kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আসামে চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা থেকে বাদ ১৯ লাখ মানুষ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আসামে চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা থেকে বাদ ১৯ লাখ মানুষ

লাখ লাখ মানুষকে চরম উৎকণ্ঠায় রেখে অবশেষে ভারতের আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা থেকে ১৯ লাখ আসামবাসী বাদ পড়েছে। গত বছর প্রকাশ করা খসড়া তালিকায় ৪১ আসামবাসী বাদ পড়লেও চূড়ান্ত তালিকায় তাদের ২২ লাখই স্থান পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাদ পড়াদের বেশির ভাগই হিন্দু, যার সংখ্যা ১০ থেকে ১২ লাখ হতে পারে। স্থানীয় গোর্কা জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের এক লাখ মানুষ তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। চূড়ান্ত তালিকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ এবং তাদের বেশির ভাগই হিন্দু হওয়ায় এই তালিকা নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে আসামে ক্ষমতাসীন বিজেপি। দলটির রাজ্য নেতারা এ তালিকা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

গতকাল শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিয়োজিত এনআরসি কর্তৃপক্ষের রাজ্য সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলা আনুষ্ঠানিকভাবে এই তালিকা প্রকাশ করেন। এরপর এনআরসির ওয়েবসাইটে তালিকাটি প্রকাশ করা হয়। একই সময় তা আঞ্চলিক এনআরসি সেবাকেন্দ্রেও প্রকাশ করা হয়।

আসাম রাজ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, চূড়ান্ত তালিকায় আসামের নাগরিক হিসেবে তিন কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার চারজনের আবেদন গৃহীত হয়েছে। আর বাদ পড়েছে ১৯ লাখ ছয় হাজার ৬৫৭ জন।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন আসাম রাজ্য সরকার জানিয়েছে, তালিকায় নাম না থাকলেও এখনই বাদ পড়াদের বিদেশি বলে চিহ্নিত কিংবা বন্দিশিবিরে নেওয়া হবে না। তালিকায় যাদের নাম নেই, তারা ১২০ দিনের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য স্থাপিত বিশেষ আদালত ‘বিদেশি ট্রাইব্যুনালে’ আবেদন করতে পারবে। এই বিষয়ে শুনানির জন্য এরই মধ্যে ১০০ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে। আরো ২০০টি ট্রাইব্যুনাল সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে স্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজ্যজুড়ে এক হাজার বিদেশি ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করার কথা জানিয়েছে সরকার। ট্রাইব্যুনালেও আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারে কেউ বাদ পড়লেই শুধু তাকে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করা হবে।

তালিকা প্রকাশের পর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে—এমন আশঙ্কা করে গোটা আসামকে নিরাপত্তার বলয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে। রাজ্যজুড়ে ৬০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

গতকাল এনআরসি তালিকা প্রকাশের আগে থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থানীয় এনআরসি সেবাকেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমায়।

আসামে প্রথম এনআরসি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫১ সালে। তবে প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ অবৈধভাবে আসামে বসবাস করছে দাবি তুলে আশির দশকে আসামে ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর সরকার অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সঙ্গে আসাম চুক্তি নামে একটি চুক্তি করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজ্যে এনআরসির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০১৫ সালে শুরু হয় এনআরসি তৈরির কাজ এবং ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই প্রকাশ করা হয় খসড়া তালিকা, যাতে ৪১ লাখ আসামবাসী বাদ  পড়েছিল। চার বছর ধরে তালিকা প্রণয়নের পর চূড়ান্তভাবে বাদ পড়ল ১৯ লাখ মানুষ।

নাগরিক তালিকায় ঠাঁই পেতে হলে বাসিন্দাদের প্রমাণ করতে হয়, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে রাজ্যে আবাস গেড়েছে। ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তিতে এই শর্তের কথা উল্লেখ ছিল।

সংখ্যা কমায় তালিকা প্রত্যাখ্যান অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের :  এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (আসু)। এ সংগঠনটির দাবিতেই এনআরসির উদ্যোগ নেয় ভারত সরকার। তালিকাটিকে ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লুরিনজ্যোতি গগৈ বলেন, এটি অসম্পূর্ণ এনআরসি হয়েছে। বাদ পড়ার সংখ্যা অপ্রত্যাশিত, অনেক কম হয়েছে।

অর্ধসন্তুষ্ট এআইইউডিএফ : অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) বলেছে, তারা এনআরসি নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। গতকাল গুয়াহাটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এআইইউডিএফের সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রকৃতপক্ষে সরকার ‘বিদেশি সমস্যা’ নিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থের কথাই ভেবেছে।

তরুণ গগৈ বললেন, কেন্দ্র প্রতারণা করেছে কেন্দ্র : গতকাল তালিকা প্রকাশের পর রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এনআরসি যে প্রক্রিয়ায় তালিকা প্রকাশ করে তাতে অখুশি আমি। অনেক ভারতীয়র নাম বাদ পড়েছে।’ তিনি বলেন, অনেক বিদেশির নামও নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে এ নিয়ে সমস্যা আরো বাড়বে।

বিজেপিকে শিক্ষা নিতে বলল ইত্তেহাদুল মুসলেমিন : এনআরসি নিয়ে কেন্দ্রের কড়া সমালোচনা করেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলেমিন প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসাম দেখে শিক্ষা নিক বিজেপি। অনুপ্রবেশকারীর জিগির তুলে যে রাজনীতি বিজেপি করতে চেয়েছিল তার আসল চেহারা বেরিয়ে পড়েছে। তাই হিন্দু মুসলিম এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দেশজুড়ে নাগরিক তালিকা তৈরির চেষ্টা বন্ধ করা উচিত বিজেপির।

জকিগঞ্জ সীমান্তে সতর্ক বিজিবি

জকিগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, ভারতের আসামে এনআরসি প্রকাশের পর সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ ছাড়া জনসাধারণকে সতর্ক থাকতে মসজিদে মসজিদে প্রচার করা হয়েছে বিষয়টি।

নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়া ভারতীয়রা যাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে, তাই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সিলেটের অন্যান্য সীমান্তে সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্ক থাকলেও জকিগঞ্জের সঙ্গে আসামের সংযোগ থাকায় এ সীমান্তে নজরদারি সবচেয়ে বেশি বাড়িয়েছে বিজিবি। বিজিবি জকিগঞ্জ ক্যাম্পের কমান্ডার নায়েক সুবেদার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সীমান্তে সতর্ক থাকতে নির্দেশনা পেয়েছি। শুক্রবার বিষয়টি জকিগঞ্জ সীমান্তের মসজিদে মসজিদে প্রচার করা হয়েছে।’

বিজিবির ১৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সাঈদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসাম ইস্যুতে শঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু দেখছি না।  আমাদের সীমান্তে ওই রকমভাবে নিরাপত্তা জোরদার করার কোনো নির্দেশনা আসেনি কিংবা অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়নি। তবে আমরা যেকোনো অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি।’  সূত্র : যুগশঙ্খ (আসাম), এনডিটিভি, আনন্দবাজার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা