জাপার রাজনীতি।’

কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক ও রংপুর জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘দলের ভেতরে একটি চক্র জাতীয় পার্টিকে ভাঙতে তৎপর। অতীতেও কয়েকবার ভেঙেছে জাপা। এবার যদি আবার ভাঙে, সরাসরি তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রংপুরের উপনির্বাচনে।’

জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর বলেন, ‘জাতীয় পার্টিতে এখন মূল ধারার বাইরে একটি উপধারা হয়েছে। আমরা রংপুরের মানুষ এরশাদের আদর্শে বিশ্বাস করি। তাঁর উত্তরাধিকারী জি এম কাদের যেমন, রওশন এরশাদও। তাঁদের মধ্যে বিরোধ হলে, কোন্দল হলে সেটা জাপার জন্যই ক্ষতিকর হবে। আমাদের এখন সব ধরনের মতবিরোধ ও কোন্দল মিটিয়ে রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে কাজ করা উচিত।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা