kalerkantho

ডেঙ্গু : ১৬৯ জনের মৃত্যুর তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে

আরো ৩ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ১২৯৯

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডেঙ্গু : ১৬৯ জনের মৃত্যুর তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে

গত পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রাহাত। গতকাল শিশুকন্যা বাবাকে পেয়ে খেলায় মেতে ওঠে। ছবিটি রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাসপাতালগুলোর হিসাবের গরমিল সংশোধন শেষে গতকাল রবিবার সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুসংশ্লিষ্ট কারণে মোট ১৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সভাকক্ষে আয়োজিত এক প্রেসি ব্রিফিংয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এ তথ্য দেন। এ সময় তিনি জানান, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সরকারি-বেসরকারি মোট ৫৫টি হাসপাতাল থেকে ১৬৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত ৮০ জনের তথ্য পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭ জনের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ৩৩ জনের মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু নয়। অন্য ৮৯ জন মৃতের তথ্য এখনো পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এগুলোর পর্যালোচনার ফলাফল জানানো হবে।

এ সময় ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘আমাদের কাছে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে বলে যে প্রাথমিক তথ্য এসেছে, সেগুলোর মধ্যে কারো কারো মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে ডেঙ্গুতে হয়নি। তাদের মৃত্যু অন্য কী কারণে হয়েছে সেটাও পরবর্তীতে আমরা পর্যালোচনা করে বের করার চেষ্টা করব।’

ব্রিফিংয়ে একই রোগী একাধিক হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেওয়ার কারণে হাসপাতালে ভর্তীকৃত ও ছাড়পত্র নেওয়া রোগীর সংখ্যা বেশি হয়ে যাচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নে ড. ফ্লোরা বলেন, ‘সেটা হচ্ছে এবং হতেই পারে। তবে এই মুহূর্তে ঠিক কতজন রোগী এমনভাবে বেশি হিসাব করা হচ্ছে, সেটা বের করা মুশকিল। আমরা পরে হয়তো সেগুলোও খতিয়ে দেখতে পারব। এ ছাড়া বাড়িতে থাকা রোগীদের হিসাবও আমাদের কাছে নেই। তাই একই রোগী একাধিক হাসপাতালে ভর্তির ফলে যে অতিরিক্ত হিসাব আসছে তার সঙ্গে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়ার রোগীর সংখ্যার সমন্বয় করা হয়েছে। আমরা এই সংখ্যাকেই হাসপাতালে ভর্তীকৃত মোট রোগীর সংখ্যা হিসেবে ধরে নিচ্ছি।’

ব্রিফিংয়ে জানানো তথ্য অনুসারে মৃত ১৬৯ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকার রোগী। ঢাকার ২৯টি বেসরকারি হাসপাতালে মারা গেছে ৭৮ জন, ১২টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে মারা গেছে ৫৯ জন, ঢাকার বাইরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মারা গেছে ৩২ জন। আর এককভাবে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ২৩ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এর পরই ১৫ জন মারা গেছে মুগদা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং ১০ জন ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও স্কয়ার হাসপাতালে। তবে এ পর্যন্ত আইইডিসিআরের পর্যালোচনায় যে ৪৭ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুতেই হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে স্কয়ার হাসপাতালে। এর পরই ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইউনাইটেড হাসপাতালে চারজন করে এবং অন্যগুলোর কোথাও তিন জন, কোথাও দুজন বা কোথাও একজন করে মারা গেছে। তবে নিশ্চিত হওয়া ৪৭ জনের মধ্যে ৩৬ জনই মারা গেছে ঢাকার ১৫টি বেসরকারি হাসপাতালে। বাকি ১১ জন মারা গেছে চারটি সরকারি হাসপাতালে। এদিকে আগের হিসাব হালনাগাদ করার পরও গতকাল দেওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে কোনো কোনো হাসপাতালে মৃতের সংখ্যা কম দেখা গেছে। আর ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তীকৃত রোগীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৫১৪, ছাড়পত্র নিয়েছে ৫৭ হাজার ৪০৫ জন ও হাসপাতালে ভর্তি আছে পাঁচ হাজার ৯৪০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা) ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনই বিভিন্ন হাসপাতাল পর্যবেক্ষণ করছি, যাতে রোগী বাড়লে-কমলেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি না হয়।’

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাই নয়, এর সঙ্গে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে চলছি; যাতে মানুষ এডিস মশা থেকে যেমন সতর্ক থাকে, তেমনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে যাতে হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা পায়।’

২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ১২৯৯, কোথাও বাড়ছে—কোথাও কমছে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ্ ইমারজেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ২৯৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। এর মধ্যে ঢাকার ১২টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে ৪২৯ জন, ঢাকার ২৯টি বেসরকারি হাসপাতালে ১৭৮ জন এবং ঢাকার বাইরে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৯২ জন। আর ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৯৯ জন, যা আগের দিনে ছিল ৮৫ জন; মিটফোর্ড হাসপাতালে ৯৪ জন, যা আগের দিন ছিল ৫৪ জন; মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫৭ জন, যা আগের দিন ছিল ৬৫ জন; শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪৫ জন, যা আগের দিন ছিল ৪৮ জন; রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে আটজন, আগের দিনে যা ছিল ১২ জন; কুর্মিটোলা হাসপাতালে ৬০ জন, যা আগের দিন ছিল ৩০ জন উল্লেখযোগ্য। একই সময়ের মধ্যে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে যাথারীতি আগের মতোই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫৪ জন, আগের দিন যা ছিল ৫২ জন। আর বিভাগ হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে (ঢাকা মহানগরীর বাইরে) ১৭৪ জন, এর পরই খুলনা বিভাগে ১৬৬ জন ও বরিশাল বিভাগে ১২৬ জন। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে ১৭ জন হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে, ১৬ জন করে ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতাল ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

আরো ৩ জনের মৃত্যু : শনিবার মধ্যরাতের পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফজলুর রহমান (৫৫) নামের ডেঙ্গু আক্রান্ত একজনের মৃত্যু ঘটেছে বলে তাঁর স্বজনরা জানিয়েছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরে হলেও থাকতেন ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীতে। শুক্রবার তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এ ছাড়া রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অমল সন্ন্যাসী নামের ধামরাইয়ের এক রোগীর মৃত্যু ঘটেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু বলে দাবি করা হলেও চিকিৎসকরা বলেছেন, ওই রোগীর ডেঙ্গু নয়, টাইফয়েড ছিল। অন্যদিকে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ঢাকায় নিয়ে আসার পথে ডেঙ্গু আক্রান্ত সুমি আক্রার (৩০) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু ঘটেছে বলে জানিয়েছেন আমাদের মাদারীপুরের প্রতিনিধি।

 

মন্তব্য