kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অপরিকল্পিত নগরায়ণে রংপুরের ত্রাহি অবস্থা

কর বাড়লেও ১০ লাখ মানুষের সেবা বাড়েনি

নওশাদ জামিল ও স্বপন চৌধুরী, রংপুর থেকে   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অপরিকল্পিত নগরায়ণে রংপুরের ত্রাহি অবস্থা

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠছে বাণিজ্যিক ভবন, ছোট-বড় কারখানা। মূল শহরে ও আশপাশে কিছু রাস্তাঘাট হলেও গোটা নগরে তেমন উন্নয়ন হয়নি। বেশির ভাগ রাস্তাই বেহাল। কর বাড়লেও প্রায় ১০ লাখ জনসংখ্যার নগরটিতে বাড়েনি সেবার মান। নতুন যুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডের অবস্থাও খুব খারাপ। হয়নি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এমন ত্রাহি অবস্থা রংপুরের।

রংপুর নগর এরই মধ্যে ছয় বছর পার করেছে। আর মেয়াদের প্রায় দুই বছর পার করে ফেলেছেন নগর সংস্থার মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। কিন্তু তিনি উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ করেননি বলে জানিয়েছে সচেতন নাগরিকরা। তারা বলছে, এ কারণে রংপুরবাসীর দীর্ঘদিনের আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে।

ভুক্তভোগীরা জানায়, কিছুদিন আগেও ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত থাকা ওয়ার্ডগুলো যখন সিটি করপোরেশনে যুক্ত করা হয়, তখন সেখানকার নাগরিকরা ছিল উচ্ছ্বসিত। এখন তাদের উচ্ছ্বাস নেই। নগরে থাকার আনন্দও নেই।

রংপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রংপুর পৌরসভাকে বিলুপ্ত করে ২০১২ সালের ২৮ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় সিটি করপোরেশন।

সিটি করপোরেশন, ভূমি কার্যালয় ও রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, সাবেক পৌর এলাকার চেয়ে নবগঠিত সিটি করপোরেশনের সীমানা অনেক গুণ বেড়েছে। রংপুর সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নসহ কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার একটি করে ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে ছিল রংপুর পৌরসভা। এখন ২০৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড হয়েছে ৩৩টি। এর মধ্যে নতুন ১৮টি ওয়ার্ডই এখনো গ্রাম। এসব ওয়ার্ডের বেশির ভাগই কৃষি জমি।

আগে এক শতাংশ জমির ভূমি কর ছিল সাত টাকা। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় তিন গুণ। একতলা পাকা ভবনের কর ছিল প্রতি বর্গফুট পাঁচ টাকা হারে। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর তা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে বলে সূত্র জানায়। আধাপাকা বাড়ি থেকে আট তলা পাকা বাড়ির ক্ষেত্রে এখন যে কর দিতে হয় সেটা আগের প্রায় দ্বিগুণ। বিভিন্ন ক্যাটাগারিতে ৩৮৬টি ব্যবসার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত কর নির্ধারণ করা হয়েছে। পৌরসভায় যা ছিল অর্ধেক।

নগরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো নিয়ে তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই নগর সংস্থার। নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত না করে কর বাড়ানো নিয়ে রংপুরের মানুষের মধ্যে অনেকটা বিরূপ মনোভাব রয়েছে। এরই মধ্যে জমি বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। এতে বেশি বেকায়দায় পড়েছে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে নতুন যোগ হওয়া ১২ ইউনিয়নের মানুষ।

সরেজমিন দেখা যায়, বর্ধিত এলাকার বেশির ভাগ রাস্তাঘাট কাঁচা। অনেক রাস্তায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে না। সংস্কার ও তদারকির অভাবে ব্রিজ-কালভার্টগুলোও বেহাল। নেই পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সড়কবাতি নেই। স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার মান আরো করুণ।

নগরের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাওয়াইকাট্টারি গ্রামের রোস্তম মিয়া ও মাহবুব আলম বলেন, আগে তাঁরা ছিলেন পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের আওতায়। ওই সময় এলাকায় টিআর, কাবিখাসহ সরকারি নানা ধরনের সহায়তা চালু ছিল। নগরে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ওই সব সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোক্তার হোসেন জানান, এলাকায় রাস্তা, বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে অনেক কাজ হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ চলছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই সিটি করপোরেশনের সব সুযোগ-সুবিধা পাবে এ ওয়ার্ডের মানুষ।

এখনো পুরো নগর রয়েছে অগোছালো। কোথাও কোনো পরিকল্পনার ছাপ নেই। যত্রতত্র নির্মাণ হচ্ছে ছোট-বড় অনেক স্থাপনা। আবাসিক ভবন কোথায় হবে, বাণিজ্যিক ভবন কোথায় হবে—এ ধরনের কোনো নির্দেশনাও নেই। ফলে যত্রতত্র ইচ্ছেমতোই চলছে নগরায়ণ। এ ছাড়া ক্রমবর্ধমানহারে আশপাশের জেলা থেকে মানুষ আসছে রংপুরে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজট। অপরিকল্পিতভাবে হোটেল, আবাসিক হোটেল, মোটেল, আবাসিক ভবন বা বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে করে শহরের সৌন্দর্য বাড়ছে না। বরং বাড়ছে ইট-সিমেন্টের জঞ্জাল। দিন দিন পরিণত হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা শহরে।

রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য পাঁচ বছর আগে মন্ত্রিপরিষদ রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের অনুমোদন দিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। লালফিতায় বন্দি রয়েছে। ফলে রংপুর নগরকে ঘিরে কোনো মহাপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র রংপুর সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন রংপুরের সুধীজনরা। তাঁরা বলেন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হলেও শহরে পরিকল্পনার ছাপ থাকত। এখন তা নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর মহানগর শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলেছি যে ঢাকার যেখানে সমস্যা, আমাদের সেখানে সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকার অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা সহজেই বুঝতে পারব, আমাদের আসলে কী করণীয়। তার জন্য আমরা দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের কথা বলেছি। রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলেছি। দুঃখজনক হলেও সত্য এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি।’

রংপুরের জন্য পরিকল্পিত উন্নয়নের তাগিদ দিয়ে স্থানীয় সুশীলসমাজের নেতা অধ্যক্ষ ফখরুল আরো বলেন, ‘রংপুর সিটি করপোরেশনের আয়তন নেহাত কম নয়। বিশাল এলাকা এখনো ফাঁকা রয়েছে। শহরকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে হবে। কোথায় বাণিজ্যিক ভবনগুলো হবে, কোথায় আবাসিক ভবন ও আবাসিক এলাকা হবে তা নির্ধারণ করে দিতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষা, বিনোদন, সংস্কৃতিসহ শহরের নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য আলাদা জোন করা যেতে পারে। সেসবের জন্যই অত্যন্ত জরুরি রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন।’

রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রংপুর শহরে কোনো বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আবাসিক ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, অনেকে আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ভবন বানাচ্ছে। রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং নগরকে ঘিরে কোনো মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা