kalerkantho

শনিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৮ সফর ১৪৪২

রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর

নিধনযজ্ঞের বিচারে বড় বাধা চীন

মেহেদী হাসান   

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিধনযজ্ঞের বিচারে বড় বাধা চীন

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার বাহিনীর অভিযান, নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যে ‘জেনোসাইডের’ আলামত পেয়েছে জাতিসংঘের তদন্তদল। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট নতুন করে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। গুরুতর অপরাধ সত্ত্বেও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে গত দুই বছরে মিয়ানমারের বিচারের ব্যাপারে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো একমত হতে পারেনি। মিয়ানমার বাহিনীর জবাবদিহির বৈশ্বিক উদ্যোগে দৃশ্যত এখনো বড় বাধা চীন।

তবে জাতিসংঘের তদন্তদল বলছে, মিয়ানমার বাহিনীর অপরাধের মাত্রা এত ভয়াবহ যে ওই দেশটির অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থায় তার ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধসহ গুরুতর বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে ওই তদন্তদল।

যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব অনুসন্ধানে গুরুতর অপরাধের তথ্য-প্রমাণ পেলেও ব্যবস্থা নেওয়ার দায়বদ্ধতা এড়াতে এখনো ‘জেনোসাইড’ সংঘটিত হওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।

এদিকে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করার আবেদন আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আইসিসি ওই আবেদন মঞ্জুর করলেও মিয়ানমার এখনো রোম সংবিধির সদস্য না হওয়ায় তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকবে। তা ছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এখনো বিচারের ব্যাপারে একমত না হওয়ায় তদন্ত, সম্ভাব্য বিচার এবং রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রেও নানা বাধা আসতে পারে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরো বলছে, আইসিসি ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের বিচার করে, রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর অপরাধের বিচার করে না। রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত জেনোসাইড ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে ওই দেশটির সেনাবাহিনীর জোরালো ভূমিকা রয়েছে। তাই আইসিসি কাঠামোতে সু চির সরকার বা মিয়ানমার বাহিনীর বিচার সম্ভব নয়।

বিশ্বের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর জোট ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজে (আইসিজে)’ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে জাতিসংঘ ভবিষ্যতে কোনো একদিন রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের জবাবদিহির লক্ষ্যে একটি কাঠামো গঠন করেছে। ওই কাঠামো রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের কাজ করবে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আনান কমিশনের সুপারিশ প্রকাশের রাতে কথিত জঙ্গি হামলার অজুহাতে মিয়ানমার বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল অভিযান শুরু করে। মিয়ানমার বাহিনীর ওই অভিযানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। ওই অভিযান শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত সাত লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জঙ্গি হামলার অজুহাতে মিয়ানমার অভিযান শুরু করার কথা বললেও কয়েক মাস আগে থেকেই তারা প্রস্তুতি নিয়েছিল। এর অংশ হিসেবে রাখাইন রাজ্যে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করতে অভিযান শুরু করার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল বন্ধ করে দেওয়াসহ দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছিল।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে চীন মিয়ানমারের পাশে আছে বলে জানিয়েছেন মিয়ানমারে চীনের রাষ্ট্রদূত চেন হাই। মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার নেপিডোতে চীনের রাষ্ট্রদূতের বৈঠকের পর মিয়ানমার বাহিনীর ওয়েবসাইটে এ কথা বলা হয়েছে। ওই বৈঠকটি পূর্ব নির্ধারিত ছিল কি না তা জানা যায়নি। তবে সেদিন রাতেই নিউ ইয়র্কে মিয়ানমার বাহিনীর যৌন নিপীড়ন নিয়ে জাতিসংঘের তদন্তদলের নতুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশের ঘোষণা আগে থেকেই ছিল।

জাতিসংঘের ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নই মিয়ানমার বাহিনীর নেশায় পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর জেনোসাইড চালাতে মিয়ানমার বাহিনী পরিকল্পিতভাবেই ভয়াবহ যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা মিয়ানমার বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

জানা গেছে, চীন একই সঙ্গে মিয়ানমার বাহিনীর ওপর মানবাধিকার ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বৈশ্বিক চাপ কমানোর চেষ্টা করছে, আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করার চেষ্টা করছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন। এ সংকটে বাইরের দেশগুলো যুক্ত হোক তা চীন চায় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওপর চীনের যে মাত্রার চাপ প্রত্যাশা করছে তা হয়তো নেই। তবে মিয়ানমার লোক-দেখানোর জন্য হলেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার যে কথা বলছে তা চীন, জাপান, ভারত ও আসিয়ান কিছু দেশের চাপ বা অনুরোধের কারণেই।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা