kalerkantho

হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়াশিল্প স্থানান্তরে সরকার ব্যয় করছে এক হাজার ৭৮ কোটি টাকা

আরো সুবিধা চান ট্যানারি মালিকরা

জিয়াদুল ইসলাম   

৩১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আরো সুবিধা চান ট্যানারি মালিকরা

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়াশিল্প স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক সুবিধা আদায় করছেন ট্যানারি মালিকরা। এবার এ খাতে বিদ্যমান সব খেলাপি ঋণ ব্লক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর, দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৬ বছরের জন্য ঋণ পুনঃ তফসিল সুবিধা, ঋণের সুদহার ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ঋণের সুদ মওকুফ এবং এ পর্যন্ত অনারোপিত, স্থগিত ও দণ্ড সুদ সম্পূর্ণ মওকুফ করার দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া রপ্তানিতে বিদ্যমান আর্থিক প্রণোদনা পাঁচ বছরের জন্য বহাল রাখারও দাবি তাঁদের। গত এপ্রিলে অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব দাবি জানিয়েছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)।

জানা যায়, ২০০৮ এবং ২০১৪ সালেও প্রায় একই রকম সুবিধা আদায় করেছিলেন ট্যানারি মালিকরা। শুধু ব্যাংকঋণ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানই নয়, সাভারে চামড়া শিল্প নগরী নির্মাণ প্রকল্পের পুরো ব্যয়ই বহন করছে সরকার। ১৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় এখন বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবকাঠামো ও মেশিনারিজ স্থাপনে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে তাঁদের ২৬০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। শিল্পনগরীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপনের

ব্যয় বাবদ ৬৪০ কোটি টাকাও দিচ্ছে সরকার, যা ট্যানারি মালিকদের দেওয়ার কথা ছিল। আবার হাজারীবাগের তুলনায় সাভারে ট্যানারি মালিকদের কয়েক গুণ বেশি জমি দিয়ে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয় চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে এ খাত ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা পেয়ে আসছে। এ ছাড়া নিজস্ব ইটিপিতে উৎপাদিত ক্রাস্ট ও ফিনিশড লেদার রপ্তানির বিপরীতে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা পেয়ে আসছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাভারে চামড়া শিল্প নগরী স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ এ দুই অর্থবছর সবচেয়ে খারাপ সময় গেছে ট্যানারি মালিকদের। কারণ ওই সময় বেশির ভাগ ট্যানারি কোনো ব্যবসা করতে পারেনি। ফলে ব্যাংকের ঋণও খেলাপি হয়ে গেছে। তাই এ দুই বছরের ঋণের সুদ মওকুফের দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৬ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ চেয়েছি আমরা। এই সুবিধা দেওয়া হলে চামড়া শিল্প খাত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।’

২০১৪ সালেও চামড়া খাতে এ ধরনের সুবিধা দিয়ে সার্কুলার জারি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময় এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ আট বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই সুবিধার মেয়াদ শেষ না হতেই আবার সুবিধা চাচ্ছেন কেন জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ওই সময় এ ধরনের সুবিধার প্রয়োজন হয়নি। কারণ তখন বেশির ভাগ ঋণই নিয়মিত ছিল।

জানা গেছে, ট্যানারি মালিকদের প্রস্তাবের বিষয়ে গত মে মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ট্যানারি কারখানা তাত্ক্ষণিকভাবে হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তরিত হওয়ায় ট্যানারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকঋণ সংক্রান্ত সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে চামড়া খাতে মোট আর্থিক সংশ্লেষসহ মতামত দিতে আপনাদের অনুরোধ করা হলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, এ বিষয়ে শিগগিরই অর্থ মন্ত্রণালয়ে মতামত পাঠানো হবে। এতে ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো কোন ব্যাংক থেকে কত টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে এবং গৃহীত ঋণের বর্তমান অবস্থা কী, তাও তুলে ধরবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পরই চামড়া খাতে অর্থায়ন করা ব্যাংকগুলোর মতামত নেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ ব্যাংকই জানিয়েছে, এ শিল্প খাতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণ পরিশোধের জন্য পুনরায় ব্লক ও দীর্ঘ মেয়াদে পুনঃ তফসিল সুবিধা প্রদান করা হলে ব্যাংকগুলোর ব্যয় ও তারল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সেই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমার বদলে আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটি মেনে নেবে ব্যাংকগুলো।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্প সাভারে স্থানান্তরের বিষয়ে সৃষ্ট ব্যাংকঋণ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে ২০০৮ সালেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেশ কিছু সুবিধা দিতে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর ২০১৪ সালে প্রায় একই রকমের সুবিধা দিয়ে নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, যেসব ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর পর্যায়ে রয়েছে বা স্থানান্তর হয়ে গেছে, সেগুলোর অনিয়মিত ঋণ ব্লক হিসাবে স্থানান্তর, গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা প্রদান ও ঋণের জন্য নমনীয় পরিশোধ সূচি নিরূপণ করা যাবে। ব্লক হিসাবে স্থানান্তরিত ঋণের জন্য এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ আট বছর পরিশোধ সময়কাল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে। এ ধরনের ঋণের প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অনারোপিত সুদ, স্থগিত সুদ খাতে রক্ষিত সুদ ও দণ্ড সুদ সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফ করা যাবে। সূত্র বলছে, ওই সময় অনেক ট্যানারি মালিকই এ সুবিধা নিয়েছেন; কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো এ খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েইে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত এ খাতে বিতরণ করা ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই এখন খেলাপি। অথচ এই ঋণের বেশির ভাগই বিশেষ সুবিধায় মাত্র ৭ শতাংশ সুদে বিতরণ করা হয়েছে।

 

মন্তব্য