kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অবশেষে মুক্তি পেলেন মিন্নি

আমার বাড়িটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল এত দিন, আজ আবার আলোকিত হয়েছে : মিন্নির বাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অবশেষে মুক্তি পেলেন মিন্নি

৪৯ দিন হাজতবাসের পর শেষ পর্যন্ত জামিনে ছাড়া পেলেন মিন্নি। গতকাল বরগুনা জেলা কারাগারের সামনে থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্বামীকে কুপিয়ে হত্যার সময় জীবন বাজি রেখে লড়েছিলেন সন্ত্রাসীদের সঙ্গে। স্বামীর জীবন বাঁচাতে চিৎকার করে সবার সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কিন্তু আশপাশের কেউ এগিয়ে আসেনি। হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের হলো। তিনি ছিলেন একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। এরপর তাঁকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এই আসামি আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি শেষ পর্যন্ত জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মিন্নি কারাগার থেকে মুক্তি পান। বরগুনা কারগার থেকে বের হয়ে তিনি তাঁর বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের সঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্সে করে বাসায় ফেরেন।

মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম সাংবাদিকদের বলেন, মিন্নিকে দেওয়া হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আদেশের স্বাক্ষরিত কপি গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বরগুনার মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে এসে পৌঁছে। পরে মিন্নির পক্ষে জামিননামা দাখিলের অনুরোধ করা হয়। বিচারক জামিননামা গ্রহণ করে কারা কর্তৃপক্ষকে মুক্তির আদেশ পাঠান। সব দাপ্তরিক কাজ শেষে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে কারামুক্ত হন মিন্নি।

রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তাঁর স্ত্রী মিন্নিকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে করা রাষ্ট্রপক্ষের আপিল আবেদনের ওপর সোমবার শুনানি হয় চেম্বার জজ আদালতে। আদালত মিন্নির জামিন বহাল রাখেন। ফলে মিন্নির মুক্তিতে বাধা কাটে।

গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাতকে। এ নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনার মধ্যে ২ জুলাই এ হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

রিফাতের ওপর হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে দেখা যায়, দুই যুবক রামদা হাতে রিফাতকে একের পর এক আঘাত করে চলেছে। আর তাঁর স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি স্বামীকে বাঁচানোর জন্য হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। রক্তাক্ত অবস্থায় সন্ত্রাসীরা রিফাতকে ফেলে চলে যায়। এরপর ওই দিন বিকেলে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে মামলায় প্রধান সাক্ষী করা হয়। পুলিশের সিসিটিভি ফুটেজ কেটেছেঁটে গণমাধ্যমে প্রকাশের পর একটি পক্ষ মিন্নির দিকে অভিযোগের আঙুল তোলে। মিন্নির শ্বশুরই পরে হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন। এরপর ১৬ জুলাই মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ লাইনসে ডেকে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরে সেদিন রাতে তাঁকে রিফাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান। কিন্তু মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী সেদিন আদালতে দাঁড়াননি, যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। পাঁচ দিনের রিমান্ডের তৃতীয় দিনেই মিন্নিকে আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিন্নি বিচারকের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার আগের দিনই পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, মিন্নি হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং হত্যা পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন মিন্নি।

তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের অভিযোগ, ‘নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে’ মিন্নিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের হাত আছে বলেও তাঁর দাবি।

মিন্নির আইনজীবীরা গত ২১ জুলাই বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে তাঁর জামিনের আবেদন করলে আদালত তা খারিজ করে দেন। মিন্নিকে ওই দিন আদালতে হাজির করার আবেদন করা হলেও সে আবেদনও খারিজ করে দেন আদালত। এরপর ৩০ জুলাই বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিন্নির জামিনের আবেদন খারিজ করা হয়। এ অবস্থায় গত ৫ আগস্ট হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়। তবে ৮ আগস্ট শুনানির পর জামিন আবেদন খারিজ করে দিলে মিন্নির আইনজীবীরা আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। এরপর আবার হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা হলে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ গত ২০ আগস্ট মিন্নিকে কেন জামিন দেওয়া হবে না জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। রুলের ওপর পরবর্তী শুনানির জন্য ২৮ আগস্ট দিন রাখেন। হাইকোর্টের একই বেঞ্চ গত বৃহস্পতিবার আদেশ দেন। আদালত গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার শর্তে মিন্নির জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনের ওই রায় স্থগিতের জন্য রবিবার আপিল বিভাগে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। একই দিন বরগুনার পুলিশ মিন্নিসহ ২৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।

মিন্নির জামিন স্থগিতের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ যে আবেদন করেছিল, সোমবার তার ওপর শুনানি হয়। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর চেম্বার আদালত ‘নো অর্ডার’ দিয়েছেন অর্থাৎ মিন্নির জামিন বহাল রেখেছেন।

প্রায় দেড় মাসের মাথায় গতকাল বিকেলে বাবার জিম্মায় জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বাড়িতে ফেরেন মিন্নি। বিকেল ৫টার দিকে মিন্নিকে বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্স বাড়ির দরজায় পৌঁছলে সেখানে স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করে। উত্সুক সাধারণ মানুষকেও দলে দলে মিন্নিদের বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখা যায়। মিন্নির কারামুক্তি উপলক্ষে আসা লোকজনের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়।

বাড়িতে প্রবেশের পরপরই প্রথমে মায়ের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। মা-মেয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে স্বজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন মিন্নি। জামিনের শর্ত মেনে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। তবে স্বজনদের অনেকে বলেছেন, মিন্নিকে অন্যায়ভাবে সাক্ষী থেকে আসামি করা হয়েছে। জামিনে মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা ন্যায় বিচার পেয়েছেন।

আবেগাপ্লুত মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, ‘আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে মিন্নি আজ (গতকাল) কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে ন্যায়বিচার পেয়েছি। আমার বাড়িটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল এত দিন। আজ মনে হয় আমার বাড়ি আবার আলোকিত হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার মেয়েকে অন্যায়ভাবে অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে। মিন্নি যাতে মামলা থেকে অব্যাহতি পায় সে জন্য আমি ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা