kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জিপি-বিটিআরসি দ্বন্দ্বে অস্থির পুঁজিবাজার

বড়দের ডামাডোলে অসহায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী

রফিকুল ইসলাম   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বড়দের ডামাডোলে অসহায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী

‘রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন।’ দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থা অনেকটা রোমান সম্রাট নিরোকে নিয়ে এই প্রবাদের মতো। ক্রমাগত দরপতনে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যখন দিশাহারা, তখন পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কারোরই কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়ছে না। ‘আতঙ্কে’ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা হাতে থাকা শেয়ার ছেড়ে দিলেও বড় বিনিয়োগকারীরা হাত গুটিয়ে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। কেউ কেউ পোর্টফোলিও ঠিক রাখতে সামান্য কিনলেও বড় অংশই নিষ্ক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর হাতে ছোট ছোট ফান্ড থাকে। শেয়ার কেনার পর সামান্য মুনাফা এলেই বিক্রি করে দেয়। বড় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে বড় বিনিয়োগ করে। সাধারণত বড় বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু বর্তমানে তারাও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর মতো আচরণ করছে। বাজারে উত্থান-পতন স্বাভাবিক ঘটনা হলেও ২০১০ সালে ধসের পর পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারীরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। তবে সে আশা যেন নিরাশায় পরিণত হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর মন্দাবস্থার মধ্যে পড়েছে পুঁজিবাজার।

একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, পুঁজিবাজারের প্রাইম রেগুলেটর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আর প্রাইমারি রেগুলেটর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। তবে সম্প্রতি দাবি-দাওয়া আদায় ও নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন নিয়ে দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে টানাপড়েন সৃষ্টির পর তা গড়িয়েছে দ্বন্দ্বে। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের স্টক ডিলার ও ব্রোকারদের একটি বড় অংশ নিষ্ক্রিয় রয়েছে। কেউ কেউ আবার সামান্য শেয়ার কেনাবেচা করে পোর্টফোলিও ঠিক রাখছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দায়ী করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বাছবিচারহীনভাবে দুর্বল কম্পানি পুঁজিবাজারে আসায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার থেকে মূলধন উত্তোলন করে বেরিয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, বেশ কিছু কারণে পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, নন-ব্যাংকিং আর্থিক খাতের একটি কম্পানির অবসায়ন, বড় মূলধনী কম্পানি গ্রামীণফোনের সঙ্গে সরকারের টানাপড়েন ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া ১৫০ কোটি টাকা মূলধন উত্তোলনে এক কম্পানির চাঁদা গ্রহণে মূলধন বের হওয়ায় বিক্রি বেড়েছে বলে জানায় তারা।

সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক পুঁজিবাজারে দরপতনে বড় ভূমিকা রেখেছে বড় মূলধনী কম্পানি গ্রামীণফোন। মূলত বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে বকেয়া আদায় নিয়ে কম্পানিটির দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। বকেয়া আদায় নিয়ে কঠোর অবস্থান নিতে গিয়ে গ্রামীণফোনের লাইসেন্স বাতিলের পথেও হাঁটছে সরকার।

গত এপ্রিল থেকে কম্পানিটির শেয়ার বিক্রি বেড়ে গেছে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত গ্রামীণফোনের শেয়ারপ্রতি দাম কমেছে ১১৪ টাকা। প্রতি এক টাকা কমলে মূল্যসূচক ০.৬ শতাংশ হ্রাস পায়। এতে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম কমেছে ১৫ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বড় মূলধনী কম্পানি গ্রামীণফোনের সঙ্গে বকেয়া আদায় নিয়ে জটিলতায় পুঁজিবাজারে বড় প্রভাব পড়ছে। বাজার নিম্নমুখী হওয়ার মতো এখন কোনো কারণ নেই। ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকটের প্রভাবও রয়েছে কিছুটা। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটকেও পুঁজিবাজারের দুরবস্থার জন্য দায়ী করছেন কেউ কেউ। তাঁরা বলছেন, পুঁজিবাজারের বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ব্যাংকের অর্থ নিয়ে বিনিয়োগ করে। কিন্তু তারল্য সংকটে থাকায় ব্যাংক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য নতুন করে অর্থ দিচ্ছে না। ফলে বিনিয়োগের ইচ্ছা থাকলেও ফ্রেশ ফান্ড না থাকায় বাজারে সক্রিয় হতে পারছে না।

এমটিবি কাপিটাল ম্যানেজমেন্টের সিইও খায়রুল বাশার আবু তাহের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট থাকায় নতুন করে বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না। বাজার নিম্নমুখী হওয়ায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার মূলধন পাওয়া যাচ্ছে না। আর পোর্টফোলিওতে যে বিনিয়োগ রয়েছে, সেগুলো বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিচ্ছে কেউ কেউ। ফান্ড সরবরাহ না বাড়লে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে না।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা