kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এরশাদের আসনে উপনির্বাচন

প্রার্থিতা নিয়ে কোন্দল সংঘাতে গড়াচ্ছে

নওশাদ জামিল ও স্বপন চৌধুরী, রংপুর থেকে   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রার্থিতা নিয়ে কোন্দল সংঘাতে গড়াচ্ছে

রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ছোট ও শান্ত শহরটি ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ শহরে দিন দিন বাড়ছে জাতীয় পার্টির কোন্দল, বাড়ছে দলটির বড় দুই গ্রুপের রেষারেষি। কোন্দল ছড়িয়েছে সংঘাতে, সংঘর্ষে। ইতিমধ্যে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে জাপার দুই গ্রুপ কয়েকবারই সংঘাতে জড়িয়েছে।

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, উপনির্বাচন ঘিরে বড় ধরনের সংঘাত ও নাশকতার আশঙ্কাও রয়েছে। রংপুরের সচেতন নাগরিকরা অভিযোগ করে জানায়, রাজনৈতিক কোন্দল ও সংঘাতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন জাপার কেন্দ্রীয় নেতারাই। তাঁদের ইশারা ও ইন্ধনে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রংপুর।

উত্থান-পতনের পরও রংপুরের রাজনীতিতে বড় দল জাতীয় পার্টি। রংপুর-৩ আসন ২৮ বছর ধরেই জাপার দখলে রয়েছে। এ আসন থেকে নির্বাচন করে বারবারই জয়ী হয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তাঁর মৃত্যুর পর রংপুরের রাজনীতিতে দানা বাঁধছিল কোন্দল। চেয়ারম্যান পদ ও এরশাদের শূন্য আসনে উপনির্বাচন ঘিরে দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে জাপার নেতাকর্মীরা। এরশাদের শূন্য আসনে তাঁর ছেলে সাদ এরশাদকে মনোনয়ন দেওয়ার জল্পনাকল্পনায় গ্রুপিং আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শহরের নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে নানা অভিমত পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে গত সোমবার রাত ১০টার দিকে সংঘর্ষে জড়ায় জাপার নেতাকর্মীরা। গতকাল মঙ্গলবার সারা দিনও দেখা গেছে সংঘর্ষ ও সংঘাতের রেশ। গতকাল দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে সাদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। স্থানীয় বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এতে সংঘাত ও সংঘর্ষ আরো বাড়তে পারে।

জানা যায়, গত সোমবার রাত ১০টায় রংপুর সদরের পালিচড়া বাজারে জাতীয় পার্টির দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় এরশাদপুত্র সাদ এরশাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করে এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার সমর্থকরা। আসিফের অনুসারী ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি মতিন মিয়া ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রায়হানুর রহমান রায়হানের নেতৃত্বে সাদ এরশাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। এ সময় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ করলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। আসিফ শাহরিয়ারের এক সমর্থককে গণপিটুনি দেয় স্থানীয় লোকজন। দুই গ্রুপের খবর শহরে পৌঁছালে সেখানেও রাতভর উত্তেজনা দেখা যায়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংঘর্ষের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং সদর উপজেলা জাতীয় পার্টির সদস্যসচিব মাসুদার রহমান মিলন বলেন, ‘আসিফ শাহরিয়ারের সমর্থকরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’

সাদ এরশাদকে রংপুরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে জাতীয় পার্টির একাংশ গতকাল শহরেও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। রংপুর প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করেছে। সংঘর্ষের আশঙ্কা এড়াতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সরেজমিনে শহর ঘুরে দেখা যায়, নানা জায়গায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা গেছে। তাদের কথা, ‘আমরা রাজনীতি বুঝি না। যেদিকে লাঙল, সেদিকে আছি।’

এদিকে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঘোষণা দেন, সাদ এরশাদকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী চূড়ান্ত করলে তিনি তাঁর পক্ষে মাঠে থাকবেন না। তিনি বলেন, ‘রংপুরের এই আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ আসনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে। এটা তো ১৯৯১ বা ’৯৬-র প্রেক্ষাপট নয়। এখন যে কাউকে ধরে এনে প্রার্থী করা হলে তা দলের জন্য ক্ষতি ডেকে আনবে।’

মোস্তফা আরো বলেন, জননন্দিত, জনসমর্থিত, পরিচ্ছন্ন মানুষকে এরশাদের আসনে প্রার্থী ঘোষণা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় তিনজন প্রার্থী রয়েছেন, যাঁদের কমবেশি সবাই চেনে ও জানে। এঁদের কাউকে প্রার্থী করা হলে কোনো আপত্তি থাকবে না।’ স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, কেন্দ্রীয় জাপার যুগ্ম সম্পাদক ও মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির এবং কেন্দ্রীয় জাপার সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকের নাম উল্লেখ করেন তিনি।

এ সময় সাদ এরশাদের প্রার্থিতা চূড়ান্তের ইঙ্গিত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমিও তো আপনাদের মতো শুনেছি মাত্র। কিন্তু এখনো সাদকে চূড়ান্ত করা হয়নি বলে জানি। যদি সাদকে প্রার্থী করা হয়, তাহলে আমরা রংপুর জাতীয় পার্টি তার পক্ষে কাজ করব না।’ সাদ এরশাদের জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই দাবি করে সিটি মেয়র বলেন, ‘যারা তাঁকে প্রার্থী করতে মরিয়া, তাদেরই রংপুরে এসে মাঠে কাজ করতে হবে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সাদের সঙ্গে থাকবে না। আমি দলের নীতি-নির্ধারকদের কাছে আহ্বান করব এমন একজনকে প্রার্থী করা হোক, যাকে স্থানীয়ভাবে সবাই জানেন, চেনেন এবং ভোট দেবেন।’

আপনার বক্তব্য দলের গ্রুপিং ও সংঘাতে ইন্ধন জোগাচ্ছে কি না জানতে চাইলে মেয়র মোস্তফা বলেন, ‘জাতীয় পার্টির স্বার্থে আমি ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করেছি। এতে কাউকেই ইন্ধন জোগাচ্ছি না। ব্যক্তিগতভাবে আমি স্থানীয় নেতাকে এ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে চাইতেই পারি।’

স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, মনোনয়ন ও উপনির্বাচন ঘিরে বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে। আর রংপুরে সচেতন নাগরিকরা জানান, জাতীয় পার্টির ভেতরে-বাইরে গণতান্ত্রিক চর্চা না বাড়লে সংঘাত আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। জাপার  গ্রুপিংকেই তাঁরা সংঘাতের পেছনে মূল ইন্ধন হিসেবে অবহিত করেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগরের সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে বলি যে ‘রংপুরের জাতীয় পার্টির ভেতর-বাইরে কোনো গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যেও গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব রয়েছে। এরশাদ যত দিন জাপার চেয়ারম্যান ছিলেন, তত দিন তিনি ইচ্ছামতো দল পরিচালনা করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর দলে গ্রুপিং বেড়েছে। রংপুর ও ঢাকাকেন্দ্রিক গ্রুপিংয়ের শিকার হচ্ছে জাপার স্থানীয় নেতাকর্মীরা।’

রংপুরের পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘রংপুরে কিছুদিন আগে যোগ দিয়েছি। এখানের সব খবর রাখার চেষ্টার করছি। আমরা জানতে পেরেছি যে রংপুর শহরে ও আশপাশে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাত হয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে  মেট্রোপলিটন পুলিশ ভালো বলতে পারবে।’

মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (ডিবি) আলতাফ হোসেন বলেন, ‘উপনির্বাচন ঘিরে কিছু সংঘাতের আশঙ্কা তো রয়েছেই। আমাদের ধারণা মনোনয়ন দিলেই ক্ষেত্রবিশেষ কোন্দল ও সংঘাত কমে যেতে পারে। যদি তা বেড়ে যায়, আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, আমরা অবশ্যই নাশকতাকারীদের আইনের আওতায় আনব।’

প্রসঙ্গত, আগামী ৫ অক্টোবর এই আসনে উপনির্বাচন হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা