kalerkantho

মানবতায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনেকেই আজ ‘কালকেউটে’

► দুই বছরে রোহিঙ্গাশিবিরের অনেকেই কোটিপতি
►স্থানীয়দের ব্যবসা-বাণিজ্য ‘ছিনতাই’
►হত্যা মামলার আসামি হাজারের বেশি

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

২৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মানবতায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনেকেই আজ ‘কালকেউটে’

উখিয়ার কুতুপালংয়ে বন বিভাগের জায়গায় রোহিঙ্গা জিয়াবুলের বাড়ি। ছবি : কালের কণ্ঠ

এ দেশে ‘মানবতা’র সুযোগে আশ্রয় নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। আর্থিক শক্তি যেমন বেড়েছে তাদের, তেমনি বেড়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজনের সঙ্গে নানা সম্পর্ক। অন্যদিকে দেশি-বিদেশি এনজিও ও নানা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রে আন্তর্জাতিক সখ্যও বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। পাহাড় কেটে ঘরদুয়ার তৈরি করার জন্য রোহিঙ্গাদের এনজিওগুলোর সরবরাহ করা দা, খন্তা ও শাবল এখন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলোর শক্তির একটি বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

মাত্র দুই বছরেই রোহিঙ্গাদের অনেকেই বনে গেছে কোটিপতি। স্থানীয় লোকজনের কোটি কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য নানা কৌশলে তারা হাতিয়ে নিয়েছে। কয়েক দিন ধরে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এলাকা ঘুরে পিলে চমকানো এসব তথ্য জানা গেছে। আরো উল্লেখযোগ্য যে তথ্যটি পাওয়া গেছে, তা হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে গড়া ৩২টি শিবিরের রোহিঙ্গাদের দোকানগুলোতে এ দেশের কোনো পণ্য শোভা পায় না। এরা এমনই ‘দেশপ্রেমিক’ যে মিয়ানমার থেকে নিত্যব্যবহার্য পণ্য এনে দোকানে তোলে।

জানা গেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে স্থানীয় লোকজনই শুধু দেশের চলমান আইনের আওতায় রয়েছে। স্থানীয় লোকজনের দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ভেজাল-অনিয়মের জন্য জরিমানাসহ শাস্তি দেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা যত অন্যায়ই করুক না কেন, শাস্তির আওতায় আসে না। এমন অভিযোগ আর ক্ষোভ ঝেড়েছে স্থানীয় লোকজন। তারা বলছে, দাপটের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি করে টাকার পাহাড় গড়ছে রোহিঙ্গারা। এ রকম অবস্থায় রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে যেতে চাইবে কেন?’

এসব বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে বিষয়গুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমি শুনেই তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছি। এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘দেশের প্রচলিত আইন সবার জন্যই সমান। তাই প্রচলিত আইনেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে শুধু একটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেই এক ডজনেরও বেশি কোটিপতি রোহিঙ্গা ব্যবসায়ীর খোঁজ মিলেছে। উখিয়া উপজেলার বালুখালী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরকেন্দ্রিক এ ব্যবসায়ীরা মিলে রাখাইনের একটি প্রসিদ্ধ বাজারের নামে এখানেও গড়ে তুলেছে ‘বলি বাজার’। রাখাইনের বলি বাজারটির আদলেই করা হয়েছে দোকানপাটও। প্রথম দর্শনে মনেই হবে না তেমন একটা কিছু। কিন্তু একটু খোঁজ নিলেই জানা যাবে বাজারটির দোকানিরা সবাই কোটি কোটি টাকার মালিক।

কক্সবাজার-টেকনাফ শহীদ এ টি এম জাফর আলম আরাকান সড়কের বালুখালী বাজার থেকে বালুখালী ১ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রবেশপথেই বলি বাজারের অবস্থান। এ বাজারের ২০০ দোকানে অন্তত ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকার পণ্যসামগ্রী রয়েছে বলে জানা গেছে। এসবের বিক্রেতা ও ক্রেতাদের সবাই রোহিঙ্গা।

বালুখালীর স্থানীয় বাসিন্দা গফুর উল্লাহর মালিকানাধীন জমিতে তোলা ওই দুই শতাধিক দোকানে বিক্রির বেশির ভাগ পণ্যই মিয়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডে তৈরি। জমির মালিক গফুর উল্লাহ বাজারের দোকান থেকে প্রতি মাসে আয় করেন পাঁচ লক্ষাধিক টাকা। বলি বাজারটির পাশে রয়েছে আরো একটি বড় বাজার। সেই বাজারেও কোটিপতির সংখ্যা নেহাত কম নয়। বিসমিল্লাহ স্টোর নামের একটি দোকানের মালিক হচ্ছেন রোহিঙ্গা জাহাঙ্গীর। তিনি বালুখালীতে বসেই মিয়ানমার-টেকনাফ সীমান্ত বাণিজ্যের নামে পণ্য আমদানি করেন টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে। টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে এ দেশে গরু আনার ব্যবসাও এখন একচেটিয়া তাদের দখলে।

একই এলাকার ‘ছাদেক স্টোরে’ কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছেন রোহিঙ্গা ইদ্রিস। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একজন ব্যক্তি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে তাকে দেশের নাগরিকত্ব, জাতীয়তা সনদ, হোল্ডিং ট্যাক্স, জমির হালনাগাদ খাজনা আদায়ের প্রমাণপত্রসহ অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়, কিন্তু রোহিঙ্গাদের এগুলোর কিছুই নেই। তবে ক্ষেত্রবিশেষে তারা একদম ফ্রি স্টাইলে কম্পিউটারের মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করেই ব্যবসা করে যাচ্ছে। টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে এসব রোহিঙ্গা ব্যবসায়ী মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুন, বিভাগীয় শহর আকিয়াব ও মহকুমা শহর মন্ডু থেকে পণ্যসামগ্রী সীমান্ত বাণিজ্যের আওতায় নিয়ে আসছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ব্যবসায়ীরা টেকনাফের স্থানীয় সীমান্ত বাণিজ্য ব্যবসায়ীদের নামে ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্সির মাধ্যমেই মিয়ানমার থেকে পণ্য আমদানি করছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বাসিন্দা হওয়ায় তারা সে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ লাভ-লোকসানের হেরফের এখানকার ব্যবসায়ীদের চেয়ে বেশি জানে। এ কারণে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পণ্যসামগ্রী বিক্রি করতে আগ্রহী বেশি। বলি বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, দোকানগুলো চায়নিজ ও মিয়ানমারের শার্ট, লুঙ্গি, প্যান্ট, ছাতা থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনসেটসহ ইলেকট্রনিক পণ্যে সাজানো। আছে মিয়ানমারের আচার, জুতা-স্যান্ডেল, সুপারি, ছাতা। দোকানগুলোতে বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কিছু বোরকা ও থান কাপড় দেখা গেছে।

বালুখালীর বলি বাজারে রোহিঙ্গা সিরাজ একজন বড় মাপের ব্যবসায়ী। তবে দোকানে তাঁকে কম দেখা যায়। তাঁর স্বজনরাই দোকান চালায়। বলি বাজারে রয়েছে ওসমান, আলী মিয়া, আনোয়ার শাহ, নাসেরসহ আরো কয়েকজন রোহিঙ্গা কোটিপতি। এসব দোকানির কারো কাছে কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই। তাদের দিতে হয় না কোনো রাজস্বও। এ জন্য দিন দিন তারা ব্যবসার লাভে ফুলে উঠছে; আর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হয়ে পড়ছে কোণঠাসা।

বালুখালী বাজারে এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নুরুল আবসার চৌধুরী কালের কণ্ঠকে আফসোসের সুরে বলেন, ‘আমাদের বাবারা যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছিলেন। আজ স্বাধীন দেশে আমরাই যেন পরাধীন, আর আশ্রিত রোহিঙ্গারা স্বাধীন।’ তিনি আরো বলেন, বালুখালী বাজারে আলিফ ট্রেডিং নামে তাঁর একটি ফটোস্ট্যাট ও কম্পিউটারের দোকান আছে। সেটা দিয়েই তাঁর সংসার চলত। দোকানটি চালাতে গিয়ে তিনি সরকারের যাবতীয় শর্ত মেনে চলেন, কিন্তু পাশের শিবিরের রোহিঙ্গারা কোনো ট্যাক্স ছাড়াই কম্পিউটারের দোকান খুলে বসেছে যত্রতত্র। এসব কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যবসায় ক্ষতি গুনে যাচ্ছেন তিনি। দুঃখের সঙ্গে তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান হয়। কিন্তু অভিযানের মুখে পড়ে শুধু স্থানীয় লোকজন। শাস্তিও তারাই ভোগ করে। রোহিঙ্গাদের ধারেকাছেও ভ্রাম্যমাণ আদালত যান না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাশিবিরগুলোতে ছোট-বড় ১০ থেকে ১৫ হাজার দোকান বসেছে। এসবের মালিক শিবিরের রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গারা যেসব ত্রাণ পেয়ে থাকে সেসব ত্রাণের উদ্ধৃতাংশও তাদের দোকানে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় লোকজনই এসবের ক্রেতা। এসব নিয়ে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার সবাই অর্থনৈতিকভাবে কমবেশি এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে।

স্বর্ণের ব্যবসাও এখন রোহিঙ্গাদের হাতে। এক মাস আগে বালুখালী শিবিরের এক রোহিঙ্গার কাছ থেকে তিন কেজি স্বর্ণের একটি চালানসহ বিপুল অঙ্কের টাকা উদ্ধার করা হয়। দেখা গেছে, প্রতিটি শিবিরেই কয়েক ডজন স্বর্ণের দোকান রয়েছে। ইয়াবার কারবার অনেক আগে থেকেই রয়েছে রোহিঙ্গাশিবিরে। মানবপাচারও রোহিঙ্গাদের একটি চক্রের একচেটিয়া ব্যবসা এখন। মানবপাচার ও ইয়াবার কারবারের সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার রোহিঙ্গা।

শিবিরের যাবতীয় ওষুধের ব্যবসাও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে রোহিঙ্গারা। প্রতিটি শিবিরে পল্লী চিকিৎসক এবং ওষুধের ডজন ডজন দোকান রয়েছে। হেন কোনো পণ্যের ব্যবসা নেই, যা রোহিঙ্গারা করছে না। টেকনাফের মুচনী শিবিরের একজন রোহিঙ্গার রয়েছে ১৫টি সিএনজিচালিত ট্যাক্সি। মুচনী এলাকার গ্রামবাসী আলী আহমদ লাইনম্যান হিসেবে এসব ট্যাক্সির ভাড়া তদারকির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

টেকনাফ-উখিয়ার সাবেক এমপি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জানান, মাত্র দুই বছর আগে আশ্রয় নেওয়া প্রতিজন রোহিঙ্গাই আজ অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে বাংলাদেশি গ্রামবাসীদের অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশিদের মানবতার সুযোগ নিয়ে তারা আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে আসা রোহিঙ্গারা দুই বছর আগে আসা রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে যেকোনো কাজে। নতুন রোহিঙ্গারা সুবিধা বেশি ভোগ করছে। এনজিওগুলো নানা কর্মসূচির নামে দফায় দফায় রোহিঙ্গাদের নগদ টাকা প্রদানের সুযোগ নিয়েছে প্রশাসন থেকে। এতে রোহিঙ্গারা নগদ টাকা হাতে পেয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসার ঘটানোর সুযোগ পেয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি হচ্ছে, আর্থিক ছাড়াও রোহিঙ্গারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও শিবিরগুলোতে বেশ শক্তিশালী। শুরু থেকেই কাজকর্মের নামে তারা বিভিন্ন এনজিও থেকে দা, খন্তা, কুড়াল, শাবলসহ নানা সরঞ্জাম নিয়েছে। এসব সরঞ্জামকে এখন এক ধরনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত দুই বছরে ৪৩টি হত্যা মামলায় এক হাজারের বেশি আসামি রোহিঙ্গারা। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ৪৭১টি মামলা রয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা