kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন

১৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের কর্তৃত্ব নিয়েই দ্বন্দ্ব

শরীফুল আলম সুমন ও শুভ আনোয়ার   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের কর্তৃত্ব নিয়েই দ্বন্দ্ব

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) হল নির্মাণ ও গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন তুঙ্গে। ক্লাস-পরীক্ষা ফেলে সবাই ব্যস্ত আন্দোলন নিয়ে। আন্দোলনের শুরুটা গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে হলেও বর্তমানে তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। উপাচার্যবিরোধী শিক্ষকরাও স্বীকার করছেন, ভবন করতে হলে কিছু গাছ কাটা লাগতেই পারে। তবে তাঁদের আন্দোলন এখন অস্বচ্ছ মাস্টারপ্ল্যান এবং দরপত্র-প্রক্রিয়ার অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে এই আন্দোলন নিয়ে নানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষকদের পাঁচটি গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি গ্রুপ আওয়ামী লীগপন্থী। এই তিনটি গ্রুপ বর্তমানে দুই ভাগে বিভক্ত। বড় অংশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সঙ্গে রয়েছে, যারা উপাচার্যপন্থী শিক্ষক হিসেবে বর্তমান মাস্টারপ্ল্যানের পক্ষে রয়েছে। আর বিএনপিপন্থী শিক্ষক গ্রুপ, আওয়ামীপন্থীদের একাংশ, যারা সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরের অনুসারী, তারা এবং বামপন্থী শিক্ষকদের গ্রুপ মিলে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে নেমেছে।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মহাপরিকল্পনা অনুসারে ২০২২ সালের মধ্যে এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছেলেদের জন্য তিনটি ও মেয়েদের জন্য তিনটি হল নির্মাণ, চারটি একাডেমিক ভবন, একটি গ্রন্থাগার, একটি প্রশাসনিক ভবন, একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্স, একটি লেকচার হল কাম পরীক্ষার হল, একটি প্রভোস্ট কমপ্লেক্স, একটি হাউস টিউটর ভবন, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পাঁচটি আবাসিক ভবন, একটি গেস্টহাউস, শহীদ রফিক-জব্বার হলের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, দুটি খেলার মাঠ, জহির রায়হান মিলনায়তন, সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চ এবং ১২টি পুরনো হলের সংস্কারকাজ। গত বছর ২৩ অক্টোবর একনেকে অনুমোদন পায় জাবির অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প। এই মেগা প্রকল্পের প্রথম ধাপে ছেলেদের তিনটি ও মেয়েদের তিনটি হল নির্মাণকাজের জন্য চলতি বছরের ১ মে দরপত্র আহ্বান করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরই মধ্যে পাঁচটি হলের দরপত্র-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট জায়গা ৭০০ একর। এর মধ্যে ৪৪ শতাংশ ব্যবহার উপযোগী। তবে এরই মধ্যে ২৩ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে নতুন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাকি ২১ শতাংশ ব্যবহারের বিকল্প নেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের কর্তৃত্ব নিয়েই মূলত দ্বন্দ্ব। কারণ উপাচার্যপন্থী শিক্ষকরা চান বর্তমান উপাচার্যের সময়েই এই কাজ শেষ করতে। আর শরীফ এনামুলের অনুসারী আওয়ামীপন্থী ও বিএনপিপন্থী অন্য শিক্ষকরা চান পরবর্তী সময়ে তাঁদের উপাচার্য এলে তখন এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে। কারণ উপাচার্য ফারজানা ইসলামের দ্বিতীয় মেয়াদ চলছে বর্তমানে। আর মাত্র আড়াই বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করবেন। আর বামপন্থী শিক্ষকরা সব সময়ই আন্দোলনের সঙ্গে থাকেন।

১৯৬৮ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আর্কিটেক্ট ও প্ল্যানার মাজহারুল ইসলামের হাতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়। সে অনুসারেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচারাল ভিউ, ল্যান্ডস্কেপ ভিউ সব কিছুই সুন্দর। স্থাপনাগুলো প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখেই করা হয়েছে। এমনকি মীর মশাররফ হোসেন হলের একটি ব্লক থেকে আরেকটি ব্লকের মধ্যে যে উঁচুনিচু, সেটাও করা হয়েছে ভূমিবৈচিত্র্য মাথায় রেখে। এ ছাড়া আগের ভবনগুলো লাল ইটের তৈরি, ব্যবহার করা হয়েছে সিরামিক। তবে ১৯৮৪ সালে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ভিসি থাকার সময় প্রথমে সেই মাস্টারপ্ল্যান ভাঙা হয়। সে সময় তৈরি হয় সালাম-বরকত হল, কামালউদ্দিন হল ও আল বেরুনি হলের এক্সটেনশন। এরপর কাজী সালেহ আহমেদ ভিসি হলে তিনিও মাস্টারপ্ল্যান ভেঙে সোশ্যাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টি নির্মাণ করেন। সর্বশেষ শরীফ এনামুল কবিরের সময়ও মাস্টারপ্ল্যান ভেঙে কলাভবন নির্মাণ করা হয়।

আন্দোলনকারী একাধিক শিক্ষক জানান, বর্তমান মহাপরিকল্পনায় বড় গলদ পাওয়া গেছে। মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজের জন্য একটি বিস্তারিত  TOR (Term of Reference) একান্ত আবশ্যক, যা সিন্ডিকেট কর্তৃক মনোনীত বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রণীত হওয়া উচিত। তা করা হয়নি। মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্রকল্প পরিচালক ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক মনোনয়ন দিতে হয়, যার মধ্যে একজন অবশ্যই এ কাজে অভিজ্ঞ পরিকল্পনাবিদ হওয়া উচিত, যা এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এ ছাড়া মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে কত ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে বিন্যস্ত করে দেখানো হয়নি। যেমন—ভূমিরূপ ও উচ্চতার তথ্য; ভূতাত্ত্বিক ও ভূমিকম্পনজনিত তথ্য; ভূ-উপরিভাগ ও ভূগর্ভস্থ পানির তথ্য; উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল, তাদের প্রজনন ও পরিভ্রমণের তথ্য; বর্তমান ভূমি ব্যবহার ও নির্মিত স্থাপনার তথ্য; পরিবেশের উপাদানগুলোর (পানি, বায়ু, মাটি, শব্দ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা) তথ্য এবং বর্তমান ইউটিলিটি সার্ভিস সংক্রান্ত (বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ইন্টারনেট, ডিশ ও পয়োনিষ্কাশন সঞ্চালন লাইন) তথ্য এই মহাপরিকল্পনায় অনুপস্থিত; যেগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ, কার্যকর ও টেকসই মহাপরিকল্পনার পূর্বশর্ত।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রথম ১৫ দিন ব্যাংকে কোনো শিডিউলই পাওয়া যায়নি। এত বড় কাজ ই-জিপিতে করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। শিডিউল ক্রয়ে ভঙ্গ করা হয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে দরপত্রের শিডিউল ছিনতাইয়ের অভিযোগ তোলে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

আন্দোলনকারী বামপন্থী শিক্ষক দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মহাপরিকল্পনাটা আসলে কী, সেটা কাদের সঙ্গে আলোচনা করে হয়েছে, সেটাই এখনো আমরা বুঝতে পারিনি। তিনটি দশতলা হল নির্মাণকে কেন্দ্র করে হাজারের ওপরে গাছ কাটা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব থেকে নান্দনিক জায়গাটিই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

আন্দোলনকারী বিএনপিপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দীন রুনু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান করেন পরিকল্পনাবিদরা। সঙ্গে থাকেন আর্কিটেক্টরা। আমাদের এখানে সেটা মানা হয়নি। কিছু বিল্ডিং তৈরি করা কি মাস্টারপ্ল্যান? সারা পৃথিবীতে সবাইকে জানিয়ে মাস্টারপ্ল্যান করতে হয়। কিন্তু আমাদের উপাচার্যের চুপি চুপি কাজ করার কারণে সন্দেহ আরো দানা বেঁধেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ করতে হলে ভবন প্রয়োজন। এখন যেখানে জায়গা রয়েছে সেখানেই তো ভবন নির্মাণ করতে হবে। তবে তা হতে হবে পরিকল্পিতভাবে। এই পরিকল্পনায় নগর পরিকল্পনাবিদদের রাখতে হবে। আর আর্থিক যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর একটা ভিত্তিও আমরা পেতে চাই। এ জন্য নিরপেক্ষ সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করাতে হবে। আবার এখন যেকোনো কাজেই ভাগ-বাটোয়ারা হয়। তবে তা শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকে না।’

নাম প্রকাশ না করে আরেকজন অধ্যাপক বলেন, ‘সব উপাচার্যই চান তাঁর সময়ে উন্নয়নমূলক কাজগুলো হোক। এতে তাঁর অনুসারীরাই বেশি লাভবান হবেন। এবারের মহাপরিকল্পনা ও আন্দোলনকে ঘিরেও সেই বিষয়টা রয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নুরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বুয়েটের অধ্যাপক আহসান উল্লাহ মজুমদারের নেতৃত্বে একটি কমিটি এই মাস্টারপ্ল্যানের কাজ করেছে। সেখানে আরবান প্ল্যানার ছিলেন, পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ সবাই ছিলেন। সব কিছু করার পর ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় হয়ে এই প্রকল্প একনেকে পাস হয়েছে। তাই একে কোনোভাবেই অপরিকল্পিত বা অস্বচ্ছ বলার সুযোগ নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা