kalerkantho

আজ আন্তর্জাতিক গুম দিবস

অনিশ্চয়তা কুরে কুরে খায় স্বজনদের

আসকের হিসাবে গত ৬ বছরে নিখোঁজ ২০৫ জন, স্বাধীন তদন্ত কমিশন দাবি

এস এম আজাদ   

৩০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অনিশ্চয়তা কুরে কুরে খায় স্বজনদের

সন্তানের অপেকক্ষায় চুয়াডাঙ্গার বজলুর মা।

যশোরের শংকরপুর এলাকার গাড়িচালক শাওন মির্জা (১৮) ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল বন্ধু সাইদুর রহমান সাইদের সঙ্গে স্থানীয় পার্কে বেড়াতে যান। এরপর তাঁর স্বজনরা খবর পায় সাইদসহ তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। স্বজনরা ছুটে যায় থানায়, খোঁজ নেয় ডিবি অফিসেও। কোথাও শাওনের সন্ধান মেলেনি। কেটে গেছে ২৭ মাস। শাওন ও সাইদের স্বজনের মতো অন্ধকারে ডুবে আছে ২০৫ নিখোঁজের পরিবার। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, এ মানুষগুলো নিখোঁজ হয়েছে গত ছয় বছরে।

এমন পরিস্থিতিতে আজ ৩০ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম দিবস। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম হওয়া থেকে সবার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সনদ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। এর ফলে গুম হওয়া থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারটি আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয় এবং কাউকে গুম করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃতি পায়। ২০১১ সাল থেকে প্রতিবছর ৩০ আগস্ট গুম হওয়া মানুষগুলোকে স্মরণ এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য দিবসটি পালন করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। সনদ অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির কোনো প্রকার হদিস না পাওয়া গেলে এবং সরকার, প্রশাসন বা প্রভাবশালীরা হত্যা করে মৃতদেহ লুকিয়ে ফেললে সেটি গুম বলে বিবেচিত হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে গুম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। গুমের অভিযোগের বিষয়টি দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনেও স্থান পেয়েছে। গুমের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য চেয়ে ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারকে অন্তত ১০ দফা চিঠি ও তাগিদ পাঠিয়েছে গুমবিষয়ক জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নয়। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা বা গুরুতর অভিযোগও নেই। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে গভীর সংকটে আছে অনেক পরিবার।

মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নিখোঁজের ঘটনাগুলো তদন্ত করে রহস্য উন্মোচন না করায় আইনের শাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

যশোরে নিখোঁজ হওয়া শাওনের বড় ভাই ফয়সাল মির্জা কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সবাই বলে পুলিশই নিয়া গেছে। আমার ভাইটা কমিশনারের গাড়ি চালাইত। বন্ধুর জন্যই হয়তো পুলিশ তারে খাইছে! জেলের কোথাও পাইলাম না। রূপসা নদীতে ফেলে দিল কি না, তা-ও জানি না! বেঁচে থাকলে তো পাইতাম...।’

ফয়সাল জানালেন, সাইদের মা হীরা খাতুন পুলিশের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছিলেন। শেষে তিনি চাপে পড়ে মামলাটি তুলে নেন। তাঁরা ভয়ে আছেন। কাপড়ের ব্যবসায়ী ফয়সালও ভয়ে কারো বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাচ্ছেন না।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিখোঁজ কারো কারো বিরুদ্ধে মামলা ছিল, পরে তাদের অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তাদের অনেকেই স্বেচ্ছায় পালিয়ে আছে বলা যায়। মামলা বা জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হলে পুলিশ সেটির তদন্ত করছে।’

আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত ৩৪৪ জন নিখোঁজ হয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্বজনরা অভিযোগ তুলেছে। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে ৪৪ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। ৬০ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৩৫ জন ফিরে এসেছে। এ হিসাবে গত ছয় বছরে নিখোঁজ রয়েছে ২০৫ জন।

আসকের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে নিখোঁজ হয়েছে ৩৪ জন। এর মধ্যে দুজন ফেরত এসেছে। ১৭ জনকে পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকি ১৫ জনের এখনো হদিস নেই। চলতি বছরের সাত মাসে (জুলাই পর্যন্ত) নিখোঁজ হয়েছে ১০ জন। তাদের মধ্যে দুজন ফেরত আসে এবং একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বাকি সাতজন এখনো নিখোঁজ। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছাড়াও ছাত্র, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, দোকানদার, গাড়িচালক, চিকিৎসক ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী রয়েছেন।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোর প্রতিটিতেই গুমের অভিযোগ স্থান পেয়েছে। ২০১৮ সালে ২৫টি নিখোঁজ/গুমের অভিযোগের তথ্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ২০১৭ সালে ২২টি ঘটনা চিহ্নিত করেছে। ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে ১১টি গুমের অভিযোগ স্থান পেয়েছে। ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে একটি রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রের গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনা স্থান পায়। ২০১৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ১৪টি গুমের তথ্য ছিল। ২০১২ সালের প্রতিবেদনে বল প্রয়োগের মাধ্যমে ২০টি নিখোঁজ এবং ২০১১ সালে আটটি গুমের অভিযোগ কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির উপদেষ্টা ও আসকের সাবেক প্রধান নির্বাহী নূর খান লিটন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুমের শিকার পরিবারগুলো বলছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জড়িত। এদের কেউ ফিরছে, কেউ গ্রেপ্তার, আর কেউ ফিরছে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এসবের প্রতিকার হচ্ছে না। আমি মনে করি, স্বাধীন কমিশন গঠন করে ঘটনাগুলোর তদন্ত করা দরকার।’

আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, ‘গুমের প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রে সুদূরপ্রসারী। রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরাগভাজন তথা নিখোঁজ হওয়ার ভয়ে মানুষ মুক্তবুদ্ধির চর্চা, মত প্রকাশ কিংবা সরকারের বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কর্মকাণ্ডের যেকোনো ধরনের সমালোচনা করা থেকে নিজেদের বিরত রাখে, যা প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সুশাসনের বিকাশ ব্যাহত করে।’ তিনি আরো বলেন, ‘গুমের ঘটনা প্রতিরোধে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের জন্য আসক সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছে। পাশাপাশি গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ স্বাক্ষর করে গুম প্রতিরোধে সরকারের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।’

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ও অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, ‘গুমের ঘটনাগুলো বছরের পর বছর অমীমাংসিত থাকছে। এগুলোর সুরাহা হওয়া জরুরি। তা না হলে সমাজের অপরাধ পরিস্থিতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

মন্তব্য