kalerkantho

ফের ঝুলে গেল প্রত্যাবাসন

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফের ঝুলে গেল প্রত্যাবাসন

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে দুই দফা উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর দৃশ্যত পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঝুলে গেছে। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল রবিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রত্যাবাসন শুরু করতে ব্যর্থতার দায় নাকচ করে বলেছে, প্রত্যাবাসনে উদ্বুদ্ধ ও রাজি করানোর দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি হচ্ছে না।

বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশ একই সঙ্গে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমারের সমাজে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনার আহ্বান জানায়।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটির মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর গতকাল বাংলাদেশ ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছে বলে মিয়ানমারের অব্যাহত দাবি এবং তাদের ফিরিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ করতে গত ২৭ ও ২৮ জুলাই কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ গত ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন শুরুর কাজে সহায়তা করতে সম্মত হয়েছিল। স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার নীতির প্রতি অঙ্গীকারের আলোকে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের এ যাবৎ যাচাই করা তিন হাজার ৪৫০ জন ব্যক্তি বর্তমান প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যেতে আগ্রহী কি না যাচাই করতে তাদের তালিকা গত ৮ আগস্ট ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের মাধ্যমে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর) প্রদান করে। বাংলাদেশ সরকার স্বেচ্ছায় উত্তর রাখাইন রাজ্যে ফিরতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য নিরাপত্তা ও অন্যান্য ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিশ্চিত করেছিল।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘তালিকায় থাকা তিন হাজার ৪৫০ রোহিঙ্গার মধ্যে গত ২২ আগস্ট পর্যন্ত ইউএনএইচসিআর ৩৩৯টি পরিবারের এক হাজার ২৭৬ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ায় মিয়ানমার সরকারের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত ও প্রাপ্ত সব তথ্য ওই পরিবারগুলোকে জানানো হয়েছে। ওই ব্যক্তিরা যাতে স্বাধীনভাবে তাদের মনোভাব জানাতে পারে সে জন্য নিরাপত্তাসহ পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি পরিবারও বর্তমান প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হয়নি। কারণ তারা মনে করে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সার্বিক পরিবেশ তাদের ফেরার জন্য এখনো অনুকূল নয়।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সাক্ষাৎকার দেওয়া রোহিঙ্গা পরিবারগুলো রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। এ ছাড়া প্রায় সব পরিবার মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব, চলাফেরার অধিকার, ভূমি ব্যবহারের অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে। তবে সাক্ষাৎকার দেওয়া সব পরিবার বলেছে, তাদের উদ্বেগগুলো মিয়ানমার যৌক্তিকভাবে সমাধান করার পর তারা ফিরতে আগ্রহী। বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতিসহ পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে গত ২১ ও ২২ আগস্ট ঢাকায় চীন ও মিয়ানমার দূতাবাসের কূটনীতিকদের কক্সবাজারে উপস্থিত থাকার বিষয়টিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ বলেছে, গত মাসে কক্সবাজারে মিয়ানমার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে রোহিঙ্গারা তাদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা এবং প্রত্যাবাসন ও সমাজে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতির দাবি জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে মিয়ানমার প্রতিনিধিদলও নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তাসহ মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছার লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে তাদের ফেরার জন্য নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অধিকার বিষয়ে অগ্রগতির কোনো তথ্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দিতে না পারায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, প্রত্যাবাসনবিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের ফিরে যেতে উৎসাহিত করার দায়িত্ব পুরোপুরি মিয়ানমারের। দৃঢ় উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে রাখাইন রাজ্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং মাঠপর্যায়ের সঠিক তথ্য দেওয়াসহ যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের আস্থা-বিশ্বাসের ঘাটতি কমানোর দায়িত্বও মিয়ানমারের। তাই রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে আগ্রহী না হওয়া মিয়ানমারেরই ব্যর্থতা।

বাংলাদেশ বলেছে, আনান কমিশনের সুপারিশ এবং প্রত্যাবাসন চুক্তির আলোকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমার সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সম্ভাব্য সব উপায়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ফিরতে উৎসাহিত করা অবশ্যই মিয়ানমারের দায়িত্ব। মিয়ানমার সরকারের অপ্রমাণসিদ্ধ দাবি প্রত্যাবাসনে ভূমিকা রাখছে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী কাউকেই বাধা না দেওয়ার নীতি বাংলাদেশ সরকার অনুসরণ করছে। দীর্ঘ দিনের এ সংকটের পূর্ণ দায় মিয়ানমারের। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টায় মিয়ানমারকে অসহযোগিতার অভিযোগ ভিত্তিহীন, অসৎ উদ্দেশ্যপূর্ণ ও পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ সরকার এই সংকটের টেকসই সমাধানে অঙ্গীকার ও বাধ্যবাধকতা পূরণে  পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে মিয়ানমার সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে।

 

মন্তব্য